অশ্বত্থ গাছটা তখন নতুন। সবে সজাগ হয়ে আকাশে ডালপালা মেলে ধরেছে। শিবমন্দিরের পথ ধরে গঙ্গায় নামতে সিঁড়িটা নতুন হচ্ছে। সিঁড়িটা রসকলির মা নিজের নামে গড়িয়ে দিচ্ছে। তোমাদের পদরজ দাও মোরে—নামাঙ্কিত মারবেল পাথরটা গাঁথা হচ্ছে। রসকলির মা নিজের নামে সিঁড়ি বাঁধাতে চাইল। জীবনের সব পাপ ধুয়ে মুছে দেওয়ার জন্য শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করল সে। ঘাটোয়ারিবাবু সব চোখের সামনে দেখেছেন। অন্ধকার গলির মোড়ে সেদিন কত লোক! কত আলো! কত দীন—দরিদ্র! কত ব্রাহ্মণ! কত অলীক ভোজন! কত দান—ধ্যান! রসকলি তখন মাত্র নতুন ব্যবসা ফেঁদেছে। পুরানো বাবুরা চলে যাচ্ছেন ভোজ খেয়ে। তারা আর রসকলির মা সুরবালাকে পাবে না। সুরবালা তীর্থ করতে যাচ্ছে। যাবার আগে এই সব কাজগুলো করে যাচ্ছে।
এই সব ভাবনার ভিতর আরও দূরে চলে যেতে থাকলেন তিনি। অনেক সব কথা মনে হতে থাকল তাঁর। দুঃখবাবু এসে পুরনো দিনের সব স্মৃতিকে ভাসিয়ে দিয়েছেন; যত মনের গভীরে ভেসে উঠছে তত বিষণ্ণ হয়ে পড়ছেন। দুঃখবাবু চটানে যেন আজ ওঁর স্মৃতির ঘরে লুকোচুরি খেলতে এসেছিলেন। গহনির শাপশাপান্ত এতদিন ওঁর জীবনে যথার্থভাবে দেখা দিয়েছে। দুঃখবাবু না এলে এই কথা মনে হওয়ার নয়। তিনিই যে ঘাটের একমাত্র ইজারাদার নন, মৃত্যুর হিসেব—নিকেশের একমাত্র বাবু নন, দুঃখবাবু আজ বড় বেশি হঠাৎ যেন সে কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেল। বড় বেশি—সহসা তিনি বুঝতে পারলেন সোনাচাঁদের হিসেবের মতো দুঃখবাবুও শিবরামের হিসাব রাখবে। সাং—আজিমগঞ্জ, পিতার নাম—হরেরাম ঘোষ। পেশার কথা লিখবে কি? তিনি লিখেছেন কি? তিনি দেয়ালে টাঙানো সব ছবিগুলো দেখলেন। ওরা যেন আজ প্রথম সকলে মিলে হাসল। ঘাটোয়ারিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, দুধ দিয়ে কাল সাপ পোষা দেখছি। দেওয়ালের ছবিগুলো যত হাসল, তত তিনি ভয় পেতে থাকলেন। তত মৃত্যুর জন্য বেশি চিন্তা করছেন। মৃত্যুর শক্ত মুঠোতে তিনি হাঁসফাঁস করছেন। ভয়ানক! বীভৎস! তিনি ভয়ে শিউরে উঠলেন। নিঃসঙ্গ—নিঃসঙ্গ। সব নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। বড় একা, বড় বেশি একা তিনি আজ।
স্মৃতির ঘরে অনেক চেষ্টা করেও মাকে মনে করতে পারলেন না, অথবা মাকে দেখতে পেলেন না। তিনি সেই স্মৃতির ঘরে যখন খুব ছুটোছুটি করে মায়ের দেখা পেলেন না, তখন তিনি যেন বাধ্য হয়ে চিৎকার করে উঠলেন—মা! মা! এখন তিনি বুঝতে পারছেন মাকে না মনে হওয়ারই কথা। অথচ তিনি গল্প শুনছেন মার। জানালার গরাদে মুখ রাখার সময় সেই সব শোনা কথা সত্য ঘটনা বলে মনে হয়েছে। তিনি তখন মাকে দেখতে পান। সেই ঘরটা দেখতে পান। পাটকাঠির সেই ঘরটায় ভাঙা জানালা, খড়ের ঢাল—মা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন, সে মার আশেপাশে দুষ্টুমি করে বেড়াচ্ছে এবং মাকে ঘুম থেকে জাগাবার জন্য নানারকমের ফন্দিফিকির আঁটছে। মা কিন্তু ঘুম থেকে জাগলেন না। মায়ের মৃত্যুটা এমনই নাকি কিছু একটা ঘটনা।
