গেরু এবারেও কোনো জবাব না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কৈলাস মাচানে বসে দু—তিনবার ফোঁসফোঁস করল। তারপর নিচে নেমে ডাকল বৌকে, তু খেতে দে। হামি আজ জিয়াগঞ্জ যাবে। ঢাউস ডোমের বিটির খোঁজ করবে। গেরুর শাদি—সমন্দ হামি জরুর করে লিবে। কৈলাস খেতে বসে বিড়বিড় করে বকল, তুর মাই হামারে জাদা সুখ দিয়াছে আর তুত গেরু। পুষে বড় করা বাচ্চা। মা মনসার বাহনের লাখান লিকলিক করছিস। ফাঁক পেলেই ছোবালা বসাবি। ও বাত হামার না জানা আছে ভাবিস তু।
খেতে বসে কৈলাসের চোখ দিয়ে জল পড়ল। পুষে বড় করা বাচ্চাটাও বেইমানি করতে শিখেছে। বাচ্চাটা বুলে কিনা—না করি ত! হামার মরদরে তু!
গেরুই প্রথম খবরটা দিয়েছিল নেলিকে। —জানিস বাপ জিয়াগঞ্জ গেল।
নেলি গঙ্গা—যমুনাকে আদর করছিল। গঙ্গা—যমুনাকে ধরে গালে লেপ্টে দিচ্ছিল। গেরু পাশে দাঁড়িয়ে ফের বলল, জানিস বাপ জিয়াগঞ্জ গেছে।
ঝাউগাছটা থেকে একটা ডাল ভেঙে পড়ল। কাকের পুরনো বাসা থেকে খড়কুটো উড়ল। দুটো প্রজাপতি উড়ছে আকন্দ গাছে। মুরগিরা সব ডিম পাড়ছে। নতুন ঘাটোয়ারিবাবু এসে অফিসঘরে বসেছেন। পুরনো বাবু গল্প করছেন নতুন বাবুর সঙ্গে। দুঃখবাবু মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে নেলিকে দেখছেন। ওর কুকুর দুটোকে আদর করা দেখছেন। বাঘের মতো কুকুর দুটোকে দেখে বাবুর ভয় বাড়ল। তিনি চোখ তুলে ফের পুরনো বাবুকে দেখলেন এবং ফের গল্প আরম্ভ করলেন।
নেলি কুকুর দুটোকে আদর করতে করতে চোখ তুলে একবার বাবুকে দেখল। একবার গেরুকে দেখল।
গেরু ফের বলল, বাপ জিয়াগঞ্জ গেছে। বাপ জিয়াগঞ্জ শাদি সমন্দ দেখতে গেল।
কার শাদি সমন্দ?
তু বুঝি জানিস না! হামার শাদি সমন্দ।
তুর বাপ গেল আর যেতে দিলি?
হামি বারণ করলাম। লেকিন শুনল না।
তু বুলতে লারলি নেলি হামার বিবি হবে। বুলতে লারলি নেলির সাথ হামার বাতচিত হয়ে গেছে। বুলতে লারলি অন্য চটানে উঠে যাব এক রোজ। তুর বাপ বুলল আর ভেড়ির মতো সব বাতচিত শুনলি।
তু বুলতে পারতিস তুর বাপকে গেরুকা সাথ হামার শাদি হবে। বুলতে পারতিস গেরু হামার মরদ হবে।
ওরা দুজনই দুজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। দুজনেই গোপনীয় কথা বলছিল। কেউ দেখতে পাচ্ছে না; একমাত্র দুঃখবাবু ওদের দেখতে পাচ্ছেন। মুখ ফেরালে ঘাটোয়ারিবাবুও ওদের দেখতে পাবেন। ওরা কাঠগোলার পাশে, শুয়োরের খাটালের গলিতে দাঁড়িয়ে বচসা করছে না, ওরা ফিসফিস করে কথা বলছে। দুঃখবাবু ওদের দুজনকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। কিছু তিনি শুনতে পাচ্ছেন না অথবা ওরা আরও ঘন হল না। ওরা আরও ঘন হলে তিনি হয়তো চোখ নামাবেন।
নেলি বলল, জরুর পারি বুলতে। আভি বুলতে পারি বাপকে। বাপ গেরু হামার মরদ হবে। দেখবি? দেখবি তু? নেলি গঙ্গা—যমুনাকে নিয়ে এই মুহূর্তে বাপের কাছে ছুটতে চাইল। যেন এই মুহূর্তে বলা চাই বাপকে।
—বাপ গেরু হামার মরদ হবে। বাপ হামার আর গেরুর বাতচিত ঠিক হয়ে আছে। তু মানা না করে।
গেরু বলল, থাক, আভি তুকে বুলতে হবে না। বাপকে জিয়াগঞ্জ থেকে ফিরতে দে। হাম বাপকে জরুর বুলবে।
