বিজন টেনে টেনে আবৃত্তি করছে—
”পাখী সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুম-কলি সকলি ফুটিল।
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।”
ওরা পরস্পর কথা বলতে পারছে না। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে ওরা উভয়ে যেন গম্ভীর এবং ঘন। উভয়ে যেন রবীন্দ্রনাথের মতো বিশুদ্ধ ইচ্ছায় পরস্পর মহৎ ভাবটুকু রক্ষা করছে।
বিজন এলবির কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রতীকীতে বাঁচবার ইচ্ছায় এও বলল, মোটরে যে কবিতা আমাকে শোনালে এ—কবিতা তারই মূল ভাষা।
বিজন ভাবল—বন্দরে আমি এলবির চোখে রবীন্দ্রনাথ হয়ে বাঁচব।
তারপর এলবির মোটর থেকে একসময় বিজন জাহাজে উঠে ফোকসালে ঢুকে দেখল, দেবনাথ বাংকে ঘুমিয়ে আছে। অন্যান্য কেবিনেও বিশেষ সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভয়ানক শীতে সব জাহাজিরা কম্বল মুড়ি দিয়ে জাহাজে ঘুমোচ্ছে। সে ফোকসালে দাঁড়িয়ে কিছু কাশির শব্দ শুনল। দু—একজন জাহাজির আলাপ শুনল। এই শীতে উপরে উঠে হাত—মুখ ধুতে ইচ্ছা হল না। কোনোরকমে লকার থেকে খাবারটা বের করে খেয়ে নিল। তারপর ঠান্ডা জলে কুলকুচা করে পোর্টহোলে মুখ ধুলো এবং বাংকে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছায় হাত—পা সটান করে দিল। অথচ ঘুম এল না। ঘুম আসছে না। বিজন অন্য ফোকসালে ফের কিছু জাহাজির আলাপ শুনছে। এখন হয়তো এলবি ঘরে ফিরে অন্য কবিতা আবৃত্তি করছে। এই বাংকেও সে এলবির কাছে মিথ্যার মুখোশের জন্য ছটফট করছে। অথচ সে স্পষ্ট হলে এই সাময়িক মানসিক অস্থিরতার গ্লানিকে ধৈর্য ধরে লালন করতে হত না; এই করে সে এক মিথ্যার জন্য হাজার মিথ্যায় জড়িয়ে পড়ছে।
ওর ইচ্ছা হল একবার দেবনাথকে ঘটনাটা খুলে বলে। সাহিত্য—প্রীতি এবং স্পৃহা দেবনাথের যথেষ্ট আছে। বরং সে দেবনাথকেই সঙ্গে নেবে। অথবা দেবনাথকে প্রশ্ন করে জানবে—ওর কাছে কবির কোনো বই অথবা কোনো কবিতা কণ্ঠস্থ….যদি থাকে তবে…তবে…সে নিঃসংশয় হতে পারছে না তবু। দেবনাথ! দেবনাথ! সে যেন ডেকেই উঠল। মনে মনে ওর এই ডাক এবং এলবির সরল বিশ্বাস, দুটো চোখের ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে ওর চোখে জ্বালা। ওর ঘুম আসছে না। এলবি ‘পাখীসব করে রব’ ইংরেজি হরফে লিখে নিতে চেয়েছিল। সে হয়তো এইসব মুখস্থ করে অন্য কোথাও আবৃত্তি….কিংবা বাহবা….কিন্তু বিজন বলেছে তখন শরীরটা ভালো নেই। আবার কাল হবে। আবার সে ছলনাকে কেন্দ্র করে বাঁচতে চাইল। এলবির ঘনিষ্ঠতা, সঙ্গ এবং দু’দণ্ডের আলাপ থেকে বিচ্ছেদের নিঃসঙ্গতায় সে বাঁচতে চাইল না। বিশেষত এই বিদেশিনীর কাছে স্পষ্ট হওয়ার দরুন কোনো পরাভবকে স্বীকার করার দরুন কোনো গ্লানিকে সহ্য করতে পারত না। অপমানবোধ বিজনের তীব্র। সেজন্য এই মিথ্যার মুখোশে আপাতত সে জাহাজি। সে খুশি।
