আপনার মতো আমিও এ—ঘাটে থাকব। আমি নতুন ঘাটোয়ারিবাবু। সুপারিশের জোরে কাজটা হল। বাবাকে হয়তো চিনবেন, তিনি ট্যাক্স কালেক্টর। অনেক ধরে কাঠ—খড় পুড়িয়ে তবে চাকরি।
দয়া করে নামটা।
বাবার নাম?
কী তোমার নাম বাপু! কাজ ত আমার শেষ হয়ে এল বুঝতেই পারছি। ট্যাক্স কালেক্টর ত চার পাঁচ জন আছেন। কোন জনের তুমি বাপু।
আপনি তেমন ভাববেন না। বুড়ো হয়েছেন বলে আমাকে ওরা কাজটা দিল।
ওহে ছোকরা, তেমন কথা আমি তোমাকে কী বলছি! চাকরি আমার নেয় কে। কার বাবার সাধ্য আছে নেয়। নামটা শুনি এবার।
নতুন বাবু খুব বিব্রত বোধ করছিলেন। তিনি নামটা বললেন, দুঃখভঞ্জন ভট্টাচার্য।
আপনি বামুনের ছেলে ছিঃ ছিঃ কী ব্যবহারটাই না করে ফেললাম। দয়া করে দোষ ধরবেন না। ব্রাহ্মণ! কুলশ্রেষ্ঠ! উপনিষদ পড়েছেন? কঠোপনিষদ, প্রশ্নোপনিষদ, কেনোপনিষদ? পড়েননি? তবে পড়বেন। এখানে যখন ভিড়ে গেছেন তখন একবার পড়তে হবেই। উপনিষদ বলে—পুরুষ আপাদমস্তক পবিত্র। দৃষ্ট পদার্থের মধ্যে যাহাদের প্রাণ আছে তাহারা শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আবার মনুষ্য শ্রেষ্ঠ। এবং মনুষ্যগণের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। এসব কথা আমার নয় দুঃখভঞ্জনবাবু। এ—সব কথা মনুর। বলে, ঘাটোয়ারিবাবু গড় হয়ে প্রণাম করতে উদ্যত হলেন নতুন বাবুকে।
দুঃখবাবু ফের বিব্রতবোধ করতে থাকলেন। বড় অদ্ভুত এ—জায়গা তিনি ভাবলেন। তিনি বললেন, এ কী করছেন। ছিঃ ছিঃ বয়সে কত বড় আপনি। না না এ ঠিক হল না আপনার।
ঠিক হয়নি বলতে চান? যেন ঘাটোয়ারিবাবু নতুন বাবুর অপরিপক্বতা ধরে ফেলেছেন। তিনি হেসে আর বাঁচলেন না।
তিনি সামনের টুলটায় বসে খুব উদাসীনের মতো বললেন, ঠিকেরই বা কী আছে আর বেঠিকেরই বা কী আছে। সবই ঠিক সবই বেঠিক। দেখুন না আমাকে? অর্থাৎ আমার এই শিবরাম ঘোষকে। কতকাল এখানে আছি, কত ঠিকও দেখলাম, কত বেঠিকও দেখলাম, কত ঠিকবেঠিক হল—অথচ রেহাই কারও থাকল না। না আমার, না আপনার। মা শ্মশানী সকলকে গিলে খাচ্ছে। খাবে। আমাকে খাবে, আপনাকে খাবে, সকলকে খাবে। সকলকে গিলে খাচ্ছে আর শান্তি দিচ্ছে। কী পাপী কী তাপী! তবু প্রণাম করলাম আপনাকে, আপনি কুলশ্রেষ্ঠ বলে, আপনি জাতসাপের বাচ্চা বলে। ঠিক বেঠিক বুঝিনি, মন চাইল কাজটা হয়ে গেল। এবারে বসুন। চা খান। প্রসাদ পেয়ে সুখী হই।
মাচানে শুয়ে শুয়ে সব শুনতে পাচ্ছে নেলি। কে এমন এসেছেন এই চটানে, যাকে ঘাটোয়ারিবাবু পর্যন্ত সমীহ করে কথা বলছেন। দুনিয়ায় তবে তেমন লোকও আছে, ঘাটোয়ারিবাবু সমীহ করেন! প্রথম ভালো লাগল, পরে খারাপ লাগল ভাবতে। ঘাটোয়ারিবাবুর উপরওয়ালা কেউ থাকুক সেটা ওর ভালো লাগল না। মন চাইল না। সুতরাং খুব ইচ্ছা হচ্ছে উঠে দেখতে—তিনি কে, তিনি কেমন। ইচ্ছা হচ্ছে দেখতে ঘাটোয়ারিবাবুর চোখ—মুখ এখন কেমন দেখতে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাটোয়ারিবাবুর কথা শোনারও ইচ্ছা। নেলি সেজন্য মাচান থেকে নেমে শরীরে কাঁথা—কাপড় জড়িয়ে ঘাট—অফিসের বারান্দায় উঠে এল। জানালা দিয়ে সে উঁকি দিল। বাবু বসে আছেন, নতুন মানুষটি চা খাচ্ছেন। বাপ খাচ্ছে। ওদের খেতে দেখে তিনি যেন কৃতার্থ হচ্ছেন। রামকান্তের দোকান থেকে চা এসেছে, নেলি বুঝতে পারল। ছোকরা চাকরটা এখনও দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। নেলির এ—সময় ইচ্ছা হল জানতে, মড়া এল না ত! ঘাটোয়ারিবাবুর কোনো পরিচিত জন যদি দূর থেকে মড়া নিয়ে আসে।
নতুন বাবু দেখলেন জানালায় একটি বেশ মিষ্টি মুখ পরম কৌতূহল নিয়ে ওকে দেখছে। নতুন বাবু চোখ তুলতেই মেয়েটা চোখ নামাল। নতুন বাবু বললেন,—মেয়েটা কে?
