ঘরে ঢুকেই সে মাচানের নিচে থেকে কিছু ছেঁড়া কাঁথা—কাপড় ছুঁড়ে দিল। বাপ মাচানে নেই—কোথাও বের হয়েছে। অন্য কাঁথা—কাপড় দিয়ে সে দেয়ালের ফাঁক—ফোকর বন্ধ করে দিল। তারপর শরীরের সব দুঃখ অপমান লজ্জা আক্রোশ ঝেড়ে ফেলে সব কাঁথা—কাপড় বেড়া থেকে টেনে মাচানে এনে ফেলল। কৈলাস তখন ঝাড়ফুঁক দিচ্ছে হরীতকীর বাচ্চাটাকে। কৈলাস অদ্ভুত সব মন্ত্র উচ্চারণ করছে। নেলি মাচানে শুয়ে না হেসে পারল না। কৈলাসের মন্ত্রগুলো সে নিজে নিজে আওড়াল—ইটমের বিবি চিটম খায়, পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়ায়! মা মনসার বাহন হবি, পীরের ভূত পয়গম্বরে খাবি—ফুঁঃ। মাচানে শুয়ে কৈলাসের মতো একটা জোরে ফুঁ দিল। কৈলাসের মতো চারিদিকে থুথু ছিটাল নেলি।
কিন্তু নেলি মাচানে শুয়ে থাকতে পারল না। পিসির মেয়েটা কাঁদছে। পিসি গেল রাতে উজাগর থাকল। নেলি উঠে হরীতকীর ঘরে ঢুকে গেল। কৈলাস ঝাড়ফুঁক দিয়ে বের হয়ে গেলে, সে বলল, দে পিসি হামার কোলে দে। তু এক দফে ঘুম দিয়ে লে। সারারাত না ঘুমিয়ে তুর শরীর আর শরীর নাই।
তু কোলে লিবি?
হে পিসি লিব। হামার হাতে কোনো কাজ না আছে। লতুন ঘাটবাবুর ঘর ঝেড়ে দিলাম। বাপ কাহা ভি চল গেল। বাসি ভাত আছে। বাপ বাসি ভাত খেয়ে লিবে।
তু খাবি না?
বাপ খেলে যদি দুটো থাকে খেয়ে লিব।
নেলি হরীতকীর কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিল। কাঁথা—কাপড়ে পেঁচিয়ে কোলে রাখল। —পিসি ওয়ার নাম হবে চঞ্চলা। হামি চঞ্চলা বলে ডেকে লিব।
নেলি চঞ্চলাকে দু—হাঁটুর ওপর শুইয়ে আদর করল। মুখ দেখল, ছোট ছোট চোখ, ছোট ছোট হাত—পা। এখন আর কাঁদছে না যেন। চোখমুখ নীল হচ্ছে না। কৈলাসের ঝাড়ফুঁয়ে যেন ভালো হয়ে যাচ্ছে। পিসি পাশে শুয়ে পড়ল। নেলির এ—সময় কুকুর দুটোর কথা মনে হল। ওরাও পিসির বাচ্চাটার মতো ছোট ছিল একদিন। শীতে কষ্ট পেত খুব। ওদের মা—টা মরে গেল। তখন কে দেখবে ওদের! কে আগলাবে! অফিসঘরের বারান্দায় শীতে কাঁদত রাতে। কুকুর দুটোর জন্য নেলির ভারী কষ্ট হত। একরাতে সে মাচান থেকে উঠে পড়ল এবং সন্তর্পণে বারান্দা থেকে বাচ্চা দুটোকে এনে বুকের কাছে কাঁথার নিচে রেখে ঘুম পাড়াল। বাচ্চা দুটো এতটুকু নড়ল না। এতটুকু কাঁদল না। ভোরে শুয়োরের দুধ বাচ্চা দুটোকে খাওয়াল। পুষে পুষে বড় করল। এখন ওরা গঙ্গা—যমুনা। এখন ওরা নেলির বেটার মতো। গেরু শনিয়ার মরদ হচ্ছে, বাপ দিন দিন অমানুষ হয়ে উঠছে, কৈলাস, দুখিয়া ডাইনি বলে ওকে গাল—মন্দ দিচ্ছে—সব কিছুই সে দু—বেটার মুখের দিকে চেয়ে সহ্য করে আছে। অথবা দু—বেটার জন্য এ—সবকে সে এতটুকু গ্রাহ্য করে না। কৈলাস কিংবা দুখিয়া যদি বেশি হারামি হয়ে ওঠে, রামকান্ত যদি বেশি বেইমানি করতে চায়, গেরু যদি ফের ফিরে আসে কোনো দিন, তবে সে কাউকে সালিসি মানবে না। একমাত্র গঙ্গা—যমুনাকে বলবে তুরা দেখে লে ব্যাপারটা। যা করতে হয় তুরা করে লে। হামার মা বাপ আছে তুরা।