নেলি বলল, অঃ। হামার মরদরে! তুর মতো মরদ হামার লাগে না। বলে একটা বিদঘুটে শিস দিল নেলি, কুকুর দুটোকে নিয়ে গঙ্গার ঢালুতে ছুটল। এখন যেন কোনো দুঃখ নেই নেলির। যেন কোনো আপশোশ নেই গেরুর শাদি—সমন্দের জন্য। মরদের জন্য কষ্ট হয়। মেয়ে মানুষের জন্য কীসের আবার কষ্ট! জিয়াগঞ্জের মেয়ে গেরু ধরে আনুক, শাদি করুক, সুখে থাক—ওর কোনো আপশোশ নেই।
নেলি কুকুর দুটোকে নিয়ে বালির চরে নামল। তারপর কুকুর দুটোকে ছেড়ে দিল। কুকুর দুটো ছাড়া পেয়ে মাটির গন্ধ নিতে নিতে উপরে উঠে গেল। এই বালির চরে নেলি এখন একা। নিঃসঙ্গ। শীতের নদীতে কোনো শব্দ নেই। জলে ঘূর্ণি নেই। জল কাচের মতো অথবা আয়নার মতো। দুটো একটা করে পাখি উড়ে যাচ্ছে। নদীর জলে তাদের ছায়া পড়ল। নেলি জলের আয়নায় মুখ দেখল। চোখ দেখল। জিয়াগঞ্জের মেয়ে ওর চেয়ে খুবসুরত কিনা জলের আয়নায় যাচাই করল। একটু জল তুলে নেলি মুখে দিল। মুখ ধুল। দুটো—একটা মাছ নড়ল জলে। জলের আয়নায় নেলির মুখটা হারিয়ে যাচ্ছে অথবা কাঁপছে। অথবা মুখটা ঝাডোü ডোমের বৌয়ের মতো হয়ে গেল। মুখটা জলে কাঁপছে, কুৎসিত হয়ে উঠছে। যখন শ্যাওলার আঁধারে মাছদুটো হারিয়ে গেল নেলি তখন বালিয়াড়িতে উঠে এল এবং বালির ওপর বসে পড়ল। দু—হাঁটুর ভিতর মুখ গুঁজে দিল। বুকের ভিতর কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে। নেলি বুকে হাত রাখল। গেরুর শাদি হবে, সমন্দ হবে। ঠোঁটে অনেকবার শব্দগুলো ভেঙে পড়ল। ওর কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট। এই কষ্টটুকু গেরুর কাছ থেকে আড়াল দেওয়ার জন্যে সে যেন এখানে এসে বসেছে। মুখ ধুয়েছে জলে। গেরুর সামনে শিস দিয়ে নিজের কষ্টকে আত্মগোপন করেছে। যেন কিছুই হয়নি। যেন এমন হামেশাই ঘটে থাকে। মরদের কথা ঠিক থাকে না, থাকবার নয়। গেরু অন্যত্র শাদি করবে এটা যেন জানাই ছিল নেলির।
বালির চরে নেলি অনেকক্ষণ বসে থাকল। বাপ হয়তো এখন লাশ—কাটা ঘর থেক বের হয়েছে। গাছের নিচে বসে ইসপিরিট খাচ্ছে। মাসের পয়লা। বাপ মাইনে পাবে। আজ দুটো ভালোমন্দ খাবে নেলি। বাপ ভালো ভালো সওদা করবে। এ—দিনটাতেই নেলির সুখ। এ—দিনে বাপ নিজে বেশি খেতে চাইবে না। নেলিকে সব খাওয়াতে চাইবে। এখন কিন্তু নেলির উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না। গতরাতে গেরু এবং সে এখানেই বসেই হল্লা করেছে। নেলির সব মনে পড়ছে এখন। নেলির যত মনে পড়ছে তত কষ্ট বাড়ছে তত এই চরে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। বসে গত রাতে গেরুকে ধরে মরদ বানাতে চেয়েছে। মা হতে চেয়েছে। সেই গেরুর শাদি হবে। সমন্দ হবে। কৈলাস যখন বের হয়েছে তখন সে ঠিক না করে ফিরছে না। জিয়াগঞ্জের সব কটি মেয়ের মুখ সে মনে করার চেষ্টা করল। ওরা ওর চেয়ে কত খুবসুরত তা নিয়ে মনে মনে ফয়সালা করল। সে বসে বসে ভূতি, শনিয়া এবং আঁধারীর কথা ভাবল। জিয়াগঞ্জের সবকটি মেয়ে ওর দুশমন হয়ে গেছে। আঁধারীকে ধরে গেনু একবার একটা কেচ্ছা করেছিল। গঙ্গা পুজোর রাতে সেই কেচ্ছার কথা ভেবে সে হাসল। সেদিন ডোমেদের সব মেয়ে—মরদেরা পয়সা নিচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। জিয়াগঞ্জ থেকে সে তিনটে মেয়েও এসেছিল। আঁধারী এসেছে, ভূতি এসেছে। আঁধারী এবং গেরু রাতে কোথায় হারিয়ে গেল। লখি, ধুনুয়া তদারক করল। খুঁজল। নেলি ওদের খুঁজে বার করল। সেই নিয়ে কত কথা। কত কেচ্ছা। হয়তো সেই আঁধারীই গেরুর বিবি হয়ে আসছে।
