গত রাতে নেলিও মা হতে চেয়েছিল নদীর ঢালুতে। খুব শখ জন্মেছিল বালিয়াড়িতে গেরুকে নিয়ে পড়ে থাকতে। কিন্তু গেরু তখন বলেছে—তুকে হাম বেশ্যা বানাবে! তু হামারে ও বাত না বলিস। দোহাই তুর ডাক—ঠাকুরের। কিন্তু নেলি যথেষ্ট পরিমাণে পচাই গিলে মাতাল হয়েছিল। শপথের কথা ভুলে গেছিল। রাতের আঁধার, বালিয়াড়ির বাসি দুধের মতো রঙ ওর মা হওয়ার ইচ্ছাকে প্রকট করে তুলেছিল। সেজন্য প্রথমে গেরুর হাত ধরে টেনেছে নেলি, তারপর গেরুকে জড়িয়ে ধরে পিষে ফেলার উপক্রম। নেলি যেন ডাইনি বনে গেল। গেরু ভয় পেল। নেলির চোখ দুটো কেমন সাপের চোখের মতো হয়ে উঠেছে। আর বলেছে, তু হামারে ছেড়ে দিস না গেরু। শক্ত করে ধর। তু ছেড়ে দিলে হামি বাঁচবে না। শরীরে আগুন জ্বলছে। হামারে তু থোড়া শান্তি দে, শান্তি দে তু।
তবু যখন গেরু হাত দিয়ে ঠেলে দিচ্ছিল নেলিকে, যখন নিজের কাপড়টা সামলাচ্ছিল, শরীর আড়াল দিচ্ছিল এবং ওর নেশা ভাঙাবার জন্য বার বার বলছিল, ও ঠিক না আছে, তখন নেলি বলছিল, তু গেরু মা হতে দিবিনে। হামারে বাঁচতে দিবিনে চটানে! তারপর বালিয়াড়িতে সামান্য ধস্তাধস্তি হয়েছিল। গেরু যত জোর করে শরীরটা সরাতে চেয়েছে, তত নেলি গেরুকে দু হাতে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত গেরু বাধ্য হয়েছিল নেলিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে এবং চটানে ছুটে আসতে। নেলি সত্যি যেন দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে—ডাইনি বনে যাচ্ছে। দুখিয়া যেন ঠিক বলেছে। অথবা পাগল হয়ে গেল। নেলি মা হওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেল। চটানে উঠে এসে সে হালকা বোধ করেছিল।
সে নিজেকে বাঁচাবার জন্যই হাঁপাতে হাঁপাতে চটানে এসে উঠেছিল। সেজন্য ভোরে নেলির মাচানে নেলি পড়ে থাকল, গেরুর মাচানে গেরু। গত রাতের ঘটনার কথা ভেবে ওরা আবার দেখা করতে লজ্জা পাচ্ছিল। ওরা উঠছিল না সেজন্য মাচান থেকে। ঘুমের ভান করে মাচানে পড়ে আছে। যেন কত ঘুম চোখে। যেন কতকাল ওরা ঘুমায়নি। অথবা ভোরের এই ঘুমটা ওদের ছাড়তে চাইছে না। ওরা যতটা পারছে ঘুমিয়ে নিচ্ছে।
জানালায় রোদের রঙটা আরও ঘন হয়েছে। মেঝেতে রোদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। এখন ঘাটোয়ারিবাবুর শরীরে রোদ, মুখে রোদ। জানালা পার হয়ে একটা লোক নেমে গেল। গিরিশ বুঝি। বাবুচাঁদের বাপ। রেলের ঘুণ্টিম্যান। সে সময়ে ওপারে যায়। বাবুচাঁদ শুয়োরের ব্যবসা করে। পাকা ঘর তুলেছে ব্যবসা করে। চটান থেকে দূরে ঘর করেছে। খাটালের জায়গাটুকু এখনও ছাড়ছে না। বাপ পিতামহের জায়গা ছাড়তে নেই।
ঘাটোয়ারিবাবু এখানে বসে খাটাল দেখতে পাচ্ছেন। কাঠগোলা পার হলে বাবুদের পুরোনো দেয়াল। তারপর ভদ্র পল্লী। তিনি জানেন সেখানে যারা বাঁচে, তারা চটানের মতো বাঁচে না। সেখানে ঘর আছে, গৃহিণী আছে। পুত্রকন্যা আছে। দৈনন্দিন বাজার হিসাব আছে। সুখ আছে, দুঃখ আছে, কিন্তু চটানের মতো আগুন নেই। নাচন—কোঁদন নেই।
ঘাটোয়ারিবাবুর চোখ দুটো জ্বলছে তখন। গোমানি ডোম তখন ঝিমোচ্ছিল। তিনি ডাকলেন, এই শালা ঝিমোচ্ছিস যে। মাগনা প্রসাদ পাও বলে তার দাম দিতে জান না!
