ঘাটোয়ারিবাবু সব কথাগুলো স্মরণ করে না হেসে পারলেন না। তিনি নিজেও জানেন না, হরীতকীর বাচ্চাটা ওঁর না চতুরার। এ—কথা হরীতকী, নিজেও জানে না। চতুরাকে নিয়ে ঘর করতে করতে মাঝে মাঝে যে উদবৃত্ত সময়টুকু ঘাটবাবুকে সে দিত, সে বড় অল্প। বড় কম সময়। অথচ হরীতকীও চতুরার মৃত্যুর পর বুঝল ঘাটবাবুরও এ—চটান ভিন্ন গত্যন্তর নেই। এ—চটান ভিন্ন তিনি অন্যত্র বাঁচতে পারবেন না। সে শুধু যেন অর্থের জন্য অথবা অভাবের জন্য নয়। কারণ এও যেন জীবনের অন্য সত্য। আপনার মনে হয় না আপনিও মরবেন একদিন? তবে আর সংসার—সংসার করে লাভ কী? অত সুখ দুঃখ ভেবে কী হবে! বরং চলে আসুন না এই চটানে, সারারাত সারাদিন এখানে পড়ে থাকুন। ডোমেদের নিয়ে ঘরকন্না করুন। যথার্থ ঘাটোয়ারিবাবু হয়ে দুনিয়ার সব সুখ, সব শখকে তফাত রাখুন।
আবার যখন রাত হয়, চটানে কেউ জেগে থাকে না, যখন ঘাটে কোনো মড়া জ্বলে না, তিনি সন্তর্পণে উঠে কাঠের বাক্সটা খুলে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। বাক্সর ভিতর অনেক গহনা। রসকলির গহনা। এই দুই করে গহনাগুলো গুণবেন, এক দুই করে গহনাগুলো সাজিয়ে রাখবেন। রসকলি মৃত্যুর আগে ঘাটবাবুকে ডেকে সব গহনা দিয়ে বলেছিল, আমি চলেছি, তুমি এবার ঘর কর। রসকলির তীর্থে যাওয়া হল না। গলির আঁধারেই রসকলির ভয়ানক রোগে মৃত্যু হল। অথচ এখন মনে হবে—এই চটানে এই কাঠের বাক্সর জন্য তিনি বেঁচে আছেন। সেজন্য চটান ছেড়ে তিনি অন্যত্র গেলেন না। নিঃসঙ্গ জীবনে রাতের কোনো নির্জন সময় ওঁর জীবনে বৈচিত্র্য বয়ে আনে। তিনি বাক্স খুলে গহনা দেখেন, গহনার সঙ্গে রসকলির মুখ দেখেন। রসকলির হাসি—মস্করা শুনতে পান। ভালোবাসার কথা শুনতে পান। এই সব কথা ভেবে তিনি একটু দুঃখ পেতে চান। আপনজনের দুঃখ। আপনজনের বিয়োগ—বেদনা। জীবনে তিনি এই দুঃখটুকুর স্পর্শের জন্যই রাতের আঁধারে কাঠের বাক্সটা খুলে বসেন এবং পৃথিবীকে ভালোবাসতে চান। আবার এমনও হয়—কাঠের বাক্সটা খুলে বসে আছেন, অথচ রসকলির মুখ স্মরণে আসছে না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে মুখটা, কোথায় যেন পালিয়ে আছে রসকলি। যতবার তিনি মুখটা স্মরণ করতে চান, ততবার মুখটা কাছে এসে মাকড়সার জালের মতো কাঁপতে থাকে। যত দিন যাচ্ছে ততই যেন একটা ঘটনা বেশি ঘটছে। ততই তিনি রসকলিকে ভুলতে বসেছেন। একটু ব্যথা এবং বেদনার স্মৃতিতে তিনি এখন বাঁচতে চান। কিন্তু মনের এই নিষ্ঠুর গণ্ডি অতিক্রম করে কিছুতেই তিনি সেখানে পৌঁছাতে পারেন না। শুধু মৃত্যু, মৃত্যু। এই মৃত্যুর নিষ্ঠুর পরিণতিই ঘাটবাবুকে দিন দিন অচল করে তুলছে, অনড় করে তুলছে। ঘাটের মতো নির্দয়—নিষ্ঠুর করে তুলছে। কোনো কোনো দিন ঘাটোয়ারিবাবু এই সব ভাবতে ভাবতে চোখ ঢেকে চেয়ারে বসে থাকতেন। কাঠের বাক্সটা খোলাই থাকত।
কোনো দিন দরজায় শব্দ হত। দরজাটা ঠকঠক করে কাঁপত। তিনি ভাবতেন রসকলি এল। ভাবতেন, রসকলির প্রেতাত্মা এসে ওঁকে ডাকছে। অথবা মনে হত রসকলির প্রেতাত্মা সব গহনা ফেরত নিতে এসেছে। তিনি তখন ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারটাতে বসে থাকতেন। এবং চেয়ার থেকেই জবাব দিতেন—কে, কে দরজায়?
