সামনের বারান্দায় ঝাড়ো ডোমের বেটারা কাঁথা—কাপড়ের নিচে থেকে উঁকি মারছে। এ ভোরে মনুডোম পায়রা ওড়াচ্ছে আকাশে। নেলির বাঘের মতো কুকুর দুটো চোখ মেলে আকাশ দেখছে। আর এ—সময়ই ছোট চাকুটার দরকার হয় ঘাটোয়ারিবাবুর। এক ছিলিম গাঁজা, হলদে একটা নেকড়ার দরকার হয়। যত ভোরের সূর্য উপরে উঠবে ততই নেশার জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করবে। ততই তিনি গোমানি ডোমের প্রতীক্ষায় ঘরময় পায়চারি করবেন। ততই তিনি এই চটানের ওপর অধীর হবেন।
তিনি ফের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে যখন দেখবেন, কেউ উঠছে না, কেউ এদিকে আসছে না, তখন অগত্যা ডাকতেই হল, ওরে শালা গঙ্গাপুত্তুরের দল, ওরে শালা গোমানি, তোরা ঘুম থেকে উঠবিনে।
বাবুর ডাক শুনে গোমানি ডোম চালা ঘরটার মাচানে ধড়ফড় করে উঠে বসল। বাবু ডাক দিয়েছেন।
পড়ি কী মরি করে এখন ছোটার ইচ্ছা ওর। সে এই ডাকের জন্যই মাচানে এতক্ষণ প্রতীক্ষা করছিল। ঘাটোয়ারিবাবু ডাকবেন—তবে সে উঠবে, তবে সে যাবে। ভোরে দরজায় বসে থাকলে বাবু খেঁকিয়ে উঠেন।—মাগনা গ্যাঁজা টানতে এয়েছেন। ভাগ বেটা ভাগ। গোমানি সেজন্য মাচানে শুয়ে প্রতীক্ষা করছিল এতক্ষণ।
গোমানি ধীরে মাচান থেকে নামল। নেলি টের পাচ্ছে না। সে যাচ্ছে। যাবে। শীতে পা ফেটে গেছে। জায়গায় জায়গায় গোড়ালিটা হাঁ করে আছে। মাটিতে পা ফেলতে বড্ড কষ্ট। মাটিতে পায়ের চাপ যত বাড়ছে মুখটা ততই কাতর হয়ে উঠছে।
ধীরে ধীরে পা মাটিতে চেপে চেপে গোমানি চলার মতো করে নিজেকে রপ্ত করে নিল। সামান্য আমের আঠাটুকু উনানে তাড়াতাড়ি গরম করে গোড়ালির ফাঁকে ফাঁকে লাগিয়ে নিল। তারপর খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকল এবং কোনোরকমে ঘাটোয়ারিবাবুর ঘুরে ঢুকে গেল। বলল, আমি যে বাবু উঠেই আছিগ! কাশিতে আর ঘুম আসে কৈ। গোমানি গায়ের কাঁথাটা শরীরে ভালোভাবে জড়িয়ে ফের খকখক করে কাশল। কাশতে কাশতে নুয়ে পড়ল। কাশির গমক কমে এলে বাবুর দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, মন চিন্তা করল বাবুর কাশি না শুনলে আর উঠছিনে। লেকিন বাবু আজ আপুনি ত কাশলেন না।
ঘাটোয়ারিবাবু জবাব দিলেন—চোখ দুটো লাল। তিনি জবাব দিলেন—চোখ দুটো গোলকের মতো হয়ে উঠছে। —আমার ন্যাজোরের ছাও! আমার কাশি না শুনলে বাবু উঠবেন নি! শালা ডোম আমি কী তোর মতো। কাশি আমার লেগেই থাকবে। আমি কী শালা ইসপিরিট খোর! তোর মতো কাশি না থাকলে ভোরে আমার ঘুম ভাঙবে না!
