নেলির ঘরেও পোড়া কাঠ জ্বলে উঠছে। নেলি রান্না চড়াল, অন্য দশটা ডোমের মতোই ওর রান্না। ঘাটের পোড়া কাঠে পুরোনো হাঁড়িতে ভাত হবে। ফ্যানটুকু গেলে প্রথমেই নেলি চুমুক দিয়ে খেয়ে নেবে। একটু নুন দেবে মুখে।
নেলির ফ্যান খাওয়া গোমানি মাচানে বসে দেখল। ওর ইচ্ছা এ—সময় নুন মিশিয়ে সেও একটু ফ্যান খায়। তা নেলি যখন দিল না, গোমানি তখন বায়না ধরতে থাকল—হামারে এটা দে, ওটা দে। হামি ফ্যান খাব। হামারে আর ভুখা রাখিস না। পেট হামার হারমাদ হয়ে উঠল।
নেলি একটু ডাল সিদ্ধ করে নিল মালসায়। অন্য একটা মালসাতে বাপের জন্য ভাত বাড়ল, তারপর বাপকে খেতে দিল। নিজেও খেল এক সময়। ওরা জল খেয়ে দুজনেই বড় রকমের ঢেকুর তুলল।
এখন ইচ্ছা করছে গোমানির নেলির সঙ্গে দু চারটা ভালোমন্দ কথা বলে। ইচ্ছা হচ্ছে নেলিকে পাশে বসিয়ে আদর করতে। কিন্তু এ—সময়ে কেন জানি ফুলনের স্মৃতি ওকে বড় কাতর করছে। বাপ বাঙালি ডোমকে স্মরণ করে সে হাতজোড় করল। বাপের জন্যই হাসপাতালের চাকরি। বাপের জন্যই সে মাস গেলে আশিটা টাকা পায়। কিন্তু মাসের পনেরো দিন যেতে না যেতেই টাকাগুলো নিঃশেষ হয়—এজন্য ওর এখন খুব দুঃখ। নেলির কথা ভেবে দুঃখ আরও গভীর। মাসের শেষে ধার—দেনা, তারপর সুদ গোনা। মাসের প্রথম তারিখে কিছু দেনা শোধ করা। মাসের শেষ দিকে নেলিকে খুন জখম করা। আর এও নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে মাসের শেষ দিকে দু তিনটে রোজ উপোস দেওয়া। চুপচাপ পড়ে থাকা মাচানে এবং নসিবকে গালমন্দ দিয়ে চোখ বুজে থাকা। এ—সময়ে চটানটা ওর কাছে হারাম। মানুষগুলো সব অজাত—কুজাত। দুনিয়াটা রসাতলে যাচ্ছে।
বাপ বঙ্গালী ডোমও এ—কথা বলত ঘরে ফিরে—দুনিয়াটা রসাতলে যাচ্ছে। তখন গোমানি চটানে পড়ে থাকত না। সদর জেলের পাশে একটা কুঠরি ছিল বাপ বঙ্গালী ডোমের, মা সিঁদুরী সেখানে থাকত। গোমানি থাকত মা—বাপের সেই কুঠরিটায়। বাপ সদর জেলে গলায় দড়ি পরাত। ফাঁসি দিত হারমাদ লোকদের। এবং ঘরে ফিরে মা সিঁদুরীকে বলত, দুনিয়াটা ডুবে গেল রে বুড়ি। বাপ বঙ্গালী ডোমের মতো গোমানিও আজকাল এসব কথা বলতে শিখেছে। মেয়েটা দিন দিন ডাইনি বনে যাচ্ছে—এ—কথা ভাবতেও ওর কষ্ট হয়। রাতের আঁধারে মেয়েটা কখন যে বের হয়, আর কখন যে ফিরে আসে! রাতের আঁধার থেকে কী করে যে মালসা মালসা ভাত নিয়ে আসে! কী করে যে কখন সখন এত সব খাবার জোগাড় করে নেলি! আশ্চর্য! আশ্চর্য! সব নসিব, নসিবের খেলা, নসিবের ভাঁওতা। নেলি ডাইনি বনে যাচ্ছে। যাক! যাবে। গোমানির নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছা হল। শরীর কামড়াতে ইচ্ছা হল গোমানির, ভালো লাগে না এ—সব! ভালো লাগে না। রাতে এমন সজাগ পাহারা রেখেও মেয়েটাকে ধরে রাখতে পারছে না। মেয়েটা