বাবুচাঁদ শুয়োর নিয়ে আজ বের হবে না। বিকেলে জিয়াগঞ্জ যাবে গেরুর সঙ্গে। সে ঘরে বসে লাঠিতে তেল খাওয়াচ্ছে। সেজন্য শুয়োরগুলো খাটালেই পড়ে থাকল কাদার মধ্যে—নাক—মুখ ডুবিয়ে পড়ে থাকল। মাঝে মাঝে খাসি শুয়োরটার চিৎকারে ওরা যেন অন্যমনস্ক হচ্ছিল। যেন দেখছিল—আহারে!
নেলি ওর ঘরে বসে বলছিল—আহারে!
মংলি হাই তুলতে তুলতে বলছিল, আহা শুয়োর বটে একখানা। যেমন চর্বি তেমন গোস্ত।
ঝাড়োর বৌ বলছিল, খেয়ে সুখ হবে।
চটানের উপরেই শুয়োরটা খুন হবে। বাপ গোমানি খুন করবে। বাপ ক্রমে লাশ কাটা ঘরের মতো চেহারা ধরবে। বাপ দা দিয়ে বসে বসে এখন বাঁশ সরু করছে—চাঁচছে। আঙুল টিপে টিপে খুঁটির ধার দেখছে। এ—সময় ওর জিভটা মুখ থেকে বের হয়ে আসবে। কাজ করবে আর, জিভ কামড়াবে গোমানি। বেশ মিহি; বেশ সরু করে খুঁটির মুখে ধার দিচ্ছে। গোটা চারেক হলে চলবে আপাতত। কোমরের দু পাশে দুটো, গলার দু পাশে দুটো বসিয়ে দেবে। এবং লোহার শিকটা গরম করে লেজের নিচে দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেই হবে। একটা খাসি শুয়োর খুন হবার পক্ষে এই যথেষ্ট। গোমানি বাঁশ চাঁচবার সময় এমন সব ভাবছিল এবং জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছিল।
গিরিশও বসে নেই। সে বড় বড় সব কলাপাতা কাটছে। কলাপাতা এনে চটানে জড় করছে। শুয়োরটার চারপাশের বাচ্চাগুলো এখন ঢিল ছুঁড়ছে—শুয়োরটার মুখে ঢিল ছুঁড়ে ওরা পরিতৃপ্ত হচ্ছে। ঘাটোয়ারিবাবু জানলা দিয়ে দেখছেন। হ্যাঁ মৃত্যু বটে শুয়োরের মৃত্যু। তিনি জানলার গরাদে হাত রেখে এ সব ভাবলেন। নেলি ঘরে বসে দেখল। সে বের হল না, বের হয়ে শুয়োরের মৃত্যু দেখল না। নতুন বাবু চটানে নেই, তিনি বিকেলে আসবেন। মাচানে শুয়ে শুয়ে নেলি নতুন বাবুর কথা ভাবল। গেরুর বিয়েতে সে যাবে না, পিসিও যাবে না, তিনি যাবেন না। যখন সকলে দল বেঁধে জিয়াগঞ্জে যাবে তখন তিনি ঘাটের পাহারায় থাকবেন।
অথচ আজ নিয়ে চার রাত নেলি মাচানে ঘুমাতে পারল না। সে নিজেও বুঝতে পারেনি যে গেরুর শাদিতে সে এতটা ভেঙে পড়বে। অথচ যত দিন গেল আপশোশটা তত বাড়ল। গেরুর সঙ্গে যতবার দেখা হল, ততবার সে নিজেকে আড়াল দিল। আগের মতো উচ্ছল হল না। হাসি—মস্করা করল না। গেল কাল থেকে নেলি নিজের ঘর থেকেই বের হল না। বের হতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কতবার সে গেরুর গলার আওয়াজ পেল, কতবার গেরু এ—ঘরে ঢুকে ডেকেছে। নেলিকে, কতবার বলেছে, নেলি তুর বাপ কুথিরে? নেলি সবই আন্দাজ করতে পারল। আন্দাজ করল—গেরু বাপের নাম করে এ—ঘরে সে তার দুঃখ জানাতে এল। আপশোশ জানাতে এল। তখন নেলি কোনো জবাব দেয়নি, চুপ করে থেকে গেরুকে ফিরিয়ে দিয়েছে। অথবা বড় বড় চোখে দেখেছে গেরুকে এবং ভেবেছে গেরু তু সব ভুলে গেলি!
