এলবি এবার আর একটু খুলে বলল। বাবা চিনে অনেক দিন ছিলেন। এমব্যাসিতে কাজ করতেন। সুতরাং বাবা কোনো ভদ্রলোককে ডিনার—পার্টিতে নিমন্ত্রণ করলেই তাঁকে চাইনিজ ডিস দিতে ভালোবাসেন।
চার্লটন আবার আরম্ভ করলেন, কীন্তু কথা হচ্ছে ট্যাগোরের দেশের ছেলে তুমি বলতে গেলে ঘরের ছেলে। সুতরাং ট্যাগোর কী খেতেন এবং খেতে ভালোবাসতেন নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে। মেনুতে ট্যাগের ডিশও একটা থাকবে কী বল? তার প্রিপারেশনের ভার তোমার উপর। কী কী লাগবে বলে দাও, আমি সব সংগ্রহ করে রাখব। আগামী রবিবার ছুটির দিনে আমরা এখানে ফের আসব। এবার তিনি থামলেন। পাশে মিসেস চার্লটন উল বুনতে বুনতে লাফিয়ে উঠলেন, বড় চমৎকার হবে। এলবির পিসিকে বললে হয়। তারপর আরও দু—একজনের নাম তিনি বলে গেলেন।
বিজন বলল, রান্নাতে আমি অভ্যস্ত নই। দেবনাথ বলে একজন জাহাজি আছে, সেও বাঙালি, সে ভালো রাঁধতে জানে। ওকে নিয়ে আসব।
এলবি টেবিলের উপর খাতা রেখে বলল, কী কী সংগ্রহ করতে হবে বল।
কিছুই দরকার হবে না। কারণ মশলাপাতি তুমি এখানে কোথাও খুঁজে পাবে না। সরষের তেলও বোধহয় নেই। দেবনাথকেই বলব সব সংগ্রহ করতে, পারো তো কিছু ডিম, মাংস এবং ভেজিটেবল সংগ্রহ করে রেখ। তাতেই চলবে।
এলবি দীর্ঘদিন পর আজ সকলকে পিয়ানো শোনাল। বিজনের মনে হল, এলবি উলের পোশাক পরে আছে। এলবির সাদা স্কার্ট এবং সাদা জ্যাকেট থেকে সে রঙ যেন চুঁইয়ে পড়ছে। বাইরে শীতের ঠান্ডায় যেন তুষার ঝরছে। ওরা তিনজন আগুনের পাশে বসে উত্তাপ নিচ্ছে। মাঝে মাঝে মিসেস চার্লটন উনুনে কাঠ গুঁজে দিচ্ছেন। মিঃ চার্লটন চীনদেশের গল্প করছেন এখন। সে—দেশের রীতিনীতির গল্প করছেন। এলবি এখন আর পিয়ানো বাজাচ্ছে না। চেয়ারে বসে সেও বিদেশের গল্প শুনছে। সহসা এইসব কথার ভিতর বিজন যেন দেখল ওরা সকলে একই পরিবারভুক্ত লোক হয়ে শীতের রাতে উনুনের পাশে আগুন পোহাচ্ছে। মনে হল বাংলাদেশেরই কোনো পরিবারের ভিতর বসে সে যেন ঠাকুমার গল্প শুনছে।
নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে দেবনাথ এবং বিজন সকাল সকাল জাহাজ থেকে নেমে গেল। ছুটির দিন। এই শীতের ভিতরও শহরের সব যুবক—যুবতী ছুটি ভোগ করতে দলে দলে বের হয়ে পড়েছে। ওরা সব রেস্তোরাঁয়, পাব—এ অথবা পার্কে কিংবা শহরতলিতে ছড়িয়ে পড়ছে। দেবনাথ এবং বিজন হেঁটে যেতে যেতে সব টের পাচ্ছে। ওদের হাতে ছোট নীল ব্যাগ। ট্যাগোর ডিশের জন্য যাবতীয় দ্রব্য সংগ্রহ করা ওতে। ওরা গল্প করতে করতে অথবা অযথা উচ্ছল হতে হতে হাঁটছে।
