সে দেবনাথের কাছেই একটি কবিতার সংকলন পেয়ে গেল। সে তিক্ত বিস্বাদে বইটির পাতা উলটাচ্ছে। সে বারবার করে একই কবিতা পড়ল। পড়ে মুখস্থ করল। সে পড়ল।
”জড়ায় আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই
ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে”
বিকেলে মোটর নিয়ে এলবি বন্দরে হাজির। বন্দরে সে বিজনের জন্য অপেক্ষা করছে। কিনারার শ্রমিকরা এখন জাহাজের কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরছে। ওরা সকলে এলবিকে অভিবাদন জানাল। কোয়ার্টার মাস্টার তখন খবর দিয়ে পাঠিয়েছে বিজনকে। বিজন একবার গলুই—এ উঠে উঁকি দিয়ে এলবিকে দেখল। সে আবার আবৃত্তি করল সিঁড়ি ধরে নামার সময়। সে একবার সেলিমের হাসপাতালের দৃশ্যে, পরে এই কবিতার সুরে এবং আরও পরে পোশাকের ভিতর ঢুকে গিয়ে অম্লান থাকার ইচ্ছায় শিস দিতে থাকল।
নিচে নেমে ওরা উভয়ে পরস্পরকে অভিবাদন জানাল। বিজন মনে মনে কবিতা আবৃত্তি করল—সেই নির্দিষ্ট কবিতা, সেই সুরে, সেই নিঃস্ব অথচ ভরা কোটালের মতো আবেগধর্মিতায়। অথচ এলবিকে জানতে দিল না মনে মনে সে এখন কবিতা আওড়াচ্ছে। মনে মনে সে এখন কবিতার মতোই বিশুদ্ধ ভাব নিয়ে বেঁচে আছে। সে সেলিমের পাশে বিশুদ্ধ ভাব নিয়ে বসবে। সে সেলিমের মাথায় হাত দিয়ে বিশুদ্ধ শান্তি দেবে। বলবে, তুই ভালো হয়ে উঠবি। বলবে নার্সকে, প্লেট কী বলছে? আর কত দিন সেলিমকে এখানে থাকতে হবে?
গাড়িতে এলবি রাস্তার নাম, জায়গার নাম তারপর আরও কতরকমের কথা—রাজনীতি থেকে খেলাধুলো, এমনকি রয়েল হাসপাতালে দুজন ভারতীয় মেয়ে নার্স ট্রেনিং—এ আসছে এ খবরও দিল এলবি। ওর বাবা পার্থে যাচ্ছেন। মা এবং বাবা হয়তো যাওয়ার পথে একবার এখানে এসেও যেতে পারেন। কারণ এলবি বিজন সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখে দিয়েছে। সুতরাং বাবা আসছেন, মা আসছেন।
এলবি গাড়ি চালাবার সময় একবার হাতের ঘড়ি দেখল। যেন আজ হাতে কিছুটা সময় বেশি আছে। খুব বিশেষ তাড়া নেই কাজের। গাড়ির গতি সাধারণ। এলবি খুব খুশি খুশি হয়ে কথা বলছিল। বলছিল, আশা করি সেলিমের ভালো খবরই আমরা পাব।
ওরা হাসপাতালে কিন্তু শুনল অন্য কথা। মিঃ ট্রয় সেলিমের কাছে এলবির নামে একটা চিঠি রেখে গেছেন। এলবি চিঠিটা পড়ল। এলবিকে এখন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। বিষণ্ণতা বিজনেও সংক্রমিত হল।
এলবি বলল, সেলিমের মেজর অপারেশন হবে। বাঁদিকের ফুসফুসটা কাটা ছেঁড়া করবে। এলবি এইসব কথা হাসপাতালের সিঁড়ি ধরে নামার সময় বিজনকে শোনাল।
বিজন বিছানায় বসে সেলিমের সঙ্গে রঙ্গতামাসা করেছিল। দেশে ফিরলে সেলিম বিবিকে প্রথম কোন জাহাজি বন্ধুর গল্প শোনাবে, প্রশ্ন করে বিজন জানতে চেয়েছিল আরও অনেক সব কথা বিজন যেন মনে করতে পারছে না।
