কোথাও কোনো মানুষের সাড়া না পেয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ মাটিতে পড়ে থাকল। শরীরে যত শীত লাগছে, নেশাটা যেন ওর তত জমে আসছে। সে মাটিতে পড়ে থেকেই বলল—অহ!
কিছুক্ষণ পর গোমানি উঠে বসল, কিন্তু দাঁড়াতে পারল না। দাঁড়াতে গিয়ে ফের পড়ে গেল। মা বসুন্ধরা বড় বেশি দুলতে শুরু করেছে। সে ক্ষেপে গেল। শুয়ে শুয়েই সে বসুন্ধরার কপালে লাথি মারতে লাগল।—আপদ!
সে শুয়ে শুয়ে আবার বলে, মা বসুন্ধরা, তু একটু থামবিনে? মেয়েটা হামার বাজারে গেছে মা। তু যা দুলছিস, নেলি হামার নিগঘাত আছাড় পড়বে। তু দুলবি না মা। দোহাই তুর গোমানি বাপের। গোমানি এবারেও একটা ওয়াক তুলল।
ঘরে চাল ছিল বলে নেলি ভালো সওদা করতে পারল। খাসির গোস্ত, তেল মসলা সব নিল হিসাব করে। রাত করে ঘরে ফিরল। চটানে আঁধার নেমেছে বলে ঘরে ঘরে লম্ফ জ্বলছে। কৈলাস ডোম এখনও চটানে ফেরেনি। ফেরার পথে ফরাসডাঙায় হয়তো রাত কাটিয়ে আসবে। কাল ভোরে সঠিক খবরটা পাবে নেলি। ঝাড়ো ডোমের বৌ, বারান্দায় পাঁতি তুলছে। ঝাড়ো পাঁতি দিয়ে ডালা কুলো তৈয়ার করছে। অন্য ঘরে কিছু নেশা জমেছে। হরীতকী ক—রোজ নেশা করতে পারল না। বিকেল থেকে বাচ্চাটা অনবরত ট্যাঁ—ট্যাঁ করে কাঁদছে। ওর বিশ্বাস কৈলাস ঝাড়ফুঁক দিলে বাচ্চাটা ভালো হয়ে যাবে।
নেলি ঘরে ঢুকে দেখল বাপ চটানে ফেরেনি এখনও। নেলি বিরক্ত হয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। বাপ নিশ্চয়ই এখনও কোথাও পড়ে আছে। গঙ্গা—যমুনাকে নিয়ে সে আঁধারে বাপকে খুঁজতে বের হয়ে গেল। এবং চটান থেকে নেমেই দেখল, চটানে উঠবার মুখে গোমানি শুয়ে শুয়ে কেবল ওগলাচ্ছে। দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। নেলি নাকে কাপড় দিয়ে বাপকে টেনে তুলল এবং বাপকে ধরে শীতের গঙ্গায় চুবিয়ে আনল। শেষে ধরে এনে মাচানে শুইয়ে দিয়ে বলল, বকবক করবি ত এখন মাথায় পোড়াকাঠের বাড়ি মারব বলে দিলাম। চটানে পড়ে হয় ঘুমোবি, লয় মাচানে আগুন ধরিয়ে দেব।
নেলি উনুনে কাঠ গুঁজে দিল। লম্ফ থেকে আগুন দিল কাঠে। আগুনটা বাড়িয়ে দিল। মাচানে বাপ শীতে হিহি করে কাঁপছে। আগুন পেয়ে বাপ কিছুটা যেন তাজা হল। নেলি আগুনটা বারবার উসকে দিচ্ছে যাতে বাপ তাড়াতাড়ি গরম হয়, যেন বাপ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে পারে। বাপের বকবক আর ভালো লাগছে না। মনটা ভালো নেই। দুঃখবাবু হয়তো এতক্ষণে চলে গেছেন। অফিসঘরে এখন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। গেরু নিশ্চয়ই মাচানে শুয়ে আছে, নিশ্চয়ই ঘুমোতে পারছে না। শরীরে যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