আমরা মড়ার লোক বাবু। বহুদূর থেকে এসেছি বাবু। আমরা সাতকান্দির মড়া পোড়ার দল বাবু।
ঘাটোয়ারিবাবুর দরজা খুলতেন না। ওদের বলতেন, কাউন্টারে এসো। তিনি ভয় পেতেন। হয়তো রসকলির প্রেতাত্মা সকল মানুষকে বলে বেড়িয়েছে—ঘাটবাবুর কাঠের বাক্সে কী আছে জান না? অথবা ঘাটবাবুর ধারণা—হয়তো চটানের সবলোক জেনে ফেলেছে—বাক্সটাতে জড়োয়া গহনা আছে। তিনি কখনোই রাতে দরজা খুলে বসে থাকতেন না। তিনি বলতেন, কাউন্টারে এসো। তিনি বলতেন, যা হয় কাউন্টার থেকে বল।
লোকটা কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়াল।
যে চটানটা এতক্ষণ ঝিমিয়ে ছিল যে চটানটা নেশা ভাঙ করে এতক্ষণ ঝিমুচ্ছিল, মড়া আসছে শব্দে সেই চটানটাই আবার জেগে উঠল। আবার সোজা হয়ে বসল।—ওরে ওঠ ওঠ। ও নেলি, দেখ মড়া এসেছে। ঘরে ঘরে তখন লম্ফ জ্বলল। ঘরে ঘরে তখন ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি। ঘরে ঘরে কথাবার্তার শব্দ। দুখিয়া উঠল। মংলি উঠল, দুখিয়া পাগড়ি বাঁধল মাথায়। হাতে লাঠি নিল। মংলি এত ঘুম যে উঠতে পারছিল না, তবু উঠল। কাঠের দরজা খোলার শব্দ হচ্ছে। কাঠ মাপছে ঝাড়ো। ডোমেদের মেয়েমরদেরা কাঠ বয়ে নিচ্ছে। একমাত্র হরীতকী ওঠেনি। বাচ্চাটার শরীর ভালো যাচ্ছে না। টোকায় ধরেছে। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে নীল হচ্ছে, লাল হচ্ছে। কৈলাসের জন্য রাত জেগে বসে আছে হরীতকী। বাচ্চাটাকে হাঁটুর ওপর রেখে পেটে গরম তেল মাখিয়ে দিচ্ছে। মুখটা দেখে কষ্ট হচ্ছে—হরীতকী কাঁদছে। নিঃশব্দে। কৈলাস যদি থাকত এ—সময়! ওর ঝাড়ফুঁক, জাদু মন্তরে বড় বিশ্বাস হরীতকীর।
ঘাটে চিতা সাজানোর ভার হরীতকীর। শরীর ভালো নয় বলে সে যাচ্ছে না। সে নেলিকে ডেকে বলল, তু আজ চিতার কাঠটা সাজিয়ে দে নেলি। পয়সা যা হবে তু লিবি।
নেলি যখন গেরুর পাশ কেটে নদীতে নামল, তখন একটা ছোট—রকমের খেউড় দিল গেরুকে। নেলির মাথায় কাঠ। গেরুর মাথায় কাঠ। নেলি ঠেস দিয়ে বলল, তুর বহু আসছেরে গেরু, তুর বহু হামার মরদ হবেরে, মরদ হবে। ঠেস দিয়ে গেরুকে এই ধরনের কথা বলে খুশি হল নেলি।
