ঘাটোয়ারিবাবুও দরজায় কার পায়ের শব্দ পেলেন। —কে দরজায়? ঘাটোয়ারিবাবু প্রশ্ন করলেন।
হামি কৈলাস আছে বাবু!
এ—অবেলায় কেন আবার?
ফরাসডাঙায় যাচ্ছি।
ফরাসডাঙার যাচ্ছিস ত এখানে কী?
একটা কথা বুলতে এলাম বাবু। যদি মেহেরবানি করে শোনেন। যদি থোরা দয়া হয়।
দয়া বুঝিনে। যা বলবার বলে ফেল।
হামি ত বাবু বেশি দিন বাঁচবে না। গেরুর লাগি বহুত চিন্তায় আছি। হামি মর যানেসে গেরু কী করবে কেনা জানে বাবু। দু চারঠো বাত আপনার পাশ বুলে লিব। দু চারঠো আর্জি আপনার কাছে পেশ করব। এই সব বলে কৈলাস দরজার ওপর বসে পড়ল। ফের বলতে থাকল, ওকে একটু দেখে লিবেন বাবু। আমি মর যায় তো ওয়ার কৈ না থাকল। দু চারঠো ঘাটের মরা দিয়ে গেরুকে বাঁচিয়ে দিবেন। আপ ওয়ার মা—বাপ!
ঘাটোয়ারিবাবু কোনো জবাব দিলেন না। কৈলাস কোনো জবাবের প্রতীক্ষা না করে চলে গেল। অনেকদিন থেকেই সে ভেবেছিল ঘাটোয়ারিবাবুকে গেরুর ভার দিয়ে নিজে খালাস পাবে। নিজের দায় থেকে মুক্তি পাবে, অথবা নিজের মৃত্যুর পর গেরুর সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।
ঘাটোয়ারিবাবু কৈলাসের কথা ভেবে একটু অন্যমনস্ক হলেন। একটু বিচলিত হলেন। লোকটা সারা জীবন মড়ার পিছনে ছুটে শেষ বয়সে অন্যের বাচ্চার জন্য হাউহাউ করে কাঁদতে চাইল। তিনি কৈলাসের চোখ দেখে যেন সব ধরতে পেরেছেন।
কৈলাস অফিসের বারান্দা থেকে নেমে এল। তাবিজের উপর দিন দিন যত বিশ্বাসটা ভেঙে যাচ্ছে, তত সে নিজেকে খুব অসহায় মনে করছে। তত গেরুর জন্য চিন্তা বাড়ছে। ঘুম থেকে উঠে সে দেখল গেরুটা ওর পাশে শুয়ে আছে। বেড়ালের বাচ্চার মতো ঘুম যাচ্ছে। ওর কেমন মায়া হল। কেমন করে গেরুর মার কথা মনে পড়ে গেল। সেই সুখের দিনগুলোর কথা এক এক করে মনে করতে পারল। যত মনে হল তত দুঃখ পেল। তত গেরুর জন্য মমতাবোধ বাড়তে থাকল। তত বাচ্চাটার জন্য ওর বেশি চিন্তা হল। ঘাটোয়ারিবাবুকে বলতে পেরে সে এখন যেন খুব হালকা বোধ করছে।
কৈলাস ঘরে ঢুকে এক ছিলিম তামাক খেল। গেরু ঘুমোচ্ছে—ঘুমোক! আজ আর গেরুকে ফরাসডাঙায় নিয়ে গিয়ে কাজ নেই। পর পর দু রাত জেগে থাকলে শরীরটা ওর খারাপ হয়ে যাবে। সেজন্য কৈলাস হারিকেন জ্বালিয়ে এক ভাঁড় পচাই হাতে, বল্লম নিয়ে নদীর পথে নেমে পড়ার আগে বৌকে বলল, আজ ফের হামলা বাধাবি না ঘাটোয়ারিবাবুর দরজায়। তবে খুন করব বুলে দিলাম।