ওরা বন্দর ফেলে, জনসন রোড ধরে ছোট পাহাড়টায় উঠে গেল। এখানে ছোট ছোট কাঠের ঘর—নীল অথবা হলুদ রঙের। দরজায় নীল রঙের পালিশ। বাড়ির সংলগ্ন ছোট ফুলের বাগান, সবজির বাগান। প্রচণ্ড শীতের জন্য বাগানে কোনো ফুল অথবা সবজির চিহ্ন নেই। গোলাপেরা শুধু কুঁড়ি মেলার চেষ্টা করছে। ওরা দ—এর মতো পথে, কখনও সিঁড়ি ভেঙে, কখনও ঘুরে ঘুরে এলবির ছোট নীল আস্তানায় গিয়ে হাজির হল। প্রথমেই ছোট কাঠের দরজা।
সংকীর্ণ ফুটপাতের বাঁ—পাশের থামটায় লেখা ‘শান্তির নীড়’ তামার প্লেটে খুব চকচক করছে। সদর দরজার উপর আইভিলতার গুচ্ছ। পাতা নেই। শুধু লতাগুলো দুলছে। ভিতরে বাঁ—পাশে মুরগির ঘর। ডানপাশে ফুলের বাগান। ‘এল’ অক্ষরে পথ। পথের দু’পাশে নানা রকমের সামুদ্রিক পাথর। অন্য পাশে কোমর সমান কাঠের রেলিংয়ে কিছু নীল প্রজাপতি বসে আছে; মিঃ চার্লটন এবং মিসেস চার্লটন বের হয়ে এসে ওদের অভিবাদন জানালেন। বললেন, গতকালই আমরা এসে গেছি।
এলবিও সেজেগুজে বের হল। যেন ফুলের মতো এই শীতের হালকা রোদে ফুটে উঠল। এলবি ওদের ভিতরে নিয়ে গেল। বিজন দেবনাথের সঙ্গে ওঁদের পরিচয় করিয়ে দিল। এলবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেবনাথকে সমস্ত বাড়িটা দেখাল। এই ওর বাড়ি এখানে সে থাকে, ওই ওর ঘর—এখানে সে রাঁধে, এই ওর ঈজেল—এখানে সে ছবি আঁকে। দেবনাথ সব ঘুরে ঘুরে দেখল। এলবির একটি বিশেষ রুচি আছে এ বোধ ওর এখন জন্মাচ্ছে। ঘরে সব বড় বড় ক্যানভাস। নানা রঙের ছবি।
ওরা এসে পাশের ঘরটায় বসল। মিঃ চার্লটন কতকগুলো ছোট ছোট কাঠি এনে পাশে রাখলেন। মসৃণ করার জন্য কিছু শিরিষ কাগজ। তিনি সকলকে কাঠিগুলো দেখালেন—এগুলো রাইস—স্টিক। তারপর দু—আঙুলের ফাঁকে কাঠি চেপে ধরার কায়দা—কানুন শেখাতে থাকলেন দেবনাথ এবং বিজনকে। দেখালেন, কী করে স্টিক ধরতে হয়, কী করে মুখে ভাত তুলতে হয়। একটা খালি চিনেমাটির বাসনও রাখলেন সকলের সামনে। ছোটখাটো একটা ডেমনস্ট্রেশন দিলেন।
দেবনাথ এইসব দেখে বিরক্ত হচ্ছিল। সে ঘড়ি দেখল। এখন দশটা বাজে। এখনও এলবি টেবিল সাজাচ্ছে। কখন রান্না হবে এবং কখন খাওয়া হবে এই ভেবে সে উষ্মা প্রকাশ করল।
একটি ঘরকেই এলবি কাঠের পার্টিশন দিয়ে দু’ভাগ করে নিয়েছে। এ—ঘর থেকে সে—ঘরে যাবার একটি মাত্র খোলা পথ। একটিমাত্র দরজা। দরজায় পাল্লা নেই। দরজায় চাইনিজ সিল্কের দামি পর্দা। পর্দা সরালেই ঘরটা স্পষ্ট। পর্দা সরালেই ধবধবে বিছানা স্পষ্ট। দেবনাথ পর্দা সরিয়ে সব দেখল। বারান্দার দক্ষিণ দিকে চিলতে রান্নার জায়গা। পরে বাথরুম, পাশে ছোট একটি লনের মতো জায়গা। সেখানে গরমের দিনে ইজিচেয়ার নিয়ে বসা যায়। সেখানে একটি ভাঙা ঈজেল এখনও রেলিং—এর সংলগ্ন হয়ে পড়ে আছে। ছুটির দিনে এলবি সেখানে ছবি আঁকে।