গোমানি জানে এ—সময় কোনো উত্তর দিতে নেই। ভালো কী মন্দ—যে—কোনো জবাবে বাবু চটবেন। বাবু গালমন্দ করবেন। এক ছিলিম গাঁজার জগৎ থেকে ওকে তাড়িয়ে দেবেন। সেজন্য গোমানি কোনো জবাব দিল না। ছোট চাকুটা কাঠের ওপর শুধু ঘষতে থাকল।
শীতে বাবুর হাত দুটো বরফ হয়ে গেছে। তিনি দুটো হাত চকমকি কাঠের মতো ঘষলেন। গোমানি এখন নিচে বসে প্রসাদ তৈরি করছে। গোমানিকে দেখলে গহনির কথা মনে হয়, ঘাটোয়ারিবাবুর। কোনো এক বর্ষার কথা মনে হয়, কোনো এক বীভৎস মৃত্যুর কথা মনে হয়। মৃত্যুর পর গহনির মুখটা যেমন বীভৎস ছিল, এখন এই ঘরে গোমানির মুখ যেন তেমন। যেন সেই গহনির মৃত্যুর পর ওর মাথার লক্ষ লক্ষ উকুনের গৃহত্যাগের পরিণামের মতো। বড় কষ্টে মৃত্যু, বড় শোকে মৃত্যু।
কলকেতে আগুন দিয়ে গোমানি বাবুকে বাড়িয়ে ধরল,—নেন বাবু।
বাবু এ—সময় একটু অন্যরকম হয়ে পড়েন। গাঁজা ফোঁকার আগে তিনি পৃথিবীর পরিণাম ভেবে বড় বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। তিনি কলকেতে হলদে নেকড়াটা জড়িয়ে নেবার সময় বললেন, গোমানিরে! —একটা বড় রকমের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ফুসফুসের সমস্ত শ্বাসটা খালি করে কলকেটা এবার মুখে চেপে ধরলেন।
গোমানি আসনপিঁড়ি বসে নন্দীভৃঙ্গি সেজে আছে। বাবু এখন কী কী কথা বলবেন এবং কী জবাব দিতে হবে সব গোমানির ঠিক করা আছে।
বাবু ধোঁয়া টেনে ফের ডাকলেন—গোমানিরে!
বুলেন বাবু!
লাশ—কাটা ঘরে তুই হাজার কিসিমের মড়া চিরেছিস নারে?
তা অনেক বাবু। বহুত। হাজার হয়ে যাবে বাবু। জোয়ান মেয়ের পেট চিরেছি। পেট চিরে বাচ্চা বের করেছি কত।
নেশার জগতে ঘাটোয়ারিবাবু লাশ—কাটা ঘরে চলে যান! টেবিলের সেই সব যুবতী মেয়ের পাশে তিনি বিচরণ করতে থাকেন। লাশ—কাটা ঘরের গল্প শুনে তিনি মনে মনে অস্থির হয়ে ওঠেন। সেইসব টেবিলের পাশে বিচরণ করতে করতে মনে হয় তিনি পাগল হয়ে গেছেন অথবা মাতাল। লাশ—কাটা ঘরে তিনি প্রেতের মতো ঘুরে বেড়ান। লাশ—কাটা ঘরের গল্প, নেশার ঘোরে বড় জমজমাট। তিনি বললেন—তারপর গোমানি?
তারপর ওরা কলকেটা আরও দুচারবার হাত বদলাল। কলকেতে যখন কোনো আর অবশিষ্ট থাকবে না, তখন চুপ হয়ে বসবে। কেউ কোনো কথা বলবে না। গোমানি না, বাবু না, কৈলাস থাকলে সেও না। চুপচাপ বসে নেশা হজম করবে। দেখলে মনে হবে, ওরা দু’জন চটানের বাইরেকার মানুষ। ওরা দুজন চটানের বুকে সন্ন্যাসী। বাইরের জানালায় তখন রোদ নামব—নামব করছে। পাশের কলতলায় দুটো একটা মড়া আসতে শুরু করেছে। চটানের মানুষগুলো এক দুই করে যে যার কাজে নেমে যাচ্ছে। খাটালে শুয়োর নেই। ঝাড়ো ডোম লাঠির দুপাশে ডালা কুলো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। মনু ডোমের কবুতরগুলো নেমে এসে ঝাউগাছটায় বসল। মংলি তোশক—লেপ থেকে তুলা বের করছে। হরীতকী জল রোদে দিয়ে বাচ্চা পাহারা দিচ্ছে। কার বাচ্চা, কে জন্ম দিল, সে সব এখন আর হরীতকীর মনে নেই। সে মা হতে পেরেছে ওর কাছে এটাই বিলকুল সত্য।