ভোর রাতে ভাত আনে, ডাল, তরকারি ভাজা আনে—কিছু বলতে গেলে খেঁকিয়ে ওঠে। কিছু বলতে গেলে খটাশের মতো মুখ করে কামড়াতে আসে। ঘাটে মড়া এলে নেলি অফিসে ঘুরঘুর করবে। মড়ার নাম ধাম, মড়ার হদিস নেবে। শেষে নেলি রাতের আঁধারে গঙ্গা যমুনাকে নিয়ে বের হয়ে পড়বে। বাড়িটা খুঁজবে। খুঁজে বের করার পর রাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। কোনোদিন পাবে কিছু, কোনোদিন পাবে না। বাপকে ভালোমন্দ খাওয়াবার এবং নিজে ভালোমন্দ খাবার লোভ কিছুতেই সামলাতে পারবে না। তখন চটানের কোণে মরদদের চোখ টাটায়। তখন ওরা হাজার রকমের ঠাট্টা—তামাশা করে। তখন গোমানি মাচানে বসে গজরাতে থাকে, মেয়েটার গলাটিপে ধরতে ইচ্ছা হয়, অথচ যখন মালসা থেকে নেলি খাবারগুলো আলগা করে বাপকে দেয়, তখন বাপ খুশি হয়ে বলবে, দুটো রেখে দিস। অথচ গোমানি খেতে আরম্ভ করলে সে—সব কথা মনে থাকে না। এতটুকু পেটে মালসা—মালসা খাবার গিলে বলবে হামি ব্যারামী নাচারী লোক আছি। দুটো জায়দা খেয়েই লিবে।
শীতের রোদ যত চটান থেকে নেমে যেতে থাকবে, তত চটানটা নিজের স্বভাব খুলে ধরবে। তত চটানটা মাতাল হতে শুরু করবে। পচাই খাবার জন্য প্রায় ঘরেই এখন চাট হচ্ছে। গোমানির ঘরে চাট হচ্ছে না। কিন্তু গোমানি ঝাড়ো ডোমের সঙ্গে এখন কথাবার্তা বলছে। একটু পচাই গিলবার জন্য ভাব জমাচ্ছে। এমন শীতের সন্ধ্যাটা মাটি হোক, সে তা মনে মনে চায় না। ঝাড়োর সঙ্গে ভাব জমুক, দু ঢোক পচাই গিলতে পারুক, তেমনি ইচ্ছা ওর। ল্যাং খেতে খেতে এবার সে ঝাড়োর দাওয়ায় গিয়ে বসল। ঝাড়ো ডোমের বিবিকে ডাকল। দুটো মিঠা বাত বলে বিবির মন ভিজাতে চাইল। তারপর লাশ—কাটা ঘরের গল্প জমিয়ে সেই দাওয়ায় জাঁকিয়ে বসল। আর কে আছে তাকে দাওয়া থেকে তোলে। এখন কে আর আছে এ ঘরে, ওকে এক চুমুক না দিয়ে খায়। এখন এমন কার হিম্মত আছে, শীতের সন্ধ্যাটা মাটি করতে পারে। সেজন্য গোমানির দুনিয়া এখন মজাদার দুনিয়া। খুব খুবসুরত দুনিয়া। এ দুনিয়াতেই বেঁচে সুখ। ঘাটে তিন তিনটে চিতা জ্বলছে—আহা এ দুনিয়াতেই বেঁচে সুখ। তিন তিনটে চিতা জ্বলছে, আকাশ লাল হচ্ছে মাটি লাল হচ্ছে। নদীর জল লাল—চটানের ঘরে ঘরে বিবিরা লাল নীল হচ্ছে। রঙিন কথা বলছে। জোয়ান মরদেরা শরীর রাখবার জায়গা পাচ্ছে না। জোয়ান বৌ—ঝিরা বেসামাল হয়ে পড়ছে। দুখিয়ার বৌ মংলি দুলতে দুলতে অন্য ঘরে যাচ্ছে। দুখিয়া ওর হাত টেনে রাখতে পারছে না। —ছোড় দে তু, মুঝে ছোড় দে। হাম চল যাও কাহাভি। তুর সাথ আর ঘর না করে। ভোরের আরশি দেখা, ঘাটের দামি কাপড়টায় রং, এক খিলি পানের রস ঠোঁটে, পচাই খাওয়ার পর উগ্র হয়ে উঠেছে। হে হে করে ঢোল বাজাচ্ছে মনু ডোম। মংলি দরজায় কার গানের শব্দ পেল। লোকটা এসেছে। মংলি উধাও হতে চাইল।