আজ্ঞে হামি ত ঢুলছি। ঝিমোচ্ছি না।
রক্তের তেজ এখন নেই নারে?
বাবু ও বাত কেনে বুলছেন?
বলব না! তুই ত পেট চিরেছিস, কিন্তু পেট চিরে বাচ্চা বের করেছিস?
কত! কত!
কত! কত! ঠোঁট উলটে বাবু বিদ্রূপ করলেন, কটা করেছিস?
কত হবে? সে যে অনেক বাবু লেখাজোখা নাই। তা হাজার হবে বাবু ধরে লেন।
তুই বললি আর অমনি আমায় ধরে নিতে হবে।
তবে হামি ত নাচার বাবু। হামার ত লেখাজোখা নাই।
তা থাকবে কেন, শালা মদখোর। নেশা করে ভাঙ খেয়ে জীবনটাকে জাহান্নমে দিচ্ছিস। তুই ত নিজের মেয়েটাকে দেখিস নারে? ভালবাসিস নারে! রাতে কোথায় ভাগে সে খবর তুই নিস!
পাশের দরজায় কে ঠকঠক আওয়াজ করছে। দরজার কড়াটা কে যেন ঠকঠক করে নাড়ল। তিনি বিরক্ত হলেন। তবু পা দুটো নামালেন চেয়ার থেকে। অভ্যাসবশত বললেন—কোত্থেকে মড়া এল। কী নাম মড়ার?
কাউন্টারে একটা মুখ দেখা গেল। কাউন্টারের মুখটি খুব বিনীত। উত্তর আরও বিনীত। লোকটি বিনীত। লোকটি জবাব দিল,—আমি মিউনিসিপ্যালিটি থেকে এসেছি।
ঘাটোয়ারিবাবুর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। দুনিয়ায় ঐ একটি জায়গাকেই ওঁর যত ভয়। কোনো সমন নেই ত! কোনো নালিশ! কোনো আর্জি অথবা মেয়েদের কথা। তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। —আসুন, আসুন, কী সৌভাগ্য! বসুন। চেয়ার টেনে দিয়ে কথাগুলো বললেন। ওরে বেটা মুখ্যু কী দেখছিস? যাঃ দরজা খুলে দে। দ্যাখ কে এসেছেন।
গোমানি ল্যাং খেতে খেতে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলে দিল। শেষে এক কোণায় চুপচাপ বসে বাবুকে দেখতে থাকল।
আপনাকে ত এর আগে দেখিনি! যদি দয়া করে….।
আমি নতুন ঘাটোয়ারিবাবু হয়ে এলাম।
ঘাটোয়ারিবাবু ঠিক যেন ধরতে পারছেন না কথাটা। দেয়ালে ছবি টাঙানো। কোণায় গোমানি বসে, দু—একটা মোরগ খুঁটে খুঁটে পোকামাকড় খাচ্ছে। আকন্দ গাছটার পাতায় প্রজাপতি একটা। নানা রকমের সব রঙ ঝুলছে আশেপাশে। ঘাটোয়ারিবাবু এসব ধরতে পারছেন এবং বুঝতে পারছেন, অথচ এই সাধারণ কথাটা তিনি যেন ধরতে পারছেন না। দুঃখ। দুঃখ। ঘাটোয়ারিবাবু খুব ছেলেমানুষ হয়ে গেছেন এখন। —আপনি কী বললেন ঠিক বুঝতে পারলাম না।
