নেলির কাছে এখন চটানের সব মানুষগুলো বেইমান। সব মানুষগুলো শুধু ভোজের কথা ভাবল। নেলির দুঃখ কষ্ট কেউ দেখল না। বাপ পর্যন্ত মাচানে শুয়ে বিড়ি টানছে। ভোজের খোয়াব দেখছে, অথবা অন্য কিছু। নেলির কিছুই ভালো লাগছে না। না এই রোদ, না রোদের উত্তাপ। না এই চটান, না চটানের মানুষগুলোকে। ঘাটোয়ারিবাবু পর্যন্ত বলছেন না, এ শাদি—সমন্দ করে তুই ঠিক করলি না কৈলাস। নেলির কথা তোদের জানা উচিত ছিল। অথচ কেউ কিছু বলছে না। নেলির অভিমানে কান্না পেতে থাকল।
দুঃখবাবু চটানে ঢুকে দেখলেন নেলি রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছে। তিনি ডাকলেন, কিরে নেলি, রোদ মাখাচ্ছিস গায়ে?
নেলি তখন মাথা গুঁজে বসে কাঁদছিল বলে উত্তর করতে পারল না। দুঃখবাবু ফের বললেন, খুব বুঝি শীত লাগছে গায়ে!
নেলি কোনোরকমে জবাব দিল, হে বাবু।
আমার ঘরটা একটু পরিষ্কার করে দিবি। আজ বিছানাপত্র নিয়ে আসব। কোনো কাজ নেই ত তোর এখন।
না বাবু কোনো কাজ নেই। আপনি যান বাবু হামি যাচ্ছি।
সে রোদ থেকে উঠে পড়ল। মাচানের নিচে থেকে একটা ঝাঁটা নিয়ে দুঃখবাবুর ঘরে ঢুকে গেল। ঘরটা কত কাল থেকে নোংরা হয়ে আছে! কবে ঝড়ের রাতে একটা মড়া এ ঘরে রাখা হয়েছিল—তার কাঁথা বালিশগুলো পর্যন্ত এখনও পড়ে আছে। ঘরটার চুনবালি খসে দিন দিন খুব নোংরা হয়ে উঠছে। দেওয়ালের ইট সব খসে পড়ছে। ঝুল ঝালড়ে ঘরটা ভর্তি। নেলি ভালো করে কাজগুলো করতে থাকল এবং ভেতরের কষ্টটাকে ভুলতে চাইল।
ঘাটোয়ারিবাবুর ঘরে দুঃখবাবু বসে আছেন। দুজনে গল্প করছেন। ঘরের গল্প। স্ত্রীর গল্প। পরিবার—পরিজনের অভাব—অনটনের গল্প। এতসব গল্প বলে দুঃখবাবু কত সুখী—এমন ধারণা করলেন ঘাটবাবু। গল্প শুনিয়ে দুঃখবাবু যেন বলতে চাইলেন, বেশ আছি মশাই। বাচ্চাদুটো ভালোমন্দ খাবার জন্য কাঁদে, বৌ—এর হরেক রকমের বায়না—যতটা পারি দেওয়ার চেষ্টা করি। না দিতে পারলে গিন্নি অভিমান করে, রাগ করে। বেশ লাগে মশাই—আছি বেশ। ছেলেটাকে ভালোমন্দ দিতে না পারলে কষ্ট হয়, কিন্তু যখন দিতে পারি, ছেলেটা ভালোমন্দ হাতে নিয়ে যখন কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বড় ভালো লাগে, বড় আনন্দ। দুঃখবাবু চোখ বড় করে আনন্দ প্রকাশ করছিলেন। —এবার মাইনে পেলে প্রথমেই বৌকে কিছু কিনে দেব। দুঃখবাবু এবার উঠলেন।—দেখি কতটা হল! দেখি গোমানির বেটি কতটা সাফ করল।
কিরে কতটা সাফ করলি? দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুঃখবাবু প্রশ্ন করলেন।
হয়ে এল বাবু। ঘর ত লয় বাবু, ভাটিখানার মজলিস। এখানে কাঁথা, ওধারে বালিশ, দেওয়ালে নোনা, চিতার কাঠের মতো সব দাঁত—বের—করা ইঁট—ঘরে ঢুকলেই ত ভয় ধরে।