আরও দু—একজন জাহাজি ওর পাশে বসে ছিল। সারেং বলে পাঠিয়েছেন তিনি কাল এসে দেখে যাবেন। বিজন সেলিমের বিছানায় শেষ সময়টুকু পর্যন্ত কাটাতে পেরে খুশি। তারপর ভিজিটারদের শেষ ঘণ্টা পড়ল। সিঁড়ি ধরে নামবার সময় সেলিমের অস্ত্রোপচারের কথা শুনল। এবং এই শুনে বিজনের কেমন অন্যমনস্কতা বাড়ছে। এলবি গাড়িতে বসে লক্ষ্য করছে ভয়ানক দুশ্চিন্তায় বিজন খুব ভেঙে পড়ছে। এলবির এখন বিজনকে আশ্বস্ত করা দরকার।
বিজন বলল, সেলিম আমার সঙ্গে দু’সফর ধরে কাজ করছে। দু’সফর ধরে ওর সঙ্গে মেলামেশা, কখন যে আমরা এত ঘনিষ্ঠ হয়েছি জানি না। এখন বুঝতে পারছি ওর অভাবটা জাহাজে আমার কত বড় হয়ে বাজছে।
তারপর ওরা এইসব স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আলোয় অথবা মনের আরও সব নীল ইচ্ছায় প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে তারপর সেই কবিতার জগতে ফিরে আসা, কবিতার জগতে ডুবে যাওয়া, ইতিহাসের মৃত নায়কের মুখের মতো ছবি হয়ে বসে থাকা এবং অবশেষে মুখোমুখি চুপচাপ বসে থাকা। এমন একদিন হয়নি, অনেক দিন হয়েছে। এরা পরস্পরকে কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে। এলবি বিজনকে বাড়ি নিয়ে গেছে। ওর হাতের আঁকা ছবি দেখিয়েছে। তারপর কোনো রেস্টুরেন্টে অথবা নীল আকাশের নিচে বসে সেলিমের অস্ত্রোপচারের দিনের কথা ভেবে বিষণ্ণ হয়েছে।
একদিন এলবি বলল, বাবা, মা কাল আসছেন।
জীলঙ এখান থেকে কত দূর? প্রশ্ন করেছিল বিজন।
খুব বেশি দূর নয়।
কীসে ওঁরা আসবেন?
ট্রেনে আসা যায়। বাবা মোটরে আসছেন। খুব প্লেজান্ট জার্নি। তারপর একটু থেমে এলবি আবার বলল, ওঁদের সঙ্গে আলাপে তুমি খুশি হবে।
আমার সঙ্গে আলাপে ওঁরা খুশি হবেন তো?
এলবি হাসল।
দু’দিন পর এলবি ওর বাবা—মার সঙ্গে বিজনকে পরিচয় করিয়ে দিল। ওঁরা বিজনকে বললেন, আমাদের পরম সৌভাগ্য তোমাকে আমাদের ভিতর পেয়েছি। পরম সৌভাগ্য, এলবি এ সময় খবর দিয়ে তোমার কথা জানিয়েছে। আমরা সকলেই কবির খুব ভক্ত। তুমি তাঁর দেশের লোক। তুমি ওঁর স্পর্শ লাভ করেছ—এবং আমরা তোমার সঙ্গলাভ করেছি ভেবে খুশি।
এলবির বাবার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে বিজন সত্যি খুশি। ভদ্রলোক অমায়িক। ভদ্রলোক প্রাণোচ্ছল অথচ কথাবার্তায় খুব সংযত। বিজনের মুখ থেকে কবির কবিতা শোনার একান্ত ইচ্ছা ওঁদের। বিজন পর পর কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করল।
ওঁরা খুশি হয়ে বললেন, তুমি আমাদের কথা দাও ডিনারে একদিন উপস্থিত থাকবে। আমরা খুব আনন্দিত হব তোমার উপস্থিতিতে।
দিন স্থির করুন, আসব।
কিন্তু একটা কথা, মিঃ চার্লটন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। একটা সিগারেট ধরালেন এবং পাশে এসে বললেন, আমরা তোমাকে চাইনিজ ডিশ দেব। খুব মনোরম খেতে। কিন্তু…।
