রসকলি নিজে সাহায্য করল। ওকে তাকিয়া দিল। পাশে এনে বসাল। তারপর গান ধরল। কিন্তু শিবরামের হুঁশ ছিল না কোনো। সে গান শুনতে পেল না সে শুধু পড়ে থাকল। কতক্ষণ ধরে এইসব গান, মাইফেল হল্লা হয়েছিল তাও সে জানতে পারত না, যদি না রসকলি সবাইকে বিদেয় করে দিয়ে শেষ রাতের দিকে ডাকত, এবার ওঠ নাগর!
শিবরাম যেন ঘুম থেকে জাগল। তাকিয়া থেকে মাথা তুলে বড় বড় চোখে তাকাল—যেন রসকলি কী বলছে সে বুঝতে পারছে না। চোখ দুটো জবাফুলের মতো, চোখ দুটো তবু ঝিমুচ্ছে। নেশা ভালো করে কাটেনি। শরীরে তখনও জড়তা আছে। মাথাটা খুব ভারী ঠেকছে। রসকলিকে এখনও যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, তাছাড়া সে বিশ্বাস করতে পারল না—এ—মেয়েটা ওকে উঠতে বলতে পারে। সে বলল, আমি উঠব না সখি! আমি শোব। ঘুমুব। আর কিচ্ছু করব না। চরিত্র নষ্ট করব না। সখি, আমি ঘুমোব। বলে তাকিয়ার ওপর ফের শরীরটা ঢেলে দিল।
রসকলি চাকরকে ডেকে বলল, ধনুয়া, উসকো বাহার নিকালো। শিবরাম চোখ পর্যন্ত খুলল না। অথবা খুলতে ইচ্ছা হল না। এত জড়তা শরীরে, এত বেশি সে অবসন্ন। চাকরটা তবু যদি ঠেলে বের করে দেয়! ওর কিন্তু উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না, শিবরাম মনে মনে খুশিই হল।
চাকরটা এসে শিবরামের ঘাড় ধরে বের করতে গেলে রসকলি বলল, থাম। ওকে বিছানাটা ভালো করে পেতে দে। শুইয়ে দে। আর সারারাত এখানে বসে থাকবি। বাতাস করবি।
রসকলি মুখটা শিবরামের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, হ্যাঁগো নাগর, তোমার কেউ নেই ত?
কেউ নেই।
কেউ নেই! সত্যি বলচ?
সত্যি বলচি। কেউ নেই। এতটুকু বয়সে সব গেছে। এতটুকু বয়সে বাবা ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। আর এতটুকু বয়সে লোকের হয়ে মড়া পোড়াতাম। ক’দিন যাবৎ ঘাটোয়ারিবাবু হয়ে আছি। এতটুকু বলার সময় শিবরাম হাতদুটো বিনীতভাবে ফাঁক করল। রসকলি ঘাটোয়ারিবাবুর এমন সব কথায় না হেসে পারল না।
সেই থেকে শিবরাম রোজ সন্ধ্যায় যেতেন। গহনির স্বামীকে যাবার সময় বলতেন, তুমি দেখবে ঘাট। দিনে আমি। রাতে গিয়ে রসকলির ঘরে পড়ে থাকতেন এবং অন্য সব খদ্দেরদের সঙ্গে মাইফেল করতেন। কিন্তু বেশিদিন শিবরামের ওসব ভালো লাগেনি। রসকলি অন্য খদ্দেরদের সঙ্গে ন্যক্কারজনক কথা বললে তিনি মনে মনে রেগে যেতেন। এবং রসকলি যখন খদ্দের নিয়ে ভিতরে চলে যেত, তখন তিনি রাগে অভিমানে উঠে আসতেন। চটানে হরীতকী তখন বড় হয়ে উঠেছে, ঘাটোয়ারিবাবুর ভাত জল দিতে পারছে। ঘর—দোর দেখাশোনো করছে।
