এলবির কঠিন মুখ সহসা নানা রঙে ক্রমশ নরম হচ্ছে।—বিজন, তুমি পাকা জাহাজি হওনি। তুমি দেখছি মিঃ ট্রয়কে খুব কাঁচা লোক ভেবেছ। পত্রিকা পড়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারলে এ—ব্যাপারে আমরা কিনারার কুলি লোকেদের উপর বেশি নির্ভর করেছি। কথা কী জানো, এখানকার মতো এত জোরালো ইউনিয়ন পৃথিবীর কম বন্দরেই আছে। পাঁচ কলিন স্ট্রিটে পাঁচ বছর থেকে আছি। এ—ব্যাপারে আমি অভিজ্ঞ। তোমাকে জড়ালে কাপ্তান অন্য বন্দরে তোমাকে ছেড়ে কথা বলবে ভেবেছ?
ওদের মোটর হাসপাতালের দরজায় এসে থামল। মোটর পার্ক করে পার্কবোর্ডে নাম লিখে ওরা সদর দরজা অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।
বিজন দেখল, দুটো বিশাল বৃত্তের মতো বাগান দু’পাশে রেখে ওরা উঠে যাচ্ছে। এলবি ব্যাগ থেকে ডায়েরি বের করে সিট—নম্বর এবং ব্লক—নম্বর দেখে নিল। তারপর নম্বর মিলিয়ে ওরা একসময় সেলিমের বিছানার পাশে পৌঁছে গেল।
এলবি বলল, গুড ইভনিং। তোমাকে এখন ভালো দেখাচ্ছে।
বিজন সেলিমের বিছানার পাশে বসে ওর চুলে হাত দিয়ে বলল, এত ভেঙে পড়েছিস কেন? আমি রোজ বিকেলে তোকে দেখতে আসব। জাহাজ এখানে অনেক দিন থাকবে। আশা করি ততদিনে তুই ভালো হয়ে উঠবি।
সেলিম পাশ ফিরে শুল। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। বুকে কষ্ট, হাতে পায়ে যন্ত্রণা। সেলিম বড় বড় চোখে এলবিকে দেখছে। এলবি কিছু ফল এনেছিল সঙ্গে। সেলিমের টেবিলে ফলগুলো রাখল। সেলিম বড় বড় চোখে এলবিকে দেখছে। সেলিম কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছে এমন ভাব ওর চোখে মুখে। অথচ এইসব যন্ত্রণার ভিতরও সেলিম হাসল। একজন ডাক্তার, দুজন নার্স ওর পাশে এসে এখন দাঁড়িয়েছে। ওরা ওর শরীরে ওষুধ প্রয়োগ করল। ওরা সেলিমকে বাঁচবার জন্য উৎসাহিত করল।
এলবি একজন সিস্টারকে প্রশ্ন করল, কাল নিশ্চয়ই প্লেট নেওয়া হচ্ছে?
আজ রাতেই হবে। মিঃ ট্রয় সব ব্যবস্থা করে গেছেন।
এলবি সিস্টারের প্রতি মাথা নোয়াল। মেনি থ্যাংকস।
ওরা উঠে পড়ল। সব ভিজিটারের শেষে ওরা প্রশস্ত পথ ধরে বড় বড় সব চত্বর পার হয়ে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে, ফের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে হাসপাতালের সদর দরজায় এসে হাজির হল। এলবি বলল, চল, একটু ঘুরে আসি। একটু ইউনিভার্সিটির সামনের পার্কটায় বসব। একটু গল্প করব। রাত ঘন হলে তোমাকে জাহাজে পৌঁছে দিয়ে বাড়িতে ফিরে যাব।
মোটরের ভিতর বসে বিজন প্রশ্ন করল, সেলিম শীগগিরই ভালো হয়ে উঠবে—কী বল?
