নেলি বলল, না যাবে না। তুর পচাই তু খা।
যাবি না ক্যানে? গেরু নেলির হাতটা চেপে ধরল।
হাত ছাড় গেরু। হাত না ছাড়বি ত বাপকে ডাকব।
তু চল নেলি।
নেলি উঠে পড়ল উনুনের পাশ থেকে। ওখানে বেশি কথাবার্তা বললে বাপ জেগে যাবে। বাপ তবে অনর্থ ঘটাবে। ওরা এসে শুয়োরের খাটালটার পাশে দাঁড়াল। কাঠগোলা বাঁদিকে রয়েছে। ওখানে ঘন আঁধার। ওখানে কোনো লোকজনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ওখানে বড় নির্জন, বড় নিঃসঙ্গ। সুতরাং নেলি জোরে কথা বলতে পারল। —তু যে বল্লমের হেকড় দিতে চাইলি দুখিয়াকে, যদি তোর জেল হয়, যদি তোর গলাটা যায় তখন কেমন হবে!
ও তুকে বেশ্যা বানাতে চাইছে।
বেশ্যা বানাতে চেয়েছে ত হয়েছেটা কী।
রামকান্ত খুব খুশি হচ্ছিল এ—সব বাতচিত শুনে।
তোর সাথ গেলে তুভি ত খুশি হবি। তু পচাই খেতে বুলে হামারে লোভ দেখাতে চাস।
গেরু জবাব দিতে পারল না। ওর এমনই যেন একটা ইচ্ছা শরীরে এতক্ষণ ধরে কাজ করছে। আঁধারে সে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। নিজেকে অপরাধী ভাবল। আঁধারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছে শরীরের যন্ত্রণায় গেরু কথা বলতে পারছে না, থরথর করে কাঁপছে। অনেক আশা নিয়ে গেরু উনুনের ওপর মুখ বাড়িয়েছিল। অনেক আশা নিয়ে এসেছিল সে দুদণ্ড নেলিকে কাছে পাবে বলে। নেলি হাসল। গেরুর হাত ধরে বলল, চল গেরু, পচাই লিয়ে নদীর ঢালুতে চল। লেকিন তু হামার গায়ে হাত না দিবি কথা থাকল। তু হামারে ঢালুতে বেশ্যা না বানাবি কথা থাকল।
সেই নির্জন আঁধারে গেরু প্রতিজ্ঞা করল যেন মাথা নেড়ে—সে কখনও হবে না। জান যাবে লেকিন বাত ঠিক থাকবে, গেরুর চোখেমুখে নেলির জন্য এমনই একটি আশ্বাস। গঙ্গা—যমুনা সঙ্গে থাকল। দরকার হলে গঙ্গা—যমুনা পাহারা দেবে।
সরীসৃপের মতো ঘন আঁধারের শরীর ভেঙে গেরু, নেলি মদের ভাঁড় নিয়ে নদীর ঢালুতে নেমে গেল। আঁধারে সাদা বালিয়াড়িটা বাসি দুধের মতো পড়ে আছে। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। বাবলার ঘন বনে জোনাকি জ্বলছে। দূরে শহরের বাড়ি ঘরে আলো, আঁধারে ওরা নদীর পাড়ে বসে। মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। বড় ঘন এ—আঁধার! বড় গভীর এ—আঁধার—অথচ গঙ্গা—যমুনার চোখের মতো স্বচ্ছ। নেলি গেরুর মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সারা আকাশ জুড়ে কত নক্ষত্র। নেলি ভালোবাসার জন্য বড় আকুল বোধ করছিল।
