বিজন দরজা খুলতেই এলবিকে দেখতে পেল। এলবি দেবনাথের একপাশে দাঁড়িয়ে হাসছে।
বিজন বলল, গুড মর্নিং।
তোমাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।
কেন, এখানেই তো ছিলাম।
এখানেও খুঁজেছি।
বিজন বিব্রত হয়ে পড়ল।
এলবি ভিতরে ঢুকে বলল, ট্রয়কে কিন্তু সব কথাই খুলে বলতে পেরেছি।
বিজন ধন্যবাদ জানাল। তারপর বলল, বোসো।
ছোট ঘর, সোফা নেই। একটা ইজিচেয়ার আছে, কিন্তু পাতবার জায়গা নেই। ওরা তিনজন এমত কথায় হাসল।
এলবি বলল, আমি বেশিক্ষণ বসব না। হাতে অনেক কাজ। তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য দেরি হয়ে গেল। অ্যামবুলেন্স হয়তো এতক্ষণে চলে গেছে। সেলিমকে রয়েল হাসপাতালে রাখা হচ্ছে। আশা করছি বিকেলে ওকে দেখতে যাবে। যেতে অসুবিধা হলে, আমার ওখানে চলে যেও, সেখান থেকে আমি তোমায় নিয়ে যাব। বলে সে আর বসল না। তরতর করে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে গেল।
ওরা দুজন ফোকসালে বসে এলবির পায়ের শেষ শব্দটুকু পর্যন্ত মিলিয়ে যেতে শুনল। দেবনাথ আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল বিজনের। বলল, কী করে এ—মেয়েকে ধরলি?
বিজন গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ব্যস্ত। সুতরাং সে এ—ব্যাপারে আদৌ সাড়া দিল না। আদৌ মুখর হল না। সে জবাবে শুধু বলল, পথে আলাপ।
তারপর ওরা দুজনে চুপচাপ। গ্যালিতে মাংস সিদ্ধ হচ্ছে। ওরা সেই গন্ধ নিচে বসে পেল। ওরা দুজনে কথা বলল না, তখন এক এক করে সকলে এসে নিচে নামছে। যে যার হাত—মুখ ধুলো। থালা—মগ ধুলো। এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেল। ওরা ভোরের এই আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয়েছে, খেতে বসে সকলে এমত ভাব প্রকাশ করতে চাইল।
বিজন এই শীতের বিকেলে ডেকে এসে দাঁড়াল। ওর পোশাক এবং মুখের কমনীয়তায় শীতের রঙ অথবা সমুদ্রের রঙ। ওর শরীরের রঙে আশ্চর্য স্নিগ্ধতা। শীতের দেশে ঘুরে এবং সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় শরীরের রঙ কমনীয় হতে হতে কোনো এক ভোরে বিজন যেন বিদেশির মতো কথা বলতে শিখল।
সে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে দেখল একটা সমুদ্রগামী জাহাজ বন্দরে এসে নোঙর ফেলেছে। সে ওদের ফানেলের রঙ দেখেই বুঝল ওটা আমেরিকান জাহাজ। সে বন্দর দেখে বুঝল ওরা এখানে ইস্পাত—জাতীয় দ্রব্য নামাবে। এবং হয়তো কোনো বিকেলে ভেড়ার মাংস অথবা ফলের রসদে বোঝাই হয়ে অন্য বন্দরে পাড়ি দেবে।
