এই বালিয়াড়িতে বসে নেলি ভেঙে পড়েছে। যন্ত্রণাটা বুকের ভিতর অসহ্য ঠেকছে। যে—গেরুকে মরদ বানাবার এত শখ সেই গেরু হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। গেরুকে নিয়ে আঁধারীর কত শখ, কত সুখ পাবে। যে পুতুলের জন্য নেলি রং গুলতে চেয়েছিল, সে পুতুলটা শেষ পর্যন্ত আঁধারীই পাবে! সব কিছু অসহ্য লাগছে নেলির সেজন্য। চারিদিকে সে চাইতে থাকল। যেন সে গেরুকেই খুঁজছে। কুকুর দুটো তখন অনেক উপরে। অনেক দূরে। মাটির গন্ধ নিতে নিতে বাবলার ঘন বনে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ওদেরও সুখ আছে, ওদেরও শখ আছে। বাবলার ঘন বনে হয়তো ওরা সে সুখ এবং শখকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু নেলির কিছু নেই। না সুখ, না শখ। না গেরু, না দুঃখবাবু। আজ দুঃখবাবুকে নেলির খুব আপন জন বলে মনে হল।
মনে হল এ—বাবু তার দুঃখ বুঝবে। এ—বাবু তাকে একটু আশ্রয় দেবে। আঁধারী এবং গেরুর মতো কোনো সুখের রঙ গুলতে গিয়ে হয়তো আর একটা কেচ্ছা হবে চটানে, লেকিন রসের ঘরে এ—কেচ্ছার দাম থোড়াই আছে। গেরুর মতো পুতুলের রঙ না হয়ে অথবা গেরুর মতো পুতুলের মুখ না হয়ে দুঃখবাবুর মতো হবে। সেই চোখ, সেই রঙ, সেই গড়ন।—গেরুরে, তুর মতো মরদ হামার হামেশাই আসবে। রাগে দুঃখে নেলি এখন গেরুকে গালমন্দ দিচ্ছে। বদলা নিয়ে মনে মনে সুখ পাচ্ছে।—তুর আঁধারী, হামার দুঃখবাবু। কম কীসে! তু এক কাঠি বাজাবি, হামি দু কাঠি। তু আঁধারীর পেটে বাচ্চা বানাবি, হামি দুঃখবাবুকে লিয়ে কেচ্ছা বানাব।
নেলি বালিয়াড়িতে হয়তো আরও কিছুক্ষণ বসে থাকত, আরও কিছুক্ষণ গালাগাল করত গেরুকে কিন্তু মনে হল বাপ ফিরছে নদীর পাড় ধরে। ঢুলতে ঢুলতে আসছে। দু একজন বাবুমানুষের ছেলেরা ঢিল ছুঁড়ছে যেন বাপকে। বাপ কিছু বলছে না। ওদের হাত দিয়ে ইশারা করছে। ওদের ঢিল ছুঁড়তে বারণ করছে ইশারা করে। ওরা শুনছে না। ওরা তবু ঢিল ছুঁড়ল। বাপ যখন ওদের দিকে দৌড়োবার জন্য ঝুঁকি সামলাল, তখন ছেলেগুলো দৌড়ে পালাল। তাই দেখে বাপ হাসছে। মদের নেশায় বাপ হাসছে।
—বাপ…। বালিয়াড়ি থেকেই নেলি ডাকতে থাকল।
—আয় আয়। তু ওখানটায় কী করছিস? তু আয়। গোমানি নেলিকে পাড় থেকে ডাকতে থাকল।
নেলি ছুটল। চর ভেঙে উপরে ছুটল। নেলির খোলা চুল উড়ছে। কাপড় খসে পড়ছে শরীর থেকে। চর ভেঙে তবু নেলি উপরে ছুটল। নয়তো বাবুমানুষদের ছেলেগুলো বাপকে আরও বেশি ঢিল ছুঁড়বে। নেশার শরীর বাপের। ওদের ধমক দিতে পারছে না।
উপরে উঠে সে প্রথম বাবুমানুষদের ছেলেগুলোকে তাড়াল। শেষে বাপের হাত ধরল। বাপের কোমরে হাত দিয়ে দেখল মাসের মাইনেটা ঠিক রেখেছে কিনা।
গোমানি বলল, গঙ্গা—যমুনা কোথারে নেলি?
—ওরা জঙ্গলে ঢুকল বাপ।
—ওদের থোড়া গোস্তর ঝোলে ভাত খাওয়াবি। হলুদ মেখে ভাত খাওয়াবি। হাসপাতালের সাব ওয়ার কুকুরটাকে গোস্ত দেয়। তু গঙ্গা—যমুনাকে গোস্ত দিবি। ভুলবি না।
—ভালো সওদা করলি বাপ?
