নেলি সিঁড়ি ধরে নিচে নামল। মনে মনে সে এখন গেরুকেই খুঁজছে। হাতে ওর একটা টাকা—অনেক সম্পদ! অনেক আকাঙ্ক্ষা এখন নেলির মনে। এক টাকায় কী কিনবে! কত কিনবে! এক সের চাল, এক পো ডাল, এক পয়সার পেঁয়াজ। দু পয়সার তেল। একটু নুন। সে খাবে, বাপ খাবে। গেরু খাবে কিনা তাও ভাবল। কাঠ বইবার সময় গেরুকে সে অনেক গালমন্দ দিয়েছে। গেরুকে বকে নিজেই কষ্ট পাচ্ছে এখন। চোখ তুলে এ—ঘর সে—ঘর দেখল। কোথাও নেই, কোনো ঘরে কেউ নেই। গেরু কোথাও নেমে গেছে, রেগে গেছে।
নেলি এবার শিবমন্দিরের পথে পড়ল। রামকান্তর দোকানে গিয়ে দাঁড়াল। এ—দোকানে সে দুটো পেঁয়াজ, একমুঠো চাল, একটু নুন বেশি পাবে। সেজন্য সে অন্য দোকানে গেল না, অন্য পথ ধরল না। রামকান্তর দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে হাঁকল, আট আনার চাল দে বাবু। দু আনার ডাল দে বাবু। দু পয়সার তেল, এক পয়সার নুন। এক এক করে নেলি সওদার নাম করে গেল, এক এক করে রামকান্ত সব বেঁধে দিল। তারপর নেলির দিকে চেয়ে বলল, ভোররাতে তোর বাপ চিল্লাচ্ছিল কেনরে?
জবাব দেবার আগে নেলি চটানের অন্য পাশে হল্লার শব্দ শুনল। ক্রমশ এদিকেই যেন আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। সে দেখল দুখিয়া ছুটে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। পিছনে গেরু ছুটছে। গেরুর হাতে বল্লম। দুখিয়া নেলির সামনে এসে থেমে গেল। তু হামারে বাঁচা। গেরু হামারে বল্লমের হেকড় দিতে চাইছে।
নেলি দেখল, দুখিয়া ভয়ে কাতরাচ্ছে। দুখিয়ার মুখ দেখে নেলির কষ্ট হল। নেলি তাড়াতাড়ি দুখিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর গেরুর দিকে চেয়ে বলল, আঃ যা তু। গেরুকে ডাকতে থাকল।
আঃ যা, দেখি তুর কত মুরদ।
মুরদ আছে, জরুর মুরদ আছে। বলে গেরু নেলির পিছনে ছুটে গেল এবং দুখিয়ার গলাটা টিপে ধরতে চাইল। বলল, শালে কুত্তা! শালে বেইমান। নেলিকে তু বেশ্যা পেলিরে।
গেরু তু চুপ কর। চুপ কর। কী করেছে বুল! নেলি গেরুর হাত ধরল এবার। চটানের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইল। —কী হয়েছে বুল?
গেরু কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু হাঁপাতে থাকল। শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে গজরাতে থাকল। সে নেলির চোখ দেখল, মুখ দেখল। ওর দুঃখ বাড়ছে। অথচ কিছু বলতে পারছে না। বলতে পারল না—ও শালে বুলে কী নেলি, তু বেশ্যা। রামকান্তকে এ—সব কথা বুলেছে, আর মাগনা চপ ভাজা খাচ্ছে। বলতে পারল না, ও শালাকে হাম জরুর খুন করবে। জরুর হেকড় দেবে বল্লমের। শুধু ফ্যালফ্যাল করে নেলির দিকে চেয়ে থাকল। গেরুর আপসোস বাড়ছে—সে বলতে পারছে না, দুখিয়া দিন দিন বাবু হয়ে উঠছে। দিন দিন জায়দা পয়সা কামিয়ে টেরি কাটতে শিখেছে। কোঁচা মারতে শিখেছে। রামকান্তর দলে ভিড়ে নেলিকে অসৎ বানাতে চাইছে। কিছু বলতে না পেরে গেরু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কঠোর উত্তেজনায় ভুগল। চটানের মেয়ে—মরদেরা এইসব দেখে হাসল আর হাসল। কারণ নেলি তখন গেরুকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। গঙ্গা—যমুনার মতো গেরু নেলির বশ মেনেছে।