হরীতকী এখন নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে পারছে। কাপড়ে মুখ ঢেকে মেঝেকে শুয়ে আছে। মাছিগুলো তবু যন্ত্রণা করছে পিসিকে। নেলি হাত বাড়িয়ে মাছি তাড়াল। পিসি শুয়েছে ত ঘুমিয়েছে। পিসির বিশ্বাস কৈলাসের ঝাড়ফুঁকে বাচ্চাটা ভালো হয়ে উঠবেই। নেলিরও বিশ্বাস। ওর দ্রব্যগুণের কথা, তন্ত্র—মন্ত্রের কথা নেলি এতদিন এই চটানে অনেকবার শুনেছে। অনেকবার দেখেছে। ওর দ্রব্যগুণের জন্যে শহরের বাবুরা পর্যন্ত আসেন। কতদিন দেখেছে নেলি—পুরানো অশ্বত্থের নিচে কৈলাস দাঁড়িয়ে আছে, বাবুরা এসেছেন শহর থেকে—কৈলাস মেয়েমানুষের শরীর থেকে ভূত ছাড়াচ্ছে। কতদিন যে কত পোয়াতির বাচ্চা হতে সাহায্য করেছে। সেজন্য নেলিও যেন জেনে গেছে বাচ্চাটা ভালো হয়ে উঠবেই। পিসির মতো সেও নিশ্চিন্ত হয়ে খুব হালকা বোধ করল।
কৈলাস নিজের চালাঘরটায় ঢুকে শুয়ে পড়ল মাচানে। সেই দ্রব্যগুণ, সেই জড়িবুটি, সেই ওস্তাদের দেওয়া মন্ত্র ওকে ছেড়েও যেন ছাড়ছে না। সেই ঝাড়ফুঁক, সেই জাদুমন্ত্র, সেই মিথ্যা ফেরববাজি—যার কোনো দাম নেই, কোনো গুরুত্ব নেই ভালো হয়ে ওঠার জন্য। তবু সে কেউ এলে দ্রব্যগুণের কথা আওড়ায়, জাদুমন্ত্র করে মানুষের বিশ্বাসকে মজবুত করে তোলে, হারুন রসিদের দোহাই দেয়, গেরুকে ডেকে বলে—বুঝলি, এ—বারো পেকারের তন্ত্র আছে। শুধু পুষে বড় করা বাচ্চাটার জন্যই—কেউ জড়িবুটির জন্য হাজির হলে চিৎকার করে বলতে পারে না, সব মিথ্যা, সব ফেরববাজি। গেরুটা যে তবে সব জেনে ফেলবে—একা ফরাসডাঙার কঙ্কাল তুলতে সাহস পাবে না।
যখন বাবুদের গলি থেকে সূর্য ওঠার চেষ্টা করছে, যখন রামকান্ত দোকান সাজিয়ে বসেছে—অন্ধকারের খেয়া পার হয়ে সূর্য যখন নদীর পাড়ে এসে হাজির, তখন চটানের একদিকে ভিড় জমতে শুরু করেছে। ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, মরদ, মংলি, দুখিয়া সকলে একে একে ভিড় বাড়াচ্ছে। ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, মরদ গোল হয়ে দাঁড়াল। জন আষ্টেক জিয়াগঞ্জের মরদ বাঁশে বেঁধে শুয়োর এনে ফেলেছে। ওরা মাঝরাতে লণ্ঠন হাতে রওনা হয়েছিল। ওরা চটানে পৌঁছল আর ভোর হল। ওরা এই শীতের ভোরেও ঘেমে গেছে। ওরা এখন কৈলাসের ঘরে বসে বিড়ি টানছে আর বকবক করছে।
খাসি শুয়োরটা ঘোঁতঘোঁত করছে মাটিতে। চারটে পা বাঁধা বাঁশটার সঙ্গে। তবু পড়ে পড়ে দাঁত দিয়ে মাটি তুলছে। এইসব দেখে পাশের খাটালে বাবুচাঁদের শুয়োরগুলো লাফাল, ছুটতে চাইল।
