কোর্ট—কাছারির ময়দানে অশ্বত্থের ছায়ায় অনেকক্ষণ ধরে মহাশক্তি কোমরবাণের ওপর অশ্লীল আলোচনা করত কৈলাস। পাঁচ—সাত টাকার বিক্রি তুলতে সাঁজ নেমে আসতে ময়দানে। শাগরেদ ডোমন সা পাশের একটা কাঠের বাক্সে সব গাছ—গাছালি তুলে সাজিয়ে রাখত। সন্ধ্যার ঘন আঁধারে হারিকেন জ্বালিয়ে চটানের পথ ধরত তারা। শহরের পথ ধরে এলে ঘুরতে হবে ভেবে সে গঙ্গায় নেমে সোজা এসে চটানে উঠত, এবং ঝোপ—জঙ্গল ভেঙে চটানে ফিরতে বেশ রাত হত তার।
গেরুর মা তখন চটানে এসেছে। তিন মাসের বাচ্চাটাকে নিয়ে জিয়াগঞ্জের চটান থেকে কৈলাসের সঙ্গে এ চটানে উঠে এল। হেকিমি—দানরির পয়সায় কৈলাস বৌয়ের মন ভুলাল। বৌটা নতুন শাড়ি পেল, নাকের নথ পেল, সোনার পাতের চুড়ি পরল হাতে। খুব খুশি খুশি মন। জিয়াগঞ্জের চটানে যে না খেতে পেয়ে শুকনা কাঠের মতো রঙ ধরেছিল, এ চটানে এসে সেই বৌ লাউডগার মতো রূপ খুলে ধরল। আহা কী রূপ! কী রূপ! চটানে ফেরার সময় কৈলাস সারাক্ষণ গেরুর মা—র রূপ নিয়ে মনে মনে কোন্দল করত। মনে মনে নিজের বয়েসটার কথা ভেবে মুখ মুষড়ে পড়ত। উত্তর—চল্লিশের কৈলাসকে গেরুর মা—র কাঁচা বয়স সহ্য করবে কিনা ভেবে সারা পথ অন্যমনস্ক হত। তাই প্রথম যৌবনটাকে ফিরে পাবার জন্য অনেক বাছ—বিচার করে, অনেক তন্ত্র—মন্ত্র পড়ে, দেহে ধারণ করেছিল মহাশক্তি কোমরবাণ। বিটি—মানুষের ল গুণ পুরুষমানুষের ছ গুণ। তার ওপর ভাঙা বয়সটা ওকে কেবল বিরক্ত করে মেরেছে। সারাক্ষণ এই সব ভেবে নিজের দেওয়া তাবিজ নিজেই ধারণ করল এবং ভাবল তাবিজের দৌলতে ওর জীবনীশক্তি অনন্ত। ভেবেছিল দেহের আর অপচয় নেই। দেহে ঘুণ ধরবে না, ভাঙবে না, মচকাবে না। মেয়েমানুষের ল গুণকে সে পুষিয়ে নিতে পারবে।
চটানে ফিরতে রাত হয় কোনোদিন। গভীর রাত। গেরুর মা তখনও ঘুমিয়ে পড়ত না। ঘাটের কাঁথাকাপড় গায়ে জড়িয়ে শীতের রাতে কৈলাসের অপেক্ষায় মাচানে বসে থাকত। বসে ওর জন্য অপেক্ষা করত—কখন খাবে, কখন শোবে, কখন ঘুমোবে সেই আশায়। খেতে বসে কৈলাস গেরুর মা—র ভারী ভারী চোখ দুটো দেখে কঠোর উত্তেজনা বোধ করত। তারপর বৌটাকে নিয়ে যেত মাচানে। গেরু যদি কেঁদে উঠত এ—সময়, কৈলাসের মেজাজ বিগড়ে যেত। বলত, সময়—অসময় নাই বেটার! নেমকহারাম শালা হামার! ভোর—রাতে যদি কৈলাস কোনোদিন জাগত, যদি দেখত বৌটা একটু উচ্ছৃঙ্খল ভাব নিয়ে শুয়ে আছে, তখন ফের গেরুর মাকে কাছে টানার চেষ্টা করত। ফের উত্তাপ জমা হত মাচানে। ফের মাচানে গোঙানির শব্দ উঠত। এবং এ—ভাবে গেরুর মাকে কেন্দ্র করে কৈলাস তার অনন্ত জীবনীশক্তির পরীক্ষা দু—দুটো বছর ধরে চালিয়েছিল। দু বছর একসঙ্গে থেকেছে, বসেছে, উঠেছে, একসঙ্গে সাঁঝের আঁধারে মদ খেয়ে হৈ—হল্লা করেছে চটানে, আর রাতের পর রাত তাবিজের দৌলত পরীক্ষা করেছে গেরুর মা—র উপর।