বাবার মুখটা মনে পড়লে ওঁর মুখটা আরও কুৎসিত হয়ে ওঠে। তিনি বড় হয়ে এসব কথা শুনেছেন। তিনি সব মনে করতে পারেন। সেই নিঃসঙ্গ দুঃখদায়ক দিনগুলোর কথা মনে করতে পারেন। তখন বাবা দ্বিতীয় বার বিবাহ করেছেন। বাবা যাকে নিয়ে ঘর করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে ঘরনি পেলেন। ঘাটোয়ারিবাবুর জীবনে দুঃখ বাড়ল। দুঃখ ঘনীভূত হল। তিনি ঘর ছেড়ে পালাতে চাইলেন।
স্মৃতির ঘরে এখন রসকলি হাঁটছে। গলিটার স্মৃতি জাগছে। ছোট ছোট দরজা, ঘিঞ্জি গলি। মুখে সাদা রঙ মেখে, চোখে কাজল টেনে, গ্যাসপোস্টের আলোর নিচে ওরা দাঁড়াত। কেবল রসকলির বাঁধা খদ্দের। ওর ঘরে তখন হারমোনিয়াম বাজাত, ঘুঙুর বাজত। রসকলি ওদের মতো আলোর নিচে দাঁড়াত না, চোখ—মুখ প্রকট করে তুলত না। অথচ ঘাটোয়ারিবাবু মনে করতে পারছেন না সেদিন কী করে এই সব মুখ ঠেলে রসকলির ঘরে গিয়ে উঠেছিলেন। কী করে বাঁধা খদ্দেরের মতো বলেছিলেন—বাহবা অঃ হঃ! বড় সুখের মুখ, সোহাগের মুখ! বড় কমনীয়! কমনীয়? অঃ হঃ!
অভদ্র! শুয়োরকা বাচ্চেচ! দু—চারজন ভদ্রলোক—যারা আসর গরম করছিল তারা এমন সব কথা বলে শিবরামকে তাড়াবার চেষ্টা করেছিল।
শিবরামের চোখ—মুখ জ্বলছিল—প্রথম মাত্রারিক্ত মদ খেলে যা হয়।
শরীরে জড়তা আসছিল, জিভ টানছিল। কথা জড়িয়ে আসছিল। সে কথা বলতে পারছিল না। তবু বলার চেষ্টা করল—অঃ হঃ! সখী আমার! শ্মশানের বীভৎস গ্রাস দেখে সে ভেঙে পড়েছিল সেদিন। সে মদ খেয়েছিল সেদিন। প্রথম মদ খেয়েছিল। প্রচুর মদ।
বদমাস লোকটাকে বাহার নিকালো। আসর গরম—করা লোকগুলো ওকে চ্যাঙদোলা করে বাইরে বের করবার ব্যবস্থা করছিল।
সে চ্যাঙদোলায় দুলতে দুলতে বলল, তোমরা কী করছ! যাচ্ছি। বেশ যাচ্ছি। তারপর ঘাড় কাত করে বলল, সুন্দরী, আমি থাকব না, আমি থাকব না। আমি জল খাব। বুকে হাত রাখার চেষ্টা করল শিবরাম ঘোষ।
রসকলি দেখল। সব দেখল। শিবরাম ঘোষের শরীরের শক্ত বাঁধুনি দেখল। চওড়া কাঁধ দেখল। ডাগর চোখ দেখল। শিবরামের বুকে পিপাসার কথা শুনল। সে একটু দুলে বলল, ওকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। ও গান শুনুক। ওকে বসতে দাও।
সকলে এতটুকু হয়ে গেল। ওরা ওকে ছেড়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো যে—যার জায়গায় বসে পড়ল। শিবরাম উপুড় হয়ে পড়ে আছে। হুঁশ নেই, উঠতে পারছে না। যতবার উঠতে যাচ্ছে ততবার পড়ে যাচ্ছে।