ভোরবেলায় জাহাজে অনেক কাজ। সালফার নামানো হচ্ছে। হাড়িয়া—হাপিজ হচ্ছে ফল্কায় ফল্কায়। ভোরে আজ সূর্য উঠল না। আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। সমুদ্রের বাতাস পর্যন্ত। বন্দরের পাইন গাছে কোনো পাখি বসে নেই। শীতের জন্য ওরা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। শীতের জন্য এইসব জাহাজিরা হি হি করে কাঁপছে। ওরা সাবান—জল নিয়ে আজ ছুটে ছুটে কাজ করতে পারছে না, ওরা স্থাণুর মতো নীল উর্দির ভিতর গুটিয়ে আসছে। ওরা পুরানো জামা—কাপড় সব আফ্রিকার বন্দরে বিক্রি করে এখন পস্তাচ্ছে। শীতের কষ্ট ভয়ানক কষ্ট।
পাশের জাহাজে কীসের যেন শোরগোল। পাশের জাহাজের নাবিকরা পোর্ট—সাইডের ডেকে জড়ো হয়েছে। ওরা রেলিংয়ের উপর ঝুঁকছে। ওদের সকলের চোখ বন্দরের জলের উপর। এই জাহাজের নাবিকরা ঘটনাটা ধরতে না পেরে গলুই—এ জড়ো হয়েছে। মেজ মালোম অন্য জাহাজিদের ডেকে ঘটনার কথা জানতে চাইলেন। পাশ থেকে কে একজন যেন বলল, পাশের জাহাজের তিন নম্বর মিস্ত্রি জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাটা তারপর আরও বিস্তৃত হল। বন্দরের সব লোক চারপাশে জড়ো হয়েছে। এ—শীতেও কিছু লোক জলে নেমে অনুসন্ধান করছে তিন নম্বর মিস্ত্রিকে অথচ মিস্ত্রিকে পাওয়া যাচ্ছে না। ইংলন্ডে ওর স্ত্রী এডালট্রি কেসে জড়িয়ে পড়েছে—এই খবরটা এখন জাহাজিদের মুখে মুখে।
ভোরের এইসব সাত—পাঁচ ঘটনায় বিজন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। ওর মনে নেই এবং মনে পড়ছে না—গতকাল এক রমণীয় পরিবেশে কোনো এক সুন্দরী যুবতীর পাশে মরিয়া হয়ে নকল কবির অভিনয় করেছে। মনে পড়ছে না আজও এমন ঘটতে পারে। একজন জাহাজির আত্মহত্যা এবং সালফেটের গন্ধ এই প্রচণ্ড শীত ওকে ওর অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিলকুল বিপরীত ধারণার বশবর্তী করেছে। সে ভাবল মৃত্যুই শ্রেয়, মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ। পিস ওয়াজ অন দেয়ার ফোরহেডস—সে এ—কথাও ভাবল। সেলিমের কপালে শান্তির রেখা ফুটে উঠেছে হয়তো। এলবির সেই মুখ—সেখানেও একদিন শান্তির রেখা নামবে—কেউ বাদ যাবে না। কবিতা আবৃত্তির সময় এলবির সেই গভীর দৃষ্টি, সেই দৃঢ় অথচ প্রীতিপূর্ণ চোখ সে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে নিঃস্ব পাইনের আঁধারে সহসা যেন দেখল। এলবি তাকে ভালোবাসতে চায়। রবীন্দ্রনাথের মতো করে ভালোবাসতে চায়। বিজন যেন এখন কবির প্রতীকীতে বাঁচবার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠল। সে ডাকল—দেবনাথ, দেবনাথ, নিচে এসো কথা আছে। বিকেলের কথা রাখার জন্য সে নিচে সিঁড়ি ধরে ফোকসালে ঢুকে গেল। —তুমি তো অনেক বই এনেছ সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের কোনো বই আছে তোমার কাছে? এইসব বলার ইচ্ছা হল।