অফিসঘরে দুঃখবাবু নেই। তিনি চলে গেছেন। কাল থেকেই পাশের ঘরটাতে থাকবেন এ ঠিক হল। তবে রোজ রাতে থাকবেন না, মাঝে মাঝে থাকবেন। ঘটোয়ারিবাবুর সুবিধে—অসুবিধে দেখে তিনি এখানে রাত কাটাবেন। ঘরে বৌ আছে, বাচ্চা আছে, রাতে এখানে থাকার অসুবিধা আছে। দুঃখবাবুর দুঃখ বুঝেই যেন তিনি বলেছিলেন, রাতে এখানে না থাকলেও চলবে আপনার। যতদিন আমি আছি মাঝে মাঝে হাজিরা দিলেই চলবে।
দুঃখবাবু বলেছেন তখন, না আপনি বুড়ো মানুষ। মাঝে মাঝে রাতে আমি থাকব বৈকি! তবে বুঝতেই পারছেন বৌ বাচ্চা নিয়ে ঘর। পুরো সংসার।
ঘাটোয়ারিবাবুর ইচ্ছা হল জানতে দুঃখবাবুর ছেলে কটি। ওরা কত বড়। ওরা কী করে, দুঃখবাবু চটানে আসবার সময় ওরা কাঁদে কিনা। ওরা কদমা খেতে চায়, কমলা খেতে চায় হয়তো। না দিলে তারা কেমন করে—সে জানারও ইচ্ছে ঘাটোয়ারিবাবুর। না দিলে ওরা হয়তো কাঁদে, তখন দুঃখবাবুর কষ্ট হয়। দুঃখ হয়, মনে হয় ওরা মরবে একদিন। এই চটানে বয়ে আনতে হবে। আপনি, নয় আমি, নয় অন্য কোনো ঘাটবাবু ওদের হিসাব রাখবে। আপনার মনে হয় না—আপনিও মরবেন একদিন। তবে সংসার সংসার করে লাভ কী! অত সুখ—দুঃখ ভেবে কী হবে! বরং চলে আসুন চটানে। সারাদিন সারা রাত এখানে পড়ে থাকুন। ডোমেদের নিয়ে ঘরকন্না করুন। যথার্থ ঘাটোয়ারিবাবু এ—সব বলতে পারেননি। প্রথম কিংবা নতুন বলেই হয়তো। কিংবা সংসারী মানুষকে ঘেঁটে লাভ কী!
তা ছাড়া তিনি নিজেও রসকলিকে নিয়ে কম ডুবে ছিলেন না। রসকলির ঘর বাঁধার শখকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন।
রসকলি বলত, আমি এ—চটানেই ঘর বাঁধব!
ঘাটবাবু বলতেন, তা হয় না।
অর্থের অভাবের জন্যেই তিনি অন্যত্র যেতে পারেননি।
রসকলি বলেছে অন্যত্র যাব!
না, তা হয় না। অর্থের অভাবকে আমার বড় ভয়।
তবে এ—চটানেই। ঝাড়ো, গিরিশ ঘর করতে পেরেছে যখন।
ওরা পারে। ওরা গঙ্গাপুত্তুর। ওরা সব পারে। ওরা শিবের মতো। ওদের ঘর করা এখানেই সাজে অন্যত্র সাজে না।
রসকলির বাসনা তিনি পূরণ করতে পারলেন না। শেষ দিকে রসকলিকে তেমন মধুর মনে হত না। রসকলির মৃত্যুর কিছু পূর্বে তার প্রতি ওঁর কেমন বিরক্তবোধ জন্মেছিল। রসকলিকে শেষ দিকে বলেছেন, সংসারের সং সাজতে ইচ্ছে নেই। তিনি মনুষ্য চরিত্রকে ব্যাঙের মতো লাফ দিতে দেখে নিজের মনেই হেসেছেন। রসকলির প্রতি ভালোবাসা এবং বিরক্তবোধ উভয়েই ব্যাঙের মতো উল্লম্ফন মনে হয়েছিল।
হরীতকীকেও তিনি সেদিন বলেছেন, সংসারের সং সাজতে ইচ্ছা নেই।
হরীতকী বলেছে সংসারের সং সাজতে তুকে বুলেছি। আর বুলবে না। পেটটাকে লিয়ে এতদিন ভয় ছিল। পেটটা খালাস হয়ে হামাকে খালাস করে দিল। হামাকে লিয়ে তুকে আর কোথাও যেতে হবে না। কোথাও আর পালাতে বুলব না। হামার নসিব লিয়ে হামি বাচ্চাকে সাথ চটানেই পড়ে থাকব। লেকিন তুকে বুলবে না, আঃ যাঃ বাবু কাহাভি চল যাই। কভি বুলবে না চটান ছোড় দে।