দুঃখবাবু ঘরে ঢুকে ভীষণ দুর্গন্ধে নাকে কাপড় দিলেন। বললেন, কীসের গন্ধরে নেলি! ঘরে থাকা যাচ্ছে না।
আর কীসের গন্ধ! পচা ইঁদুরের গন্ধ বাবু, ঐ দেখুন না বাবু, কেমন ফুলে—ফেঁপে আছে! আপনি আভি যান! হলে ডাকব। তখন আর কোনো গন্ধ পাবেন না। যখন নেলির হাত লেগেছে, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। নেলি আশ্বাস দিল দুঃখবাবুকে।
বস্তুত এ কাজগুলো করতে করতে নেলি নিজের দুঃখটা বেমালুম ভুলে গেল। গেরুর শাদি হবে, শনিয়া চটানে বৌ হয়ে আসবে, শুয়োরের গোস্ত হবে, মজলিস বসবে—রোজকার ঘটনার মতো এগুলো ওকে আর দুঃখ দিচ্ছে না। সে ঝুল ঝাড়ল, ঘরের মেঝেটা ভালো করে পরিষ্কার করে দিল, পচা ইঁদুরগুলোকে সামনের একটা ডোবায় ফেলে এল, মড়ার কাঁথা—কাপড়গুলোকে বাইরে বের করে আগুন ধরিয়ে দিল। তারপর একটু বিশ্রাম নেবার সময় নেলি দুঃখবাবুকে বলল, বাবু চটানে ত ভোজ লেগে গেল। গেরুর শাদি হবে জিয়াগঞ্জে। আপনি যাবেন না ভোজ খেতে জিয়াগঞ্জে।
গেরুর শাদি হবে তুই যাবি না?
হামাকে কে লেবে বাবু?
কেন নেবে না? ঘাটোয়ারিবাবু বললেন, সবাই যাচ্ছে। তিনি পর্যন্ত যাবেন।
লেকিন হামি যাবে না বাবু। হামাকে ওরা লেবে না। নেলি এইটুকু বলে আর দাঁড়াল না। হয়তো দাঁড়াতে পারল না। ফের সেই দুঃখটা বুক বেয়ে গলা ধরে উপরে উঠছে।
যে দুঃখটা নেলির গলা বেয়ে উপরে উঠে আসছে সে দুঃখটাই ওর চোখ দুটোকে সর্পিল করে তুলল। সে মনে মনে সাপের মতো হিসহিস করছে। সে চোখ তুলে চারিদিকে চাইল এবং হাঁটতে থাকল। দুটো ষাঁড় শিং নিচে নামিয়ে তেড়ে আসছে। দুটো গোরু চরছে অন্যত্র। ওরই বয়সি দুজন মেয়ে গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছে। ওরা হাসছে। ওদের পিঠে রোদ। শাড়ির আঁচলে ওদের হাসির কৌটা যেন বাঁধা। সমস্ত লজ্জার মাথা খেয়ে এ সময় বিশ কাটালির ঝোপে একটা মানুষ বসে পড়ল। নেলি নিজের শরীরের ওপর এ সময় বিরক্ত হয়ে পড়ছে। মানুষটা বিশ কাটালির ঝোপে, দুটো ষাঁড় লড়ছে, আঁচলে হাসির কৌটো বাঁধা, আর পেটে ওর যে দুঃসহ ব্যথা—সব মিলে দুঃসহ ভাব সর্বত্র। তলপেটে পরিচিত ফিক ব্যথাটা ক্রমশ নিচে নামছে। যত নামছে তত অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে পৃথিবীটাকে। শরীরটা এই শরীরটা এই মুহূর্তে নোংরা হবে জেনে সে আর নিচে নামল না। বড় অস্বস্তি এ—সময় ওর। শরীরটাকে নিজের বলে ভাবতে কষ্ট হয়। কিছু ভালো লাগে না। ইচ্ছা করে মাচানে সারাদিন পড়ে থাকতে, মাচানে পড়ে ঘুমোতে, শরীর কাঁথা—কাপড়ে আড়াল রেখে একটা গোপন গভীর কষ্টকে ঢেকে রাখতে। একটা দুঃসহ লজ্জাকে ঢেকে রাখতে। সেজন্য সে ঘাটের দিকে নেমে গেল না, গেরুকে খুঁজে দুটো কথা বলবার সময় হল না। যতটা সত্বর সম্ভব সে চটানে উঠে গেল।