শেষে অন্যান্য অনেক জাহাজির মতো সেও সেলিমের রুগণ ফোকসাল অতিক্রম করে গ্যাংওয়ে ধরে বন্দরে নেমে গেল। সে হাঁটতে থাকল। একজন স্থায়ী বাসিন্দার মতো সে এই ঝরা পাইনের পথ ধরে শহরে উঠে যাচ্ছে। ঝুলন্ত সেতু অতিক্রম করে বন্দরের সিম্যান—মিশান বাঁয়ে ফেলে সে উঠে যাচ্ছে। সেই পাঁচ কলিন স্ট্রিট ও সেই মেয়ে এলবি। সে নির্দিষ্ট আস্তানায় উঠে যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি ডাকল। মোটরে বসে এলবি এবং ওর ইউনিয়নের হলঘর, ওর চিলতে ঘরটুকু…এলবি সুন্দরী, সে সুখে আছে…এলবির চোখ গভীর, আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ়….এলবিকে মনে মনে সুন্দরী বিদেশি রমণী অথচ আপনার মতো করে দেখার এক সবিশেষ কৌতূহলে সে পীড়িত হতে লাগল। এবং সহসাই স্মরণ করতে পারল—এলবি যদি বাতিকগ্রস্ত রুগির মতো ফের বলতে থাকে—তুমি ট্যাগোরের কানট্রি থেকে এসেছ, তুমি কবির কাছের লোক, তুমি কবিকে দেখেছ, সুতরাং তুমি কবির কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও। তুমি আমাকে বাংলা ভাষা শেখাও। আমি মূল কবিতার রস পেতে চাই। তা হলে……তা হলে! সে শরীরের আড়ষ্টতায় এমত উচ্চারণ করে কেমন জড়বৎ বসে থাকল, সে ড্রাইভারকে বলতে পারল না তুমি বন্দরে চল, পাঁচ কলিন স্ট্রিট গিয়ে আমার দরকার নেই।
হলঘরের দরজায় বিজন এলবিকে দেখতে পেল। বিজন ট্যাক্সি থেকে নামল ফুটপাথে। এলবি সিঁড়ি ধরে নেমে আসছে। ওরা পরস্পর অভিবাদন জানাল, তারপর উভয়ে মোটরে চড়ে সেলিমকে দেখতে রয়েল হাসপাতালে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। শীতের সন্ধ্যা। এলবির হাতের দস্তানা লাল রঙের। মোজা বেগুনি রঙের। বব—করা ব্লন্ডচুলে দুটো প্রজাপতি—ক্লিপ। গলায় সরু সোনার চেনে পাথর বসানো। হলদে স্কার্ট, লাল জ্যাকেট শরীরে। শীতের সন্ধ্যায় এলবিকে এই পোশাকে অতীব তীক্ষ্ন মনে হল। শহরের বড় রাস্তা ধরে ওরা চলেছে। আপাতত ওরা কোনো কথা বলছে না। এলবি স্টিয়ারিং ধরেছে। বিজন শহর দেখছে। বড় রাস্তা, সুতরাং বড় বড় সব কাচ—মোড়া আসবাবপত্রের কুটিরশিল্পজাত দ্রব্যের, পোশাকের অথবা মোটরের দোকান। ভিন্ন ভিন্ন সব বিজ্ঞাপন ঝুলছে। এলবি দুটো—একটা কথা বলছে এখন। শহরের এইসব দোকানের এবং কোন মুল্লুক ধরে কীভাবে রয়েল হাসপাতালে যাচ্ছে এইসব খবর দিয়ে নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে।
এলবি বলল, জাহাজ তবে অনেক দিন থাকল।
তা থাকল।
প্রায় দু’মাসের মতো হবে।
তা হবে।
পাশের পত্রিকাটা তুলে বিজনকে দেখাল। সামনে মোড় ঘুরতে হবে। নীল বাতি জ্বলছে না। সুতরাং এলবি দু’হাতেই পত্রিকাটা বিজনের হাতে তুলে দিল। —খবরটা পড়েছ?
আকাশে দেখেছি এবং পড়েছি। আচ্ছা এলবি,….বিজন একটা প্রশ্ন তুলে ধরার ইচ্ছায় ঘাড়টা বাঁকাল।—আচ্ছা এলবি….তোমাদের ভিতর থেকে কেউ তো বলেনি এ—ঘটনার সঙ্গে আমি যুক্ত? পত্রিকায় তেমন খবর নেই তো! বিজন পত্রিকাটা ধীরে ধীরে নিজের কোলের কাছে নিয়ে এল। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবটুকু পড়ল। এবং এলবির মুখ দেখে যেন বুঝতে পারছে তার আকস্মিক আড়ষ্টতায় এলবি পীড়িত হচ্ছে।