ঘাটের তিনটে চিতা তখন নিভে আসছে। কৈলাস নদীর পাড় ধরে ফরাসডাঙায় চলে গেল। খেয়াঘাটে আলো জ্বলছে। ওপারে গোরুর গাড়ির নিচে হারিকেন দুলছে। দুটো একটা শীতের ব্যাঙ গর্তে মুখ লুকিয়ে ক্লপ ক্লপ করল। নদীর ধারে লোক চলাচল কমে আসছে, শীতের রাত বলে পথ ঘন আঁধার না হতেই নিঃসঙ্গ হয়ে উঠছে। শুধু নদীর ঢালুতে দু—চারজন লোক কাঁচা কয়লার আগুন ধরিয়ে ছইয়ের নিচে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ছে। ছইয়ের নিচে হারিকেন ঝুলছে। লণ্ঠনের আলোয় ওদের মুখ শীতের রাতে গর্তের ভিতর ক্লপ ক্লপ শব্দ করা ব্যাঙের মতো। গঙ্গা—যমুনা মাটি শুঁকতে শুঁকতে সেদিক দিয়ে গেল। ওরা ব্যাঙের মতো মুখগুলো দেখে আর দাঁড়াল না। এখানে খাবার নেই এ—সব মুখ দেখে ওরা বুঝতে পারল।
গেরু ঘুম থেকে উঠে দেখল চালাঘরটায় সে একা। ঘরটায় কোনো লম্ফ জ্বলছে না। সে উঠে চারপাশের মাচানটা হাতড়াল। বাইরে একটা লম্ফ জ্বলছে। সৎমা ঘরে নেই গেরুর। সে তার শরীরের জড়তা নিয়ে মাচান থেকে নামল। সে বাপকে খুঁজল। বাপ চটানে নেই। ঘরে হারিকেন নেই, বল্লম নেই—বাপ আজ একাই ফরাসডাঙায় গেছে। বাপ ওকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেনি। বিরক্ত করেনি তাকে। বরং এক ভাঁড় পচাই মাচানের নিচে পড়ে আছে। সে বুঝল ওটা ওর জন্য রেখে গেছে বাপ। বাপের বৌটা এখন অন্য কোনো ঘরে হয়তো চাট দিয়ে পচাই গিলছে। চালাঘরে সে তার নিজের ভাঁড়টা দিয়ে মাংসের চাট খুঁজতে থাকল। এবং ভাবল নেলিকে ডেকে একটু পচাই খাওয়াবে। বাপ যখন ঘরে নেই, বাপের বৌটাও যখন নেই তখন তারা দুজনে নিশ্চিন্তে বসে এ—ঘরে পচাই গিলতে পারবে।
আগুনের পাশে চুপচাপ বসে আছে নেলি। উনুন থেকে আগুনের উত্তাপ নিচ্ছে। দুদিন পর বাপ দুটো অবেলায় খেয়ে, ঝাড়োর ঘরে একটু পচাই টেনে সকাল সকাল মাচানে ঘুমিয়ে পড়েছে। ইচ্ছা করেই নেলি লম্ফ জ্বালল না। আঁধারটা ওর ভালো লাগছে। ওর ইচ্ছে এ—সময় গেরু এসে ওর পাশে বসুক একটু পোড়া কাঠের উত্তাপ নিক। মনু ডোমের ঢোল বাজানোর শব্দ আসছে না আর। ঝাড়ো ডোমের ঘরে সবাই ঝিমিয়ে পড়েছে। হরীতকীর ঘরে আলো জ্বলছে এখনও। বাচ্চাটা দুবার ট্যাঁট্যাঁ করে কাঁদল। কান্না শুনে নেলির ভারী আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছে বাচ্চাটাকে। পোড়া কাঠের আগুনে নেলির মুখ লাল। মনের ভিতর এখন আগুনের রঙ। বুকের ভিতর ইতর শখগুলো গেরুর মতো একটা ছোট কাঠের পুতুল বানাতে চাইছে। সেজন্য সমস্ত শরীরে আগুনের রঙটা গলে পড়ছে যেন। নেলি বসে থাকতে পারছে না। গেরু হয়তো ফরাসডাঙায় গেছে। নতুবা সে এখন গেরুর ঘরে গিয়ে আর কিছু না হোক কাঠের পুতুলটার জন্য রঙ গুলতে পারত। নেলি দুদিন পর পেট ভরে খেতে পেয়ে চটানটাকে ফের ভালোবেসে ফেলল। সেজন্য মুখোমুখী বসে রঙ গুলতে চাইল সারারাত।
গেরু সন্তর্পণে এসে উনুনের ওপর মুখ বাড়াল তখন। —হামার ঘরে চল নেলি। গেরু ফিসফিস করে বলল যেন গোমানি না শুনতে পায়। —এক ভাঁড় পচাই আছে। তু আর হাম খাবে। ঘরে বাপ নেই, মায়ি ভি নেই। তু চল।
