হারুণ রসিদ ওর ওস্তাদ গুরু—মাচানে শুয়ে শুয়ে সে তার হেকিমি জীবনের কথা ভাবল। মানুষটা কালীর সাধনা করত—অদ্ভুত মানুষ। ভোরে ঠিক সূর্য ওঠার আগে তিনি গুহায় ঢুকতেন। গুহার মুখে পাথর চাপা দিয়ে রাখতেন এবং ভিতরে পড়ে ঘুমুতেন। সূর্য—অস্ত যাওয়ার পর পাথর ঠেলে বাইরে আসতেন এবং পাঁচ ওক্তের নামাজ পড়তেন। তখন সব সাগরেদরা আসতে শুরু করত পাহাড়ের ঢালু ধরে। ওরা এসে একে একে জমা হত। সেই জনহীন পাহাড়ঘেরা দরগার ময়দানে এ—চটানের মতো নাচন—কোঁদন হত তখন। ঝাড়ফুঁক, তন্ত্র—মন্ত্র জুড়িবুটির কারবার হত সেখানে। কোথায় শ্বেতশিমুলের ছাল মিলবে, দুই সতীনা গাছ পাওয়া যাবে, কোন গুহায় নীলবানরের মাথা মিলবে—সবকিছুর হদিস দিতেন ওস্তাদ গুরু হারুন রসিদ। আর কৈলাসকে বলতেন, রাহুচণ্ডালের হাড় না হলে কোনো কবচওবচে কাজ দেবে না। তুই তো ডোমের বাচ্চা রে মরদ, রাহুচণ্ডালের হাড় জোগাড় করতে কত আর সময়! জোগাড় কর—মা চণ্ডীর থানে স্পর্শ পাইয়ে দি হাড়টায়, গাছগাছালির নাম করে দিচ্ছি, সব মিলিয়ে পুন্নপদের মাদুলি দে, মহাশক্তি কবচ দে—পারিস তো মহাশক্তির কোমরবাণও দিবি।
কাছাড়ের সেই রসিদের দরগা, সেই পাহাড়ের দরগার ময়দান, সেই গুহার ভেতর মা চণ্ডীর থান, সেবাইত রসিদ, শাগরেদ মিঞাচাঁদ, বুনো ঠাকুর, হরিশ চণ্ডালে—সব এক এক করে ওর চোখের ওপর এসে ভাসতে থাকল। সে এক জীবন গেছে কৈলাসের। মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে গঞ্জের হাট করেছে, ব্যাখ্যা করেছে গুরুর দ্রব্যগুণের কথা, জুড়িবুটির কথা। তখন কত মন্ত্র—তন্ত্র করে ভূত—প্রেত ছাড়িয়েছে মানুষের শরীর থেকে। আঁধার রাতে হেঁটে কৈলাস তখন সওদা এনেছে কত। গুরুর পায়ের নীচে বসে মহাশক্তি কোমরবাণের ব্যাখ্যা শুনেছে মন দিয়ে। সে ব্যাখ্যা বসে বসে মুখস্থ করেছে। এবং সে তার হেকিমি জীবনে ওস্তাদের সেই কথাগুলো টেনে টেনে ভেঙে বলেছে—এ বারো প্রকারের তন্ত্র আছে। হাতে সরু একটা ছিপের মতো লাঠি থাকত তখন। গঞ্জের হাটে চাদরের ওপর বিছিয়ে রাখত বনরুইমাছের ছাল, হরিণের সিং হেমতাল কাঠ, গোঁড়ের বাঁশ, কালী ঝাপ, নরসিং ঝাপ, দুর্গা ঝাপ। তলায় রাখত কালনাগিনীর গাছ, শ্বেত—শিমুলের ফল, ময়রুন বিবির ফুল! ময়রুন বিবির ফুলের কাছে এসে ছিপের ডগাটা থামত। চোখ দুটো ওর টাটাত। চোখ দুটো রগড়ে বলত, এ ফুল আরব থেকে লিয়ে আসতে হয়। হজের মানুষ হজে যান, লিয়ে আসেন এ ফুল। প্রসূতির বাচ্চা হয় না, ব্যথাবেদনায় হুম হুম করছে, কথাবার্তা বেমালুম গণ্ডগোল, জল লেন, ময়রুন বিবিয়ে ডুবিয়ে দ্যান—সাদা জলটারে মিঠাই দিয়ে খাওয়ান, বিবি আপনার আসান পাবে জরুর। পোয়াতির বাচ্চা হতে জেরা সময় লেবে।
গঞ্জের হাটে এই সব হেকিমি ব্যাবসা করত কৈলাস। ওস্তাদ গুরুর জীয়নহাড়টা সঙ্গে নিত। সোয়া পাঁচ আনা দাম চাইত তাবিজের জন্য। তাবিজটা দেওয়ার আগে রাহুচণ্ডালের হাড়ে ঠেকিয়ে দিত। বলত লেন—পোয়াতির কোমরে বেঁইধে দ্যান।
