ঘন আঁধারে চটানের আলোগুলো যেন ভূতুড়ে চোখ। ভূতুড়ে গন্ধ যেন চারিদিকে। আসশ্যাওড়ার জঙ্গল পুরোনো অশত্থগাছটার পাশে। সেখানে ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। সেখানে আকন্দ গাছে ফুল ফুটেছে। শিশির পড়েছে। শীতের কীট, শীতের পতঙ্গ—শিশিরে ভিজে ঘুমোচ্ছে। দূরে আলো, শহরের আলো। ওপারে ট্রেনের শব্দ। নদীর ঢালুতে মড়াটা পড়ে আছে। শিয়রে লণ্ঠন জ্বলছে। মড়াটার পাশে দুটো লোক বসে। ওরা শীতে কষ্ট পাচ্ছে। ওরা হরিধ্বনি দিয়ে মড়াটা চিতায় তুলে দিল। আগুনটা ধীরে ধীরে সব কাঠগুলোকে, মড়াটাকে গ্রাস করার জন্য উপরের দিকে ধেয়ে উঠছে। যেন স্বর্গের সিঁড়ি তৈরি করছে। মানুষগুলোর মুখ লাল হচ্ছে ওরাও সিঁড়িতে পা রাখার জন্য যেন প্রস্তুত হল। ওরা ফের হরিধ্বনি দিল। চটানে তখন যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার রাতটা বোবা হয়ে গেল, ঘন হয়ে গেল। মনেই হবে না এই সব দেখে—মড়া জ্বলছে। মনেই হবে না পৃথিবী থেকে একটা মানুষ চলে গেল। তার সুখ—দুঃখ চলে গেল। তার অনুভূতি—আবেগ চলে গেল। যেন কিছুই হয়নি—অথবা এমন হওয়াই স্বাভাবিক। হামেশা এটাই হচ্ছে। আগুন জ্বলছে আর স্বর্গের সিঁড়ি তৈরি হচ্ছে অথচ এ—মানুষটারও জন্ম হয়েছে। ছ’দিনে ষষ্ঠী, শেষে বিয়ে। ঘর—সংসার। ঘর, সুখ, শখ—সব! শুধু ঘাটের সুখটা জানা ছিল না। আজ সে তাও পেল। স্বর্গের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দুনিয়াকে শেষবারের মতো আদাব দিল আজ।
ভোরবেলায় খবর শুনে চটানের সকলে আশ্চর্য হল। নেলি রোদে পিঠ দিয়ে বসে সব শুনছে। কৈলাস ডোম সকলকে ডেকে ডেকে বলছে, গেরুর শাদি ঠিক হো গিলরে গোমানি। ও ঝাড়ো, বাত শুনলি ত? গেল রাতে ঠিক করে লিলাম গেরুর শাদি। তু ত চিনিস নন্দুয়াকে। নন্দুয়ার বিটি।
গেরু চটানের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছে। ঘরে ঢুকে নেলিকে দুবার দেখবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু দেখতে পায়নি। রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছে নেলি। একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে একটা একটা করে আঁক দিচ্ছে এবং এক দুই করে গুনছে। কৈলাসের খবরকে যেন পাত্তাই দিল না। খবরটা শুনে চটান থেকে মুখ তুলল না পর্যন্ত। গেরুর ইচ্ছা এখন ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ওর মুখটা দেখে। মুখে কোন কোন ইচ্ছার রং ধরছে—সে দেখারও ইচ্ছা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে পারল না। যেতে সাহস হল না। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে এল। বাপ তখন চটানের ঘরে ঘরে খবর দিয়ে বেড়াচ্ছে, পুষে বড় করা বাচ্চাকে চটানে বেঁধে দিয়ে গেলাম। বাঁচি মরি গেরুকে দেখার একটা লোক থাকল। কৈলাস, এমন সব কথা বলছিল, আর ঘরে ঘরে খবর দিয়ে বেড়াচ্ছিল।
ঝাড়োর বিবি বলল, কী দেবে বেটাকে?
একটা শুয়োর দেবে বুলছে।
দুখিয়া বলল, খুব খরচপত্তর করবি ত?
জরুর। করব না ত টাকা হামার খাবে কে? এক বেটার শাদি হামার—কম শখের কথা! কী বুলিসরে গোমানি?