গাং শালিকের সেই শব্দটা কুনুয়া, কুনুয়া, কাকের সেই কাঠ কাঠ শব্দ—ক্ক ক্ক আর শালিকের শব্দ ঘেররো ঘেররো—মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ভোরের কথা বলছে। ঘাসে ঘাসে শিশিরের জল। নালা ডোবায় মরা ইঁদুরের পচা গন্ধ। ঝোপে জঙ্গলে পাতারা সব শুকোচ্ছে, পাতারা সব পচে, ফসিল হতে চাইছে। বেশ্যা পট্টিতে মেয়েরা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। হাতে পায়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা। সমস্ত রাত ওদের শরীরে বড় ধকল গেছে। ওরা আশা করছে বিছানাতেই যদি এক কাপ চা হত।
গঙ্গা থেকে স্নান সেরে ওঠার সময় ঘাটোয়ারিবাবু স্তোত্র পাঠ করেন। তারপর গীতার প্রথম পর্ব থেকে শেষ পর্ব। শিবমন্দিরের পথ ধরে উঠে আসার সময় কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠেন মাঝে মাঝে। কারণ এক সময় ডানদিকের পথটা ধরে তিনিও সে অঞ্চলে ধাওয়া করতেন। আজ তারা আর নেই। সময় বড় তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে। তিনি যখন চেয়ারে বসে থাকেন, অথবা শূন্য দৃষ্টিতে যখন ঘাটটা পর্যন্ত শূন্য ঠেকে, তখন এইসব স্মৃতি মনে করতে পারেন, তখন তাদের ভালোবাসার কথা মনে হয়। তাদের অনেক সুখ দুঃখের কথা মনে হয়। তিনি পথের পাশে সেজন্য রোজ একটু থামেন। যারা একে একে এই পথ ধরে বের হয়ে আসে তাদের তিনি দেখেন। কোনো পরিচিত ভদ্রলোককে দেখলে মুখ টিপে হাসেন। তখন আকন্দ গাছটার নিচে তোলা ছবিগুলোর কথা মনে হয়। আকন্দ গাছটার নিচে আবার যখন ছবি উঠবে তখন ছবিতে তারাও জায়গা পেয়ে যাবে।
তিনি অফিসঘরে ঢোকার সময় শুনলেন গোমানি ডোম মাচানে পড়ে পড়ে কাশছে। তিনি বিরক্ত হয়ে দেওয়ালের ছবিগুলোয় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেন। —বেটা শালা মরবে। কেশে কেশে মরবে। সেজন্য বেটা তুই ভাবিসনে, আকন্দ গাছটার নিচে তোর ছবি উঠবে। ভাবিস না বাবুদের মতো তোর ছবিও আমি ঘরে রাখব। গোমানিকে তিনি মনে মনে যতটা পারলেন গালমন্দ দিলেন। তা ভাবিস না বাপু তা ভাবিস না। যারা ইতর, বদমাইস তাদের ছবি আমি রাখি না। তাদের ধূপধুনো আমি দিই না।
ঘাটোয়ারিবাবু ঘরে ঢুকে প্রতিদিন যা করেন, আজও সেইসব কাজগুলো করলেন। ভিজা গামছা দিয়ে দেওয়ালের ছবিগুলোকে মুছে দিলেন। সামনের আকন্দ গাছটার নিচে এক ঘটি জল ঢেলে দিলেন। যতবার এই গাছটার নিচে ছবি উঠেছে, ততবার তিনি একখানা ছবি পাবার আশা রেখেছেন। কেউ দিয়েছে, কেউ কেউ দেয়নি। যারা দিল তাদেরগুলো তিনি সযত্নে দেয়ালে টাঙালেন। ধূপধুনো দিলেন। বললেন, হরিবোল। বললেন, পরমব্রহ্ম নারায়ণ। প্রত্যেক কাজগুলো এখনও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। তারপর ভিজা কাপড় ছেড়ে শরীরে চাদর জড়িয়ে জানালায় উঁকি দিলেন—কেউ উঠেছে কিনা চটানে, কেউ এদিকে আসছে কিনা দেখলেন। এ সময় একটু মহাদেবকে, বাবা ব্যোম ভোলানাথকে স্মরণ করার দরকার হয়। তার পায়ের তলায় বসে প্রসাদ পেতে ইচ্ছে হয়। এখন কৈলাসের আসার কথা, গোমানির আসার কথা, শীতের ভেতর ওরা ল্যাং খেতে খেতে আসবে।