কাছাড় দরগা থেকে পালিয়ে এসে একদা কোর্ট—কাছারিতে এই ব্যাবসাই করত কৈলাস। কোর্ট—কাছারির কোনো পুরানো অশ্বত্থের ছায়ায় সে দাঁড়াত। একটা চাদর বিছিয়ে রাখত নীচে। গাছগাছালিগুলো সারি সারি সাজানো থাকত। একটা হারিকেন থাকত। আর থাকত ডোমন সা। শাগরেদ ডোমন সা। সারাদিন চেঁচাত কৈলাস। মুখে থুথু উঠত থুথু ছিটাত চারপাশে এবং দরগার মতোই ব্যাখ্যা করত বিশল্যকরণী গাছের, দুই সতীনা গাছের। তখন কত লোক জমত চারপাশে। কোর্টের লোক, মামলা—মোকদ্দমায় হার—জিতের লোক। ওরা কৈলাসকে দেখত, কৈলাসের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা দেখত।
কোনো কোনো সময় ছিপের ডগা ছুঁইয়ে হাঁটু দুটো সামনে এনে কাঁপাত। সরু কোমরটা ভেঙে দিয়ে চোখে—মুখে অমানুষিক ভাব ফুটিয়ে তুলত। বলত, এ হল গিয়া কুম্ভীরের লিঙ্গ। তারপর খুদে খুদে দুটো চোখ নিয়ে সকলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকত। মানুষগুলোর মনে তন্ত্রের নেশা ধরানোর চেষ্টা করত, এবং যখন দেখত নেশা বেশ ধরে এসেছে তখন সে একঝলক হেসে বলত, এবার বেমাফিক দু—চারঠো কথা বলে লিব, নিজ দয়াগুণে বাবুলোকে মাপ করে লিবেন। এই যে ছোট সাদা তন্ত্র দেখলেন, মালোম লিশ্চয়ই আসছে—এ হল গিয়া কুম্ভীরের লিঙ্গ। এ চীজ বহুত লাখোটিয়া চীজ, বহুত দাম। যখন তখন পাবেন না, যেখানে সেখানে মিলবে না। বেনাতি মণিহারি দোকানে যান, কাম কারবার করেন, লেকিন চীজ আপকো নাহি মিলছে। হে আছে, লাখোটিয়া চীজ ভি আছে। লেকিন কাঁহা পাবেন, কাঁহা আছে? বড় বড় পুরানা কবরাজবাবু আছে, উসকা পাশ যান—পাবেন। দাম ভি বহুত আছে, দশ কুড়িতে ভরি হবে।
এ সময় একটু থামত কৈলাস। জোরে জোরে শ্বাস নিত, হাঁপের টানের মতো শব্দ উঠত গলায়। কৈলাস চাদরটার চারপাশে এক পাক হাঁটত। সরু ছিপটা হাতে থাকত—তখন চেঁচাত না, ছিপটার দুটো ডগা দু—হাতের মুঠোতে রেখে একটু বাঁকিয়ে সকলের চোখের সামনে তুলে ধরে বলত, দেখে লেন। বাবুলোগ! খুব ধীরে ধীরে বলত। পারলে ইশারায়। তারপর কৈলাশ পা তুলে নাচতে আরম্ভ করত। চাদরটার চারপাশে সে ঘুরপাক খেত হেঁটে হেঁটে—যেন নেচে নেচে সে হাঁটছে। ওর মুখের কথার সঙ্গে পা দুটোর মাত্রা ঠিক থাকত। সে বলত, আমার দেহ আপনার দেহ এ ছিপের লাখান। খাওয়ান—দাওয়ান বেশ আছে, কিন্তুক ঘুণে ধরলে বোঝবার জোটি লাই। কবে ঘুণে ধরল সেটি টের পাবেন না। তবে বাত আছে এক, ভাঙেন মচকান টের করতে পারবেন অন্দরে ঘুণ ঘুইসে গেছিল। বাবুভাই, আপনারা ফিটফাট থাকেন বাইরে, মাস্তানের মতো চলেন ফেরেন, টের পাওয়া যায় না অন্দরে ঘুণ আছে কি না আছে। তবে বিবির কাছে গেলে সব নজর আসে। তার লাগি বলি বাবু মহাশক্তি কোমরবাণ। সকলের চোখের সামনে কৈলাস তাবিজটা তুলে বলত, দাম মাত্র স পাঁচ আনা।
