স্নান—শেষে কৈলাস ঘরে ঢুকলে একথালা পান্তাভাত বেড়ে দিল বৌটা। তেল—চিটচিটে গামছা দিয়ে কৈলাস শরীর মুছল। তারপর দু ঠ্যাং বিছিয়ে এক কোণায় খেতে বসে গেল। দুটো শুকনো লংকা পাশের পোড়া কাঠে পোড়াবার সময় ডাকল, গেরু, তু কাঁহা রে? খানা—পিনা তু করবি না? এ—সময় কৈলাস একটা পেঁয়াজ চাইল বৌটার কাছে। বৌ কাঁচা পেঁয়াজ দিল। তারপর বলল, খানিক পচাই লিবি? গত রাতে গেরুর সৎমা সবটুকু পচাই শেষ করতে পারেনি বলে এই ধরনের সুখের কথা বলতে পারল। কৈলাস এতক্ষণ পর খুব খুশি—খুশি হয়ে উঠল। বলল, তা আছে লাকি? থাকলে দে দুটো ঢেলে। ভাতের সঙ্গে পচাই খেতে পেয়ে কৈলাস এত খুশি যে বৌটার কানের কাছে মুখ না নিয়ে আর পারল না। ফিসফিস করে বলল, মড়াটা যে মেয়েমানুষ লা। ভারী ঠোঁট দুটো বলতে গিয়ে নিচে ঝুলে পড়ল। মাগিটা মায়ের দয়াতে পার পেল।
এ চটানে খবর দেওয়ার মতো আর একটা খবর আছে কৈলাসের। খবর—মেয়েমানুষটার দাঁত একটাও পড়েনি। খুলিটার দাম জগুবাজারের হিল্টন কোম্পানির বড়বাবু পুরো এক কুড়ি আঠারো টাকা দেবেনই, সব দাঁতগুলো ঠিক থাকলে তিনি খুলির জন্য পুরো আটত্রিশ টাকাই দেন। দাঁত যদি দুটো একটা না থাকে তবে দাম কমবে ফাটকা বাজারের মতো। চড় চড় করে দাম কমে দশ—পাঁচ হতে পারে। সেজন্য কৈলাস ফরাসডাঙার জঙ্গলে মড়া পেলে কবর খুঁড়ে প্রথম দাঁতগুলো দেখে। দাঁত ক’টা থাকল, কটা উঠল দেখে।
দাঁত কম থাকলে নিজের দাঁতে হাত বুলোয় কৈলাস। বলে, এ—মুর্দা হামার মতো পাপী—তাপী কিছু একটা হয়ে লিবে।
থালায় যখন পচাই ঢালছিল বৌ, তখন সে খবরটা না দিয়ে থাকতে পারল না। এতক্ষণ ধরে এই খবরটা দেওয়ার জন্য ছটফট করছিল সে। মুখের ভেতর এক ঢোঁক পচাই নিয়ে বলল, মড়ার বত্তিসটা দাঁত আছে রে বৌ! ঘরে পয়সা এ টাইমসে জায়দা উঠবে। গেরুটাকে একটু সামলে চলতে বুলবি। ডাইনি মাগিটার সঙ্গে মিশতে বারণ করবি। তাহলে আগামী সালে একটা সাদি—সমন্ধ করে লিব। তু কী বলিছে?
তা লিবি। কিন্তুক ওয়ার গতিক—বিতিক ভালো লয়। বলে উঠে দাঁড়াল সে। সরু কোমরটা নেচে উঠছে। বেশি পয়সার কথা শুনে চোখ দুটো ওর চকচক করে উঠছে। দু—কদম সে পা বাড়াল সামনে, কোণ থেকে মাদুরটা এনে সে মাচানে বিছিয়ে দিল।
কৈলাস নতুন মাদুর দেখে ফিসফিস করে বলল, কাহার মন ভুলালি রে বৌ? দুখিয়ার লয় তো? মরঘাটির ডাক তো এ—সালে ওয়ার।
বৌটার গলায় এবার সোহাগ উথলে উঠছে, তু যে কী বলিছে!