একদিন শিবরাম জানালায় মুখ রেখে বসল। রসকলির ওপর রাগে—দুঃখে কিছু ভালো লাগছে না। গরাদে মুখ রেখে শপথ করল—কোনোদিন সে গলির আঁধারে হারিয়ে যাবে না। রসকলি তার মক্কেলদের নিয়ে থাক, রসকলি দিন দিন চরিত্র নষ্ট করে শরীর নষ্ট করুক, যততত্র ঘুরে বেড়াক—ঘাটোয়ারিবাবুর কোনো আসবে যাবে না। রসকলি নষ্ট মেয়ে, নষ্ট মেয়ের আবার চরিত্র, তার আবার শরীর, তার আবার ভালোমন্দ। নষ্ট মেয়ের আবার ভালোবাসা। তিনি যাবেন না। আর যাবেন না—এমনিই একটা যখন শপথ করছিলেন তখন দরজার কড়া নড়ল। কে যেন দরজার কড়া নাড়ল।
কে দরজায়।
আমি গো আমি।
ঘাটোয়ারিবাবু বুঝতে পেরেছিলেন রসকলি দরজায় দাঁড়িয়ে। তিনি ভেবেছিলেন তিনি উঠবেন না, তিনি দরজা খুলবেন না, জানালা থেকেই বলবেন, শরীর ভালো নেই। কিন্তু তিনি পারলেন না। উঠলেন, দরজা খুললেন। সহসা সবকিছু আবার ভালো লাগল। চটান ভালো লাগল। দরজা খোলার সময় তিনি অদ্ভুত আরাম পেলেন। তবু কিছু একটা অজুহাত দেখাতে হয়! তিনি বললেন, শরীর ভালো যাচ্ছে না।
রসকলি শিবরামের শরীরে হাত দিল। কপালে হাত রাখল এবং উত্তাপ দেখল। তারপর কাছে টেনে নিয়ে বসাল। বলল, আজ তোমার এখানে থাকব। গলিতে ভালো লাগছে না।
শিবরাম শঙ্কিত হল।—না, না, এ চটানে নয়। বড় খারাপ জায়গা। বরং তোমার ঘরে চলো।
আমার ঘরে কত মক্কেল। ওদের থেকে পালিয়ে এলাম।
ওদের আসতে বারণ করে দাও।
তবে আমার সংসার চলবে কী করে? বুড়ো বয়সে আমাকে কে তীর্থ করাবে?—পয়সা পাব কোথায়?
আমি দেব।
তুমি পারবে এত দিতে!
শিবরামের মনে হল তখন—সে বড় নিঃস্ব। মনে হল রসকলির জন্য তার কিছু করার নেই। ভাবল রসকলিকে নিয়ে বরং কোথাও চলে যাওয়া যাক। কিন্তু মায়ের মৃত্যু, বাপের তিরস্কার এবং সৎ—মায়ের অত্যাচার, তারপর মড়া পুড়িয়ে অন্ন সংগ্রহ, সব ওকে বিষণ্ণ করে তুলল। দুঃখ! দুঃখ! শুধু দুঃখই সেখানে। সেই করুণ অতীত ওকে চটান ছাড়তে দিল না। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে দিল না। অফিসের মাসোহারা ওকে চটানে আবদ্ধ করে রাখল। একটা জীবনের জন্য চটানে কোনো অভাব নেই, কোনো দুঃখ নেই। চটানটা শিবরামের সুখের জগৎ। ইচ্ছা করলে সে এখানে বসেই দুটো মানুষের মতো অন্ন সংস্থান করতে পারে। ইচ্ছা করলে সে এখানে বসেই রসকলিকে তীর্থ করাতে পারে। এই চটানে বসে ইচ্ছা করলে সে ওর সব, সব কিছু করতে পারে। শুধু পারে না চটান ছাড়তে—হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে।
রসকলি আবার বলল, আছে তোমার এত টাকা?
আছে।
রোজ তুমি আমায় খুশি করতে পারবে!
টাকা দিয়ে?
না সব দিয়ে। পারবে! যদি পার কালই মক্কেলদের ভাগিয়ে দেব। কালকেই ঘরটা একমাত্র তোমার হবে। রসকলি আর কারও না, তোমার। যদি পার, তুমি আমায় কথা দাও।
