গেরু বলত, এটা নরসিং ঝাপ।
এটা কী?
এটা দুর্গা ঝাপ।
কৈলাস বলত, এটা ঈশ্বর ঝাপ, কালী ঝাপ।
গেরু বলত, এটা বন রুই মাছের ছাল, হেমতাল কাঠ।
কৈলাস বলত, কুলকুহলীর গাছ।
গেরু বলত, মরদ রাজের মূল।
কৈলাস গেরুকে তন্ত্র—মন্ত্র শেখাত এবং ভাবত—গেরুটার মনে তন্তর—মন্তরের বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে হবে। সেজন্য জড়িবুটির নাম, কী কায়দা আছে জড়িবুটিতে, কোন ব্যারামে কোন জড়িবুটি লাগে—সব সে গেরুকে যত্ন নিয়ে শেখাত। ওর ইচ্ছা গেরু যেন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে—দানবি বিদ্যার একটি অপার্থিব শক্তি আছে। গেরুও অকৃত্রিম বিশ্বাস নিয়ে সে বিদ্যা আয়ত্ত করছে। কিন্তু কীসে কী হল, কী হয়ে গেল—ভোরে উঠেই কৈলাস দেখল কাঠের বাক্সটা থেকে রাহু চণ্ডালের হাড়টা এবং দামি গাছগাছড়াগুলো চুরি গেছে। বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সেদিন কৈলাস হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল!
সে কেঁদেছিল ওর অকৃত্রিম দ্রব্যগুণের জন্য নয়। কেঁদেছিল ওর ব্যবসা মাটি হল বলে। গেরুর দিকে চেয়ে ওর দুঃখ বাড়ছিল,—চটানে বাচ্চাটা দু—মুঠো খাবে কী করে! চটানে যারা কাঠ বয়ে খায়, তাদের প্রায় উপোস দিতে হয়। অন্যদল শহরের বেড়াল—কুকুর তাড়িয়ে অথবা ফেলে পয়সা রোজগার করে। তাদেরও সে উপোস করতে দেখেছে। একমাত্র রয়েছে হাসপাতাল। কিন্তু ইসপিরিট—খোর গোমানি বেঁচে থাকতে গেরু সে কাজ পাবে না। মরলেও না। চটানের সে দিকটা হাঁ করে আছে!
সেদিন কৈলাস প্রথম গালমন্দ দিল গেরুর মাকে। গেরুর মা ঘরে থাকলে ডোমন সা রাহু চণ্ডালের হাড় এবং দামি গাছগাছালি চুরি করে উধাও হতে পারত না। গেরুর মার ঘুম ছিল পাতলা। মাচান নড়েছে ত বৌটা জেগে উঠেছে। মাচানের নিচে শব্দ হয়েছে ত বৌটা জেগে উঠেছে। মাচানের নিচে শব্দ হয়েছে ত বৌটা কুপি জ্বেলেছে। কৈলাস ঘুমের ভিতর হেসে উঠেছে ত বৌটা মাচানে উঠে বসেছে। লম্ফ জ্বালিয়ে বলেছে, কিরে মরদ, খুব যে হেসে লিচ্ছিস বড়।
কৈলাস সেই শব্দে মাচানে উঠে বসল। চোখ দুটো রগড়াল। কুপির আলোতে বৌটাকে ঝাপসা মনে হল। নজর আসছে না ঠিকমতো। সে বুক হেঁচড়ে বৌটার কাছে গেল। বৌটা তখন হাসছে। হাসিতে বত্রিশটা সরু দাঁত উপচে পড়ছে যেন। বৌকে হাসতে দেখে সেও হাসল। হাসির জোয়ারে ওরা ভাসল। বর্ষার চিতা ঘাট—অফিসের কাছে এসে গেছে। চিতার আগুনে সে বৌটার মুখ পরিষ্কার দেখল। বৌটার কাছে ঘন হয়ে বসল। এবং চিতার আলোতে ওরা ভালোবাসার গল্প করল। কিন্তু সেই কৈলাস ভোরে গেরুর মার উঠতে দেরি দেখে, সকাল সকাল এক সানকি ভাত দিতে দেরি হল বলে কপালে লাথি মারল। কপাল ভালো বলে, কপালের লাথি মুখে লেগেছে। কৈলাস বলেছিল, শালীর হামার ঘুমে পোষায় লাগ।
