পারব। ঘাটোয়ারিবাবু কথা দিলেন। আর অক্ষরে অক্ষরে সে কথা তিনি পালন করলেন। সে একদিন গেছে।—টাকা চাই সোনাচাঁদ?—কত টাকা। —লেকিন বাবু থোরা সবুর করতে হবে।
দূর দূর থেকে তখন মড়া আসত। দশ ক্রোশ, বিশ ক্রোশ হবে। গঙ্গা পাইয়ে দিতে আসত তারা। দশ, বিশ ক্রোশ আসতে মড়াগুলো ফুলেফেঁপে উঠত। তারা তিন চার দিনের পথ হেঁটে এসেছে। মড়াটা ওরা চটানে নামাত। দুর্গন্ধ উঠত। চটানের আশেপাশে কেউ দাঁড়াতে পারত না দুর্গন্ধে। সোনাচাঁদ তখন বলত, ওদের ছেড়ে দ্যান বাবু। ওরা চলে যাক। ঘাটোয়ারিবাবু মড়ার নামধাম লিখে নিয়ে বলতেন, তোমরা যাও বাপুরা! মড়া পোড়াতে হবে না। আমি পুড়িয়ে দেব। তারপর ওদের আরও কাছে ডেকে বলতেন, কাঠের দামটা ত তোদের শালা লাগতরে। ওটাও লাগল না। ও দিয়ে তোরা রামকান্তর দোকানে বেশি পচাই খেতে পারবি। যা। যা। তোদের বেশি টাকা হল, সোনাচাঁদেরও বেশি টাকা হল। ঘাটোয়ারিবাবুরও বেশি টাকা। কাঠের টাকা বাঁচল। তিনি কিছু কাঠ চুরি করে বেচে দিতে পারবেন। এবং মড়াটা নিয়ে সোনাচাঁদ আশেপাশের কোনো খানাখন্দের ভিতর পচিয়ে রাখত। গহনির বড় ছেলে কৈলাস তখন নিখোঁজ। কৈলাস তখন কাছাড়ের জঙ্গলে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। ওস্তাদ হারুন রসিদের দরগায় মন্ত্র নিচ্ছে হেকিমি—দানরির।
কৈলাস কিন্তু একদিন কঙ্কাল সংগ্রহ করে জীবনধারণ করতে হবে ভেবেই ভয়ে চটান ছেড়ে পালিয়েছিল এবং সেই থেকে অনেক দেশ দেখেছে। আসামের জঙ্গলে ঘুরেছে—হারুন রসিদের দরগা আবিষ্কার করেছে কাছাড় জঙ্গলে। সেখানেই সে বিদ্যা আয়ত্ত করল হেকিমি জীবনের। বেঁচে থাকার কিছু একটা সুরাহা করল। বাপের মতো পচা গন্ধ শুঁকতে পারল না। শেয়াল কটাশের মতো বন—বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে শরীর নষ্ট করতে পারল না। অথচ কৈলাস এখন বিশ্বাস করেছে যা নসিবে লেখা আছে, তার খণ্ডন নেই। নতুবা দ্বিতীয় পক্ষের বৌটাই বা পালাবে কেন, ডোমন সা—ই বা সেই ফাঁকে জীয়ন হাড়টা চুরি করবে কেন। নসিব সকলের উপরে। নসিবের হাত থেকে কারও রেহাই নেই। না দরগার রসিদের, না কৈলাসের! না বাবুচাঁদ, না সোনাচাঁদের। পা ফকির দরবেশের, না বেইমান পুরুষের। কারও রেহাই নেই, কারও রেহাই নেই। সব নসিব। নসিবের জন্য রসিদকে খুন করে কৈলাস জীবন হাড়টা চুরি করল। হেকিম ব্যবসা ফাঁদল দেশে ফিরে। শাদি করল। তখন গহনি বেঁচে নেই কৈলাস তখন জোয়ান মরদ। রাহু চণ্ডালের হাড়ের দৌলতে পয়সার শেষ নেই। কিন্তু নসিবের জন্য প্রথম বৌটা গেল। সে ঘরে ফিরে একদিন দেখল ভালো বৌটা বমি করছে। দু—বার পায়খানা। তারপর শেষ। নসিবের ঘরে ফাঁকি নেই। খুনের বদলা নিল।