শাগরেদ ডোমন সা বারান্দার এক কোণায় পড়ে থাকত। ওস্তাদের নিকা—করা বৌর কান্না শুনতে পেত মাঝরাতে। ভোরবেলায় ওস্তাদের বৌকে বলত, লিব নাকি কিছু? সে কাঠের বাক্সটা কাঁধে নেওয়ার সময় ডাগর দুটো চোখের দিকে চেয়ে বলত, ওস্তাদের সব ভুলভাল হয়ে যাবে। হামি লিব নাকি কিছু? আপ বুলিয়ে দিন। হামি ঠিক ওস্তাদকে স্মরণ করিয়ে দেবে। হামি লোক ঠিক আছে, আপনি বুলেন।
শাগরেদ ডোমন সা—ই তখন মোটঘাট বইত। চাদর বিছাত। জুড়িবুটিগুলো সাজিয়ে রাখত চাদরে। কোনোদিন সে তন্তর—মন্ত্রর শিখত কৈলাসের কাছে।
কৈলাস বলত, শিখে লে শালা! তোর ওস্তাদ হামি, হামার ওস্তাদ রসিদ। সব ওস্তাদের জয়—জয়কার দিয়ে বুলে ফ্যাল হেকিমি—দানবি দশ—পঁচিশ দফে বেইমান মানুষের কাজে লাগে। আওর এ দফে শুনে রাখ শালা, বেম্ম চণ্ডালের হাড় লাগবে। জীয়ন হাড় যাকে বলিস। সেই রাহুচণ্ডালের হাড় না হলে আর তুর চলছে না। গাছ—গাছালির গুণ, জুড়িবুটির জেরাসে কারবার। দুরোজের বাত আছে ও।
কৈলাসের তৃতীয় পক্ষের বৌ শুয়োরের খাটাল পার হয়ে তখন এক—কলসি জল রাখল উঠোনে। কিন্তু কৈলাস তখনও ঝিম মেরে সামনে শুয়েছিল। সে তার চটানের অতীত কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শেষ বয়সের বৌটার দিকে ভালো করে নজর দিয়ে দেখল। এ বৌটাও হয়তো এক রাতে চটানের কোনো মরদের সঙ্গে উধাও হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং ভালো এখন যদি ওর সব ক’টি দাঁত ভেঙে দেওয়া যায়। আর কিছু না হোক, চটানের উঠোনে সারাজীবন তবে পড়ে থেকে গরল তুলতে পারবে। চটান থেকে উধাও হবার ভয় থাকবে না।
কৈলাস উঠে দাঁড়াল। চালার বাইরে এসে খেঁকিয়ে উঠল। খুব জোরে চেঁচালে চোয়ালের লম্বা দাঁত দুটো বাইরে ঝুলতে থাকে। এখন দাঁত দুটো ঝুলছে। সে বলছে, পানি দিয়েই তুর কাম খালাস হল রে ডোমনী! আওর কুচ দিবিনে?
বৌ নাকের নথ দুলিয়ে ঘরে ঢুকল। বিড়বিড় করে কী সব বকল। কিছুক্ষণ পর একটা পিঁড়ি বের করে দিল বাইরে। পিঁড়িটার ওপর বসে কৈলাস স্নান করবে। পিঁড়ি বের করে নিচু গলায় গাল দিল, খেঁকিয়ে উঠছিস ক্যানে? দুদিন বাদ তো চটান খালাস করবি, খেঁকিয়ে উঠছিস ক্যানে?
সে মাথায় জল ঢালল শুধু। কোনো জবাব দিল না। কারণ, এখন যদি সে ফের জবাব দেয়, তবে বৌটার জেদ বাড়বে। নাচন—কোঁদন শুরু হবে। দয়া করে যদি নাচন—কোঁদন একবার এই তৃতীয় পক্ষের বৌর শুরু হয়, তবে সাধ্য কী সমস্ত দিনমানে সে এ নাচন—কোঁদন থামাতে পারে।