লাথির জন্য গেরুর মার দাঁত ভাঙল। ঠোঁট কেটে গেল। চারিদিক অন্ধকার দেখল মেয়েটা! তিন চারদিন ধরে সে চিৎকার করল চটানে। তিন চারদিন ধরে নাচন—কোঁদন হল। তিন চারদিন ধরে ওরা দুজন এক মাচানে শুল না। ভাত রাঁধল না। গেরুটা নিচে পড়ে কাঁদল, একবার কৈলাস ধরে কোলে নিল না। অথচ পাঁচ দিনের দিন রাতের কী শলাপরামর্শতে ভোরবেলা কৈলাস ডাকল, চলেহ গেরুর মা।
ডাক্তারখানায় গিয়ে কৈলাস বলল, ডাগদারবাবু আছাড় পড়ে দাঁত টুটে গেল। বহুত কষ্ট পেয়ে লিচ্ছে বহুটা। দুটা দাঁত ওয়ার টুটে গেল।
কৈলাস পয়সা খরচ করে টাকা দিয়ে দাঁত বাঁধিয়ে দিয়েছে। এবং সেই তামার বাঁধানো দাঁত নিয়ে যখন গেরুর মা হাসত কুপির আলোতে, কৈলাস তখন ভাবত—ওর বৌর মতো রূপের বৌ চটান জুড়ে কেন, শহর জুড়েও বুঝি নেই। সে হেসে বলত খুশি হয়ে—দাঁত টুটে তুর রূপ যে বাড়লরে বৌ। হাসলে তুর রূপের জৌলস আরও খুলে পড়ছে।
তখন মাচান থেকে নেমে আসত গেরুর মা। তখন চুপ করে দাঁড়াত কৈলাসের সামনে। চোখ দুটো ডাগর করে তুলত। উনুনের পাশ থেকে নোড়াটা নিয়ে বলল, রূপের বাহার যখন খুললই হামার দু দাঁত বাঁধিয়ে তখন বত্তিশটা দাঁত টুটে ফের না হয় বাঁধিয়ে দে। বলে খিলখিল করে হাসত গেরুর মা। চটানের মেয়ে মরদেরা বলত, মাগির ঢং দেখ।
সেই গেরুর মা শেষ পর্যন্ত চটান ছেড়ে পালাল। এখন কৈলাসের আপশোশ হয়। আপশোশ, কেন সে গেরুর মার বত্তিশটা দাঁতই ভেঙে দিল না। কেন সে দুটো দাঁত বাঁধিয়ে দিতে গেল। বত্তিশটা দাঁত ভাঙলে ওর রূপ ডুবত, জৌলুস কমত! চটানে পড়ে থেকে চিল্লাত শুধু। অন্তত শেষ বয়সে তবে কাটোয়া থেকে আর একটাকে ধরে নিয়ে আসতে হত না। বাপ—নানার ব্যবসা কাঁধে চাপিয়ে ঘোড়দৌড় করতে হত না।
গেরু ঘরে ঢুকতেই মাচানে উঠে বসল কৈলাস। বলল, তু কাঁহা যাস, কাঁহা ঢুঁড়ে বেড়াস? এ ঠিক না আছে গেরু। আভি ত তু বড় হো গেলি। থোড়া সমজে না চললে তুর শাদি—সমন্দ হাম কেইসে করে।
হাম ত আভি শাদি না করে বাপ।
কাহে তু শাদি করবি না।
গেরু চুপ করে থাকল। মাচানের পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রাখল। গেরুকে দেখে কৈলাসের জেদ বাড়ছে। পুষে বড় করা বাচ্চাটা বলছে কী!—তুকে জরুর শাদি করতে হোবে। কৈলাস এ—সময় নিজের ওজনটা মেপে দেখতে চাইল।
না করি ত…।
তু শাদি করবি না!
না করি ত!
না করিস ত চটানে ভুখা থেকে মরবি। পেটে ভুখা থাকবি, মনে ভুখা থাকবি। এ—আচ্ছা বাত লয় গেরু। হাম মর জানসে তুকে কোন দেখবে? কোন তুকে পিয়ার করবে? বুল? বুল! চুপ করে থাকলি ক্যানে? চুপ করে থাকলি চলবে? হামি মর যানেসে তুকে কোন দিক ভালো করবে? তুকে জরুর শাদি করতে হবে। ডাইনি মাগির সাথ তু ঘুরবি ত হাম জরুর চটানে সালিসি মানাবে। তু কি ভাবিস হামি কৈলাস মরে গেছি?