চটানে মেয়ে—মরদেরা সব ফিরে এল। উঠোনে মাদুর বিছিয়ে বিকেলের রোদ শরীরে মাখাল। লাশ—কাটা ঘরে গোমানি আজ যায়নি। হাসপাতাল থেকে পুলিশ আসেনি। সে মাচানে পড়ে পড়ে সারাদিন গালমন্দ দিয়েছে। এখন নেলি দুটো রেঁধে খাওয়াবে জেনে নিশ্চিন্ত মনে চটানে ল্যাং খাচ্ছে। শীতের আমেজ আকাশ দেখে চিনতে পারছে। না খেতে পেয়ে মনটা এতক্ষণ কাঠের মতো হয়ে ছিল। ওর দুঃখ হচ্ছিল হাসপাতালে আজ যেতে পারল না, লাশ—কাটা ঘরে পেট চিরতে পারল না মানুষের এবং চুরি করে ইসপিরিট খেতে পারল না। বিকেলের মেজাজটা সে পাচ্ছিল না। ওর দুঃখ সেজন্যও। কিন্তু ঝাড়ো ডোমের ঘরে চর্বির গন্ধ। কিছুদিন থেকেই চর্বি খাওয়ার শখ হয়েছে গোমানির। কিছুদিন থেকেই বলবে ভাবছিল নেলিকে, শুয়োরের চর্বি দিয়ে ভাত দে নেলি। চর্বির গন্ধটা বার বার পেটের যন্ত্রণাকে প্রকট করে তুলছে। নেলি ফিরছে না এখনও, নেলি ঝগড়া করছে গেরুর সঙ্গে। কখন ফিরবে, কখন রান্না চড়াবে? কখন দুটো ভাত, একটু নুন, একটুকরো পেঁয়াজ ওর পাশে রাখবে! সে এইসব ভাবতে ভাবতে একটু এগিয়ে গেল।
তখন ঘাটোয়ারিবাবু তাঁর নিজের চেয়ারে—সেই চোখ, সেই মুখ নিয়ে বসে আছেন। জানলার গরাদে চোখ রেখেছেন। গরাদের ফাঁক দিয়ে কত আগুন দেখলেন, কত শকুন উড়ল আকাশে, কত জল এই নদী ধরে সমুদ্রে নেমে গেল—অথচ তিনি তাঁর নিজের চেয়ারে। কত ধনী এল, কত গরিব এল ঘাটে, অথচ তিনি তাঁর নিজের চেয়ারে। এইসব দেখে এবং ভেবে তিনি স্থির করেছিলেন—মৃত্যু, মৃত্যুই সব, মৃত্যুই শেষ। মৃত্যুর জন্যে দুঃখ অথবা মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুঃখ—উভয়ই পরিহাসজনক। উভয়কেই তিনি ঘৃণা করে এসেছেন এতদিন। উভয়ের জন্যই তিনি গরাদের ফাঁকে কঠোর দৃষ্টি হেনেছেন। শিবের মতো ত্রিনয়ন খুলে বলেছেন—পরম ব্রহ্ম নারায়ণ। ব্রহ্মই সত্য, জগৎ মিথ্যা। বলেছেন, কেঁদে কেটে কী হবে, জীবনে এটাই ত নির্দিষ্ট ছিল। তবে কান্না কেন? আনন্দ করো, আনন্দ করো। অথচ তিনি যত মৃত্যুর মুখোমুখি হাজির হচ্ছেন, যত বয়স বাড়ছে, ততই বিষণ্ণ হয়ে পড়ছেন। ততই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠছেন না। ততই তিনি কম কথা বলছেন। ততই তিনি যেন জগতের এই মিথ্যা মায়ায় জড়িয়ে পড়ছেন। তিনি চোখ ফিরিয়ে দেখলেন চটানে কৈলাস মাচানে ঘুম যাচ্ছে, আর ওর বৌটা মনু ডোমের সঙ্গে একখিলি পান খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে। মনু ডোমের সঙ্গে বৌটা পান খেতে চলে গেল। অশ্বত্থের ডালে সব কাকেরা ফিরে আসছে। ভোরে যে মরা কাকের বাচ্চাটার জন্য ওরা কেঁদেছিল এখন আর কাঁদছে না। ডালে বসে ওরা বিশ্রাম নিচ্ছে। ঘাটোয়ারিবাবুর মনে হল তিনি যেন সারা জীবন বিশ্রামই করে এসেছেন। তিনি যেন মরে বেঁচে ছিলেন। তিনি দেখলেন এখন চটানে ঘরে ঘরে পোড়াকাঠের আগুন জ্বলে উঠছে। হাঁড়ি হাঁড়ি পচাই জড়ো হয়েছে চটানে। দুখিয়ার বউ মংলি পাঁঠার নাড়িভুঁড়ি দিয়ে চাট বানাচ্ছে। ঝাঁঝালো গন্ধ চটানে। চাটের ঝাঁজ, মনের ঝাঁঝ। বাবুদের বাড়িতে রেডিয়ো বাজছে। তখন নেলি চটানে ফিরছে। গঙ্গা—যমুনা এধার ওধার খেয়ে ঢেকুর তুলছে। গেরু ঘরে ঢুকে বাপের পাশে শুয়ে পড়ল। বুঝি ঘুমোল। বুঝি রাতে ফের পাহারা দেবে। ঘাটোয়ারিবাবু অফিসঘরে বসে সব দেখে এ—সব ভাবলেন।