নিশ্চয়ই। খুব জোর দিয়েই যেন এলবি কথাটা বলল। সেলিম ভালো হয়ে উঠলে, তুমি আমি সেলিম জীলঙে যাব। সেখানে আমার বাবা মা থাকেন। বাবা তোমাকে পেলে কিছুতেই ছাড়তে চাইবেন না। তোমাকে পাশে বসিয়ে কেবল ট্যাগোরের কবিতা শুনতে চাইবেন। আমাদের পরিবারের সকলের ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতা মুখস্থ। বলে এলবি মোটরে স্টার্ট দিল এবং জোরে জোরে বিশুদ্ধ সংগীতের মতো কবিতা উচ্চারণ করল :
“When the warriors came out first from
their Master’s hall, where had they hid
their power? Where were their aromour
and their arms?
They looked poor and helpless, and
the arrows were showered upon them
on the day they came out from their
master’s hall.
When the warriors marched back
again to their master’s hall where did
they hide their power?
They had dropped the sword and
dropped the bow and the arrow ; peace
was on the their foreheads, and they had
left the fruits of their life behind them
on the day they marched back again to
their master’s hall.”
কবিতা আবৃত্তি করার সময় আবার সেই ভাবটুকু এলবির মুখে—তুমি কবির দেশের ছেলে, তুমি কবিকে দেখেছ, প্রণাম করেছ, তোমার ঘনিষ্ঠ হয়ে কবিতা আবৃত্তিতে অশেষ আনন্দ। তখন মোটর চলছে। তখনও এলবি কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে মোটর চালাচ্ছে। শহরের সব ছোট—বড় দোকান, রোশনাই আলো, থিয়েটার হল অতিক্রম করে ওরা পশ্চিমের দিকে চলেছে। এলবি ফের বিশুদ্ধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যেন প্রতিধ্বনি করল—পিস ওয়াজ অন দেয়ার ফোরহেডস। অথচ বিজনের কপালে এখন নিষ্ঠুরতার চিহ্ন। সে এলবির এই সাহিত্য—প্রীতিতে পীড়িত হচ্ছে। যেন বলার ইচ্ছা—আমি বাপু জাহাজি মানুষ, আমার ইতস্তত মিথ্যা বলার নিদারুণ অভ্যাস আছে। সাহিত্য—প্রীতি কোনো কালে ছিল না আমার, এখনও নেই।
এলবি বিজনের দিকে মুখ না তুলেই বলল, আমরা এসে গেছি। আমরা এখানে বেশিক্ষণ বসব না। জলপাই গাছের নিচে বসে তুমি কবির কবিতা বল। আমি শুনি।
বিজন অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। সে বলতে চাইল—আমি কবির কবিতা আবৃত্তি করতে পারব না। জাহাজি মানুষের কবিতা কণ্ঠস্থ করে লাভ নেই। এই নীরস জীবনে সততার আশ্রয়ে বাঁচা নিরর্থক। তবু এলবি ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এলবিকে সে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করছে। এলবি যেখানে বসল, সে সেখানেই বসে পড়ল। এলবির প্রতি বিদ্রুপের ইচ্ছায় অথবা মাতাল হওয়ার ইচ্ছায় নিরন্তর সে কঠিন। এলবি এখন কোনো কথা বলছে না। এলবি ঘন হয়ে বসল। এলবি বস্তুত বিজনকে কবির প্রতীকীতে অনন্য করে রাখতে চাইল।
বিজন মরিয়া হয়ে শিশু বয়সের পড়া কোনো কবিতার কথা মনে করতে পারল। (দশম শ্রেণীতে কবির কবিতা সে কিছু পড়েছে।—কিন্তু এখন বিধির বিধানে তাও মনে করতে পারছে না। তা ছাড়া ঘটনাটা এমন শীঘ্র ঘটবে সে তাও ভাবতে পারেনি।) সে আবৃত্তি করল। ওর কণ্ঠ মসৃণ বলে কবিতা আবৃত্তির বিশুদ্ধ ভঙ্গিটুকু এলবিকে আপ্লুত করল।