—তু করে লিয়ে আয়। পয়সা দিচ্ছি। বলে কোমর থেকে টাকা খুলতে চাইল গোমানি। গঙ্গা—যমুনার লাগি বোয়াল মাছ লিবি। ওভি ডাগদারবাবু ওয়ার কুকুরকে খাওয়ায়। এক পোয়া গোস্ত লিবি তুর লাগি। খাসির গোস্ত। হাম রাতে কুছ খাবে না। গোমানি পর পর দুটো ঢেঁকুর তুলল। সে হাঁটছে। কোমরের কাছে হাতটা ঝুলছে। অথচ সে ট্যাঁক থেকে টাকা বের করল না। সব বেমালুম ভুলে গেছে। বেমালুম ভুল বকছে। কী কথা বলতে অন্য কথা বলছে। সে বলল, তুর মায়ীর লাগি ভি গোস্ত লিবি। আজ ফুলন ভি গোস্ত খাবে।
নেলি বলল, তু রূপেয়া দিলি না, হাম গোস্ত লিব কোত্থেকে।
—রূপেয়া! লে দিচ্ছি। কত লাগবে বল? দশ, বিশ, পঁচিশ, শ রূপেয়া? কেতনা রূপেয়া আওর তু মাঙে? গোমানি এবার কোমর থেকে কাপড়ের ভাঁজটা খুলল। ছোট লাল শালুর খুঁট থেকে গুণে একটা টাকা বের করল। লে রূপেয়া। আচ্ছা সওদা কবে লিবি। গঙ্গা—যমুনার লাগি দুটো শাড়ি লিবি। জায়দা হোত ফুলনের।
নেলি বলল, তাই লিব। লেকিন তু যেতে পারবি একা একা! না হামি যাব তুর সাথ।
গোমানি চোখ দুটো ছোট করল। মুখ কুঁচকাল। কপাল কুঁচকাল। যেন নেলির জায়দা সাহস হয়ে গেছে। সে বলল, তু যা! তু যা!
নেলি দাঁড়াল না। বাপকে একটু এগিয়ে দিয়ে সে বাবলার ঘন বনে ঢুকে গেল। ডাকল—গ…ঙ্গা, য…মু…না! তুরা আয়। হামার সাথ বাজারে যাবি।
ঘন বনের ভিতর থেকে নেলি দেখল কুকুর দুটো বাঘের মতো ছুটে আসছে। নেলির এখন খুব আনন্দ হচ্ছে। কুকুর দুটো ওর বেটার মতো। ঘন জঙ্গলের ভিতর কুকুর দুটোর চেহারা ভয়াবহ লাগছে। যত ছুটছে তত বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কাছে এলে নেলির কুকুর দুটোকে কিছুক্ষণ চাপড়াল। শেষে ওরা একসঙ্গে হাঁটতে থাকল।
গোমানি হাঁটছে অন্য দিকে। নেলি অদৃশ্য হয়ে গেল। গোমানি চটান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারল না। তার আগেই, চটানে ওঠার মুখে সে মাটিতে পড়ে গেল। সে দুবার ওঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারল না। গোমানি মাটিতে পড়ে ভাবল যেন নেশাটা বেশিই হয়েছে। এমতাবস্থায় সে মাটিতে পড়ে থাকল। যখন উঠতে পারছে না, হাতে—পায়ে শক্তি পাচ্ছে না, তখন নেশাটা জমেছে বটে। তা জমবে না। লাশ—কাটা ঘরে এত লাশ! এত লাশের দুর্গন্ধ একসঙ্গে! অসংখ্য, অসংখ্য! গলায় দড়ির দাগ, ঠোঁটে বিষের দাগ! দুটো খুনের লাশ। লাশগুলোর মাথায় নম্বর দেওয়া। জোয়ান মেয়েটা কাপড় সামলাতে পারেনি—ওয়াক! নষ্ট! নষ্ট! মেয়েটা শরীরে আগুন দিল। শরীরটা আগুনে সিদ্ধ হল। ওয়াক তুলল। এই নচ্ছার দুনিয়ায় বেঁচে সুখ নেই—শুধু দুঃখ। দুঃখ। দুনিয়াটা শুয়োরের চোখ নিয়ে বেঁচে আছে। সব নেমকহারাম। সব বেইমান। ওর চোখ দুটো বুজে আসছে। তবু এই নচ্ছার পৃথিবীকে দেখবার জন্যে সে দুবার চোখ মেলে তাকাল। যদি নেলি আসে এখন, যদি হাত ধরে বলে, বাপ উঠ। তুর সাথ মা বসুন্ধরা ঠাট্টা করছে! তু উঠ। তামাশা করছে।