কৈলাস মাচানে গড়াগড়ি দেওয়ার সময় বলল, দেখে লিবি, এবার মড়ক লিশ্চয়ই একটা লাগবে। ঠান্ডা আভিতক পুরোদমে থাকল, লেকিন মায়ের দয়া আরম্ভ হয়ে গেল। লিশ্চয় মড়ক লাগবে। লিশ্চয় লাগবে। বাপজী ঠাকুরের মানত করে লিলুম। সে দুহাত তুলে বাপজী ঠাকুরকে মানসা দিল। কৈলাসের খাপছাড়া বেঢঙের শরীরটার দিকে নজর দিতে দিতে বৌটা যেন আঁতকে উঠল। বলল, তবে!
সে হাসল চোয়ালের সেই নোংরা দাঁত দুটো বের করে। হাসতে হাসতে বলল, ও কিছু লয়, ও কিছু লয়। লেকিন এ সালে তুর গায়ে গহনা উঠবে। হামি কৈলাস ডোম এ—কথা বলিছে। ঝুমঝুমখালি আর ফরাসডাঙার জঙ্গলে মড়া পোঁতার হিড়িক লাগবে, ঠিক গেল চার সালের আগের মতো।
সে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আজ অনেক টাকার স্বপ্ন দেখল। বৌ পাশে বসে রয়েছে। সে বসে বসে কৈলাসের আশা—আকাঙ্ক্ষার কথা শুনছে। শুনতে শুনতে এক সময় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর দুটো হাত চোখের সামনে তুলে কেমন যেন কুঁকড়ে গেল মেয়েটা।
আকাশ এবং মাটি লাল এবং এই মাটির কস খেয়ে পাশের নদীটা পর্যন্ত লাল হয়ে উঠেছে। শ্মশানে একসঙ্গে তিনটা চিতা জ্বলছিল। চটানের মেয়ে—মরদেরা শ্মশানের কাঠ বয়ে কিছু পয়সা পেয়েছে। ঘাটোয়ারিবাবু সবাইকে পয়সা দিয়েছেন। নেলিও হাত পেতেছে এবং পয়সা পেয়েছে! তারপর নেলি সন্তর্পণে বের হয়ে যাবার উপক্রম করতেই ঘাটোয়ারিবাবু ডেকেছেন, বলেছেন, এই ধর, টাকা দিলাম। যত জলদি পারিস টাকা শোধ করবি। না করিস ত খাতায় নাম লিখব। হিসাব রাখব।
নেলি জবাব দিল, তা দেব বাবু। জলদি দিয়ে দিব।
এবং এখন দেখলে মনে হবে না যে নেলি দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে আছে চটানে। মনে হবে না—সে কিছুক্ষণ আগেও ভুখা থাকার দরুন পাগল বনে যাচ্ছিল। মনে হবে না—ভুখা থাকার জন্য সে কিছুক্ষণ আগেও গেরুকে গালমন্দ দিচ্ছিল। গেরু বলেছিল ওকে, তু নিশুতি রেতে একলা ঘাটে গেলি, গহনা খুঁজলি, তু ডাইনি বনে যাবি। তুর ভয় না করল। তখন নেলি গেরুকে গালমন্দ দিচ্ছিল, গেরু তু হামার খবরদারি মত কর। রেতে ঘাটে একা নেমে গিয়েছিল ত হয়েছেটা কি! ঘাটে মড়া ছিল না, লেকিন হামার গঙ্গা যমুনা ত ছিল। তু রামকান্তর ভয় দেখাচ্ছিস, থোড়াই ভয় আছে ওয়ার। বে—সরমের কথা বলে তু গঙ্গা—যমুনাকে দিয়ে ওয়ার চোখ তুলে লেব না! লেকিন তু মরদ না আছে গেরু। কিছুক্ষণ আগে ঘাটে কাঠ নিয়ে যাবার সময় নেলি গেরুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিল, তু মরদ না আছে গেরু। তু ভেড়ি আছে, তু পাঁঠা আছে। তুর বিবিকে লিয়ে ভিন আদমি রঙ্গরস করতে চাইবে, আর তু তখন চোখ মেলে ভেড়ির মতো তাকিয়ে থাকবি। মুরদ থাকে’ত নিয়ে চল অন্য চটানে। দুজনে ঘর বাঁধবি। তখন খবরদারি কর। বেমাফিক চলেছি ত মার—ধোর কর। লেকিন আভি তেরে এক বাত ভি হাম না শোনে। হাম ভুখা আছে। রঙ্গরসের বদলে পয়সা মিলে ত ও ভি হাম লেবে। ভালোমানুষ হয়ে চটানে ভুখা না থাকবে। ডাইনি বনে যাবে ত সে ভি আচ্ছা।