তা বটেক। হাম ভি এক দফে কাহা ভি চলে যাবে। বিটির শাদি ঠিক করে লিব। হাম ভি খরচ—পত্তর করবে ভাবছে। হামার ভি এক ভি বিটির শাদি। খরচ—পত্তর না করবে ক্যানে।
মংলি তখন মুখে কাপড় চাপা দিয়ে খুকখুক করে হেসে দিল। কৈলাস বলল, তা দিবি। দেবার ত সময় হয়েছে বটেক। গোমানি মাচানে বসে সকলকে জোরে বলল, দিব, দিব। ঠিক শাদি দিয়ে লিব। হামি কী কৈ আদমিসে কম রোজগার করি! তবে—তবে—তামাশা ক্যানে? মস্করা ক্যানে? তবু চটানের সকলে নেলির শাদি—সমন্দকে তামাশা বলে ভেবে নিল।
কৈলাস ঘাটোয়ারিবাবুর ঘরে ঢুকল। বাবুর পায়ে গড় হল। বলল, আপনার—আওর—ডাক ঠাকুরের কিরপায় গেরুর শাদি—সমন্দটা হয়ে গেল। চার রোজ বাদ নন্দুয়ার বিটিকে লিয়ে আসছি। বেটার লাগি ইবার ভিন্ন ঘর করে লিব। আপ বুলেন ত আজই করে লিচ্ছি।
ঘাটবাবু বললেন, বলিস কিরে! শাদি—সমন্দ তবে লাগালি!
হে বাবু করে লিলাম। জান আওর দিচ্ছে না, এক রোজ ত মর যাওগে বাবু। টাইম ভি ত হয়ে গেল। লেকিন বেটার হিল্লে করে না দিলে ওকে কোন দেখবে?
বেটাকে ওরা দেবে কী?
একটা শুয়োর দেবে। শুয়োর না দিলে শুয়োরটার দাম দেবে বাবু। লেকিন হামি বুলে দিয়েছি হামি শুয়োর লিব। বুলছে খাসি শুয়োর দেবে। বিয়ের দিন ভোরে শুয়োরটাকে লিয়ে আসবে। শুয়োরটা চটানে জবাই হবে। শুয়োরের গোস্ত হবে। পচাই আসবে। বিকালে হামরা সব গোস্ত, পচাই লিয়ে জিয়াগঞ্জ যাবে। বাবু আপ ভি চলিয়ে না। খুব খুশিকী বাত হবে।
নেলি তখনও রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছে। ওর শীত আজ শরীর থেকে যাচ্ছে না। যেন সে নড়বে না এমনই একটা শপথ করেছে। গেরু দূরে দাঁড়িয়ে সকলের আড়ালে অনেকক্ষণ নেলিকে দেখল। তারপর চটান থেকে নেমে গেল। বাপের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারল না, হাম শাদি না করবে বাপ। তু এ শাদি তুলে দে।
নেলি কিন্তু রোদ থেকে উঠল না। নেলি এই রোদে বসেই বুঝতে পারছে গেরু চটান থেকে নেমে গেল। গেরুর মনের ইচ্ছা যেন নেলি ওর সঙ্গে চটান ছেড়ে নামুক। এই বোধের জন্য নেলির বিরক্তবোধ গেরুর ওপর আরও বাড়ল। সে ভাবল, কী দরকার? বরং এই রোদ ভালো, রোদের এই উত্তাপ ভালো, গেরুর কাছে গিয়ে সে কী শুনবে! যে মরদ সকলের সামনে কিছু বলতে পারল না, চটান থেকে নেমে সে আর কী বলবে? কী আর অন্তরের কথা শোনাবে?
নেলি সেজন্যে উঠল না। যে—ভাবে বসেছিল ঠিক সেইভাবেই বসে থাকল। রোদে বসে গেরুর ওপর অভিমানে ফেটে পড়ছে। —ছিঃ ছিঃ তা কিছু বলতে লারলি! সকলের সামনে তুর বাপ হল্লা করে বলল, গেরুর শাদি ঠিক হো গিল। তু তখন বোবা বনে গেলি! কোনো জবাব দিতে লারলি। লেকিন তু হামারে লিয়ে চটানের নিচে নেমে যেতে চাস। সেখানে তু কী বুলবিরে মরদ, কী বুলবি! হামি জানি তু কিছু বুলতে লারবি। রাগে, দুঃখে, নেলির ভেতরটা ফুলে ফেঁপে উঠছে। চটানের চারিদিকে হল্লা। গেরুর শাদি হবে বলে, সকলে হল্লা করছে। গেরুর শাদি হবে বলে, সকলে ভোজ পাবে বলে, ঘরে ঘরে খুশির কথা। গোমানি পর্যন্ত কৈলাসকে ডেকে বলেছে, হামার লাগি তু থোড়া বিলিতি মাল লিবি। লয়তো হামার জমবে না। হাঁড়ি হাঁড়ি পচাই গিলে শাদি—সমন্দে সুখ নেই। তুর ত এক বেটার শাদি।