গোমানি ডোমের বাচ্চা। এই যে গোমানি—বড় মজাদার লোক। এসেছেন যখন নিশ্চয়ই টের পাবেন। বেটা হাসপাতালে লাশ—কাটা ঘরে কাজ করে। বেটা ইসপিরিট খোর। মদ, ভাং, গাঁজ খেয়ে সারাদিন চটানে পড়ে থাকে।
গোমানি নতুন বরের মতো মাথা গুঁজে বসে আছে। এবং মাঝে মাঝে বলছে—কী যে বুলছে বাবু।
নেলি জানালা থেকে প্রশ্ন করল—মানুষটা কে বাবু?
আয়, আয়। ভিতরে আয়। আমাদের নতুন ঘাটোয়ারিবাবু। জাত সাপের বাচ্চা।
নেলি ভিতরে ঢুকল। দূর থেকে গড় হয়ে প্রণাম করল। তারপর জড়োসড়ো হয়ে নতুন বাবুকে এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকল। তখন এক এক করে সবাই উঠে এল। সবাই গড় হল। গড় হয়ে সবাই দুঃখবাবুকে চটানের নতুন ঘাটোয়ারিবাবু বলে মেনে নিল।
নতুন বাবু আবার জানতে চাইলেন, এখানে ক’ঘর ডোমের বাস?
হবে ছ’সাত ঘর।
বেশ। বেশ। নেলির দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন, তোমার নাম কিগো মেয়ে?
হামার নাম? হামার নাম নেলি। গোমানি ডোম হামার বাপ।
তখন গেরু উঠে এসেছে মাচান থেকে। কৈলাস ফিরেছে ফরাসডাঙা থেকে। দুখিয়া, মনু, বাবুচাঁদ সকলে এসে জড়ো হয়েছে অফিস বারান্দায়। নতুন ঘাটোয়ারিবাবুকে ওরা দেখতে এসেছে। ওদের ভক্তি জানাতে এসেছে। গেরু দেখল বাবুকে—বাবু ওরই মতো সুঠাম, সুপুরুষ। চোখ দুটো বড় বড়। মুখটা ডিমের মতো মসৃণ। সেজন্যই মনে হল সকলের—চটানে মানুষটা বড় বেমানান। অমসৃণ চটানে মসৃণ মানুষটাকে শেষ পর্যন্ত কারও যেন ভালো লাগল না।
নতুন বাবু চলে যাবার পরই এক এক করে সব মনে হতে থাকল ঘাটোয়ারিবাবুর। মনে হতে থাকল আর দুঃখ পেতে থাকলেন। তিনিও একদিন মৃত্যুর ইজারা নিতে এসে দেখেছিলেন পুরানো ঘাটেয়ারিবাবুকে। দেখেছিলেন গহনির স্বামী সোনাচাঁদকে। সোনাচাঁদ তখন ঘাটের ইজারাদার হয়ে বসে আছে, ঘাটোয়ারি হয়ে বসে আছে। মাথায় বড় বড় পাকা চুল। গোঁফ ঝুলে পড়েছে—সাদা। মুখ পাঁচের মতো লম্বা—বনমানুষের মতো চেহারা। শিবরামকে দেখে প্রথম দিন সোনাচাঁদ চটানের এক কোণায় গুম হয়ে বসেছিল। তখন এখানে জলকল ছিল না, গ্যাসপোস্টে আলো ছিল না, বাবু মানুষদের বাড়িগুলো দূর দূর ছিল। ডহর—ডোবায় চারিদিক ভর্তি। চারিদিকে তখন ঘন জঙ্গল। নদী ভেঙে এত এদিকে আসেনি। এ—পারে নদীর কোনো চর ছিল না। এত লোকজন ছিল না, এত মৃত্যু ছিল না। এত মানুষ ছিল না। ক’বছরে শহরটা ভরে গেল যেন। কোত্থেকে সব হুড়হুড় করে লোক এসে এই বেওয়ারিশ জায়গাটাকে পর্যন্ত দখল করে বসল। তখন মিউনিসিপ্যাল অফিসের নজর এল এদিকটায়, জলের কল এল। আলো এল। ট্যাক্স বসল। শিবরাম ঘোষ বুড়ো হলেন।