ভেবেছে মরদ এত বেইমান হয়, মরদ এত আহম্মক হয়। মরদ এমন পাগল বনে যায় মেয়েমানুষের জন্য। মেয়েমানুষের শরীরের জন্য এত লুকলুক! এত হয়রানি! এত খানাপিনা! এত গোস্তের ঝালঝুল শনিয়ার শরীরটাকে চটানে তোলার জন্য। নেলি গেরুকে ফিরিয়ে দিয়ে এমন সবই ভাবল কেবল।
শুয়োরটা যত চিৎকার করছে, যত দাঁত দিয়ে মাটি তুলছে, যত মুখে গাঁজলা তুলছে, তত যেন নেলি ভেঙে পড়ছে। তত নেলি মাচানে শুয়ে শুয়োরের কষ্টটুকু নিঃশেষে ধরতে পারছে। বাপ শুয়োরটার কোমরের দু পাশে গলার দু পাশে বাঁশের শলা পুঁতে দিচ্ছে। লেজের নিচে লোহার শিক—ভয়ানক বীভৎস! গোমানি শুয়োরটাকে যেন লাশ—কাটা ঘরে এনে ফেলেছে—শুয়োরটা শুয়ে আছে, গোমানি শুয়োরটার কপালে হাতুড়ি ঠুকছে। গোমানি লোহার শিকটা কাঠের আগুনে লাল করেছিল। এই বাড়তি দয়াটুকু বাপের কেন যে হল, নেলি বুঝতে পারছে না! আহা! শুয়োরটা মরবে এখন। বড় কষ্ট পেয়ে মরছে। বাপ গুণে গুণে যত শলা পুঁতল তত লোক জমল চটানে। রামকান্ত পর্যন্ত ছুটে এল। বলল, দেখি, দেখি, কী করে পুঁতলি। দেখি, দেখি, কতটা পুঁতলি। আঃ হাঃ ওতেই হবে, বড় দাঁতাল দেখছি।
গোমানি বলল, না বাবু, ও মরবে না। ওয়ার ত কচ্ছপের জান। দাঁড়িয়ে দেখে লেন, আউর ভেবে লেন, কেতনা হারামি আছে ও। সহজে শালা মরছে না বাবু।
গোমানি আর একটা শলা চেঁচে শুয়োরটার পেটে পুঁতে দিল। মোটা এবং গোরুর খোঁটার মতো শলাটা চড়চড় করে ভিতরে ঢুকে গেল। তার ওপর গোমানি মুগুর দিয়ে ওটায় তিন চারটে বাড়ি মারল। শুয়োরটা মুখ দিয়ে কতক রক্ত উগলে দিল। শুয়োরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে মুখটা হাঁ করে বীভৎস করে তুলছে। ডোমেদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো তবু ঢিল ছুঁড়ল। দুটো কাক ডাকল ঝাউ গাছটায়। ওরা ঘুরে ঘুরে উড়ল শুয়োরটার উপর। মংলি ঝাঁটা নিয়ে কাক তাড়াল।
গিরিশ পাতাগুলো জড়ো করে বিছিয়ে রাখবে—পাশাপাশি সাজিয়ে রাখছে। গোমানি আগুন জ্বালাল। সকলকে ডেকে শুয়োরটাকে আগুনে তুলে সেঁকে নিল। আগুনের উপরও শুয়োরটা রক্ত উগলে দিল। শেষবারের মতো শরীর থেকে রক্ত বের করে শুয়োরটা এবার সোজা হয়ে শক্ত হয়ে গেল। গোমানি খুশি হল—শালে এতক্ষণে গেল।
নেলি শুয়ে শুয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে সব দেখল। সব চেঁচামেচি শুনল। বাপের কাণ্ডকারখানায় বিরক্তবোধ করল। যেন সাত জন্মে শুয়োর খায়নি বাপ। যেন সাতজন্মে এমন ভোজের আয়োজন বাপ চটানে দেখেনি। নেলি বিরক্ত হয়ে কাঁথা—কাপড় ফেলে উনুনের একপাশে বসে পড়ল। শুয়োরটার কষ্ট শেষ হওয়াতে সে হালকাবোধ করল।