কিন্তু এখন দেখলে মনে হবে কৈলাস নসিবের ঘরেই বদলা নিচ্ছে। অথবা নসিবের ঘরে চুরি করছে। নসিবের ঘরে গেরুকে কৈলাস জিম্মায় রাখতে পারছে না। ওর যে করে হোক কোনো হিল্লে করতে হয়। চটানে বেঁচে থাকার এলাদ খুঁজতে হয়। একটা পাকা ব্যবস্থা করতে হয়। তিনটে কবচের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে, শাদি—সমন্দ করে, গেরুকে নসিবের হাত থেকে দূরে রাখার ইচ্ছা। কিন্তু বেইমান বাচ্চাটা তার কী বুঝবে! ডাইনি মাগির সাথে ঘুরে বেড়াবে শুধু। কৈলাস ফরাসডাঙা থেকে ফিরে আসার পর এমন কিছুই মাচানে বসে ভাবছিল। তৃতীয় পক্ষের বৌটার নালিশ, গেরুটা কাল রাতেভি গেল। নেলির সাথ হল্লা করল। তু কিছু না বুলছিস ত ওটা আরও বাড় বাড়বে।
কৈলাসের চোখ দুটো লাল হচ্ছে। চটানে চোখ দুটো ঘুরছে। মাচান থেকে উঁকি মেরে মেরে গেরুকে খুঁজছে। গেরুকে চটানে না দেখে ওর তেষ্টা পেল। ও জল খেল।
বৌটা কৈলাসকে যখন জল দিল তখন হরীতকী রুটি সেঁকছে। দু’জনের রুটি। হরীতকী এবং ঘাটোয়ারিবাবুর। হরীতকী বাচ্চাটাকে উঠোনে শুইয়ে রেখেছে। সমস্ত শরীর তেল মাখিয়ে রোদে শক্ত করছে। মেয়েটা কাঁদছে না—হাত—পা নেড়ে খেলছে। এই সব দেখে কৈলাস গেরুর কথা ভাবল। ওর ছেলেবেলাকার কথা ভাবল। চটানে শুয়ে শুয়ে ওর হাত—পা নেড়ে খেলার কথা ভাবল। এই সময় কৈলাস পকেট থেকে একটা নাকছাবি তুলে মাটির গেলাসের বাকি জলটুকুতে ফেলে দিল। উঁকি দিল গেলাসটায়। নাকছাবিটা সোনার কী তামার দেখার ইচ্ছা হল। বেওয়ারিশ মড়ার নাকছাবিটা ঘষতেই টের পেল ওটা রুপোর! গেরুর মা—র কথা মনে হল। একটা নাকছাবির কথা মনে হল। নাকছাবিটা রুপোর। ঠিক এইরকম দেখতেই যেন। ঠিক যেন এইরকম। একরকম। একরকমের গহনা, বুঝি হতে নেই! ওর ইচ্ছে এখন এই সব মন্দ ভাবনা থেকে সরে দাঁড়ায়। এই সব ভাবনা ওকে বিষণ্ণ করে তোলে। বারবার রাহু চণ্ডালের হাড়টার কথা মনে হয়। রাগে দুঃখে গেরুর মাকে গাল দিতে ইচ্ছে হয়। লাথি মেরে দাঁত ভাঙতে ইচ্ছে হয়। ফের কষ্ট হয় গেরুর মার জন্য। গেরুর মা ঘরে থাকলে হাড়টা বুঝি চুরি যেত না, রাতের আঁধারে ডোমন সা পালাতে পারত না।
বেশ চলছিল তার সেই হেকিমি জীবনটা। ভোরে উঠে দুটো জল—ভাত মুখে দিয়ে ডাকত গেরুকে। পাশে বসতে বলত। সে বসত। গেরু বসত। জড়িবুটিগুলো সামনে বিছিয়ে রেখে সহসা একটা জড়ি তুলে বলত, বুল তরে বাপ এটা কি?
এটা জীয়ন হাড়।
বুলতে পারিস বেম্ম চণ্ডালের হাড়, লয়তো রাহু চণ্ডালের হাড়।
এ দিয়ে কী হয়?
জড়িবুটির কাজ—কারবারে লাগে।
বেশ। বেশ। তু আচ্ছা বুলে দিচ্ছিস। কৈলাস এ সময় একটা নরসিং ঝাপ তুলে ধরে বলত, এটা কোন ব্যারামে লাগে। কোন ব্যারামের জড়িবুটি। বুলতে লারলি?
