পরদিন ভোরে সকলের দরজায় দরজায় বৌকে নিয়ে ঘুরল কৈলাস। নতুন নিকে—করা বৌকে সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। ঘাটোয়ারিবাবুর পায়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল এবং বলেছিল—চটানের মা—বাপ আছে। পেরণাম কর বাবুকে।
অফিসঘরের নিচে নেমে দেখল কৈলাস ডানদিকের চালাঘরটায় ঝাড়ো কতকগুলো বাঁশ নিয়ে ঢুকছে। দুখিয়ার ঘরে মংলি তোশক—লেপ থেকে টেনে টেনে তুলো বের করছে। কাটোয়া থেকে লোক আসার কথা। তোশক—লেপের তুলো, বালিশের তুলো, লোকটা মাথায় করে নিয়ে যাবে। নতুন লেপ হলে কাঁচা টাকায় বিক্রি। মংলি এখন যেন সেই লোকটার অপেক্ষাতেই আছে। কৈলাসকে দেখে মুখটা ফিরিয়ে নিল মংলি। তখন ঝাড়ো বলছে, কিরে কৈলাস, কিছু মিলল?
কৈলাস জবাব দিল না। জবাব দিতে ভালো লাগছে না। সারারাত জেগে শরীর দিচ্ছে না। ইচ্ছে হচ্ছে মাটির উপরই শুয়ে পড়তে। তবু সে যতটা পারল হেঁটে হেঁটে গেল। যাচ্ছে নিজের ঘরটার দিকে। পাশে শুয়োরের খাটাল। বাবুচাঁদ শুয়োর নিয়ে বের হয়ে পড়েছে। গোমানির ঘরে গোমানি উঠেছে। সে বসে বসে খিস্তি করছে। মাচানের নিচে বসে নসিবকে গাল দিচ্ছে। কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না। কৈলাসবাবুদের বাড়ির রেডিয়োর বাজনা শুনল। পাঁচিল টপকালেই বাবুদের পাড়া। সব কাক উড়ে গেছে বাবুদের পাড়ায়, শুধু দুটো কাক এখন চটানে পড়ে খুদ—কুঁড়ে খাচ্ছে। ঘাটের কাপড় শরীরে পেঁচিয়ে মংলি তখন ভাঙা আরশিতে রূপ দেখছিল আর কাক তাড়াচ্ছিল উঠোনে। কাটোয়া থেকে লোকটার আসার কথা। আরশিতে মুখ দেখার সময় লোকটার পুষ্ট গোঁফ সে আরশিতে দেখল। দুখিয়ার গোঁফ—দাড়িবিহীন মুখটা নেলির মুখকে কুঁচকে দিয়েছে। মাঝে মাঝে সেজন্য মংলি এ—চটান ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে চায়। লোকটা কী যেন ইশারা দেয়, আর মংলি তখন আরশিতে কেবল মুখ দেখে।
কৈলাস ঘরে ঢুকে দেখল বৌটা প্রায় উলঙ্গ। মেঝের ওপর বৌটা পড়ে ঘুমোচ্ছে। সে বৌটার পাশে দাঁড়াল। ঘরটার আনাচে—কানাচে চোখ বুলাল একবার। ঘরে সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। হাঁড়ির মুখে ঢাকনা নেই। হাঁড়িতে পান্তাভাত। মালসাটা নিচে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মাছিরা হাঁড়ির মুখে উড়ছে বসছে। এ—শীতেও ওরা ভনভন করছে। ঘরের চারিদিকটা কদর্য কুৎসিত হয়ে আছে। নোংরা কাঁথা—কাপড়গুলো মাটিতে পড়ে আছে; কিছু বৌর বুকের কাছে উঠে এসেছে। এমনকি পরনের কাপড়টা পর্যন্ত। এইসব দেখে পিঠে লাথি মারার শখ হল। দাঁত ভেঙে দেওয়ার ইচ্ছা কৈলাসের। সে গেরুর মা—র দাঁত ভেঙেছিল লাথি মেরে। এ বৌর দাঁত কোমর দুই—ই। তবে ঘাটোয়ারিবাবুর দরজায় হামলা করতে পারবে না। রসের জন্য দরজায় দরজায় ভিখ মাংতে হবে না। ঘরে পড়ে থেকে কেবল গোঙাবে। এবং পানি খেতে চাইবে সকলের কাছে।
এই পিঠে লাথি মারতে যতটুকু শক্তির দরকার, কৈলাসের এখন যেন তাও নেই। সে ডাকল, উঠ হারামি, উঠ। পা দিয়ে কৈলাস শরীরটাকে ঠেলতে থাকল। উঠলি না, উঠলি না তু! গোটারাত ঘাটোরিবাবুকে জ্বালিয়ে এখন ঘুম দিয়ে লিচ্ছিস! আচ্ছা মানুষের সাথ তু কারবার করতে গেলি! সরম আসে না তুর! মুখে তু হামার চুন দিলি!
কৈলাস ঘরের কোণায় ঠেস দিয়ে রাখল হাতের সড়কিটা! মদের ভাঁড়টা মাচানের নিচে রেখে দিল। হারিকেনটাও। মাচানে বসে সে বিড়ি ধরাল। বৌটা আড়মোড়া ভেঙে উঠছে। অপমানে ফেটে পড়ছে চোখ দুটো। গরল ওঠার আশঙ্কা! গরলে যেন এখুনি ফেটে পড়বে। কিন্তু কৈলাস শক্ত নজরে চাইতেই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে সে। সেজন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠল, অথচ কিছু বললে না। এক কোণায় সে সরে গিয়ে দাঁড়াল।
কৈলাস মাচানে দু ঠ্যাং ছড়িয়ে দিয়ে বলল, দু—ঘটি জল লিয়ে আয় লদী থেকে। হামি চান করে লিব।
মেটে কলসিটা কাঁকে নিয়ে বৌ ফের তাকাল কৈলাসের দিকে। চোখ দুটো দেখে এখন খুব নিরীহ মনে হচ্ছে। মায়া মাখানো মনে হচ্ছে। কে বলবে এ—চোখ দুটোই মাঝে মাঝে আগুন হয়ে ওঠে, সাপের মতো হয়ে ওঠে, কখন ছোবল মারবে কৈলাসকে! তখন কৈলাসকে পর্যন্ত চটান ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। অথচ সেই বৌ কথার জবাব না দিয়ে ঘাটে জল আনতে চলে গেল। এই সব দেখে কৈলাসের খুব মায়া হল বৌটার জন্য। সে ভাবল, ও ঠিকই করেছে। ওয়ার তো ল গুণ। ওয়ার কোন দোষ আছে? মহাশক্তি কোমরবাণ হিম্মত ওয়ার নেই। সে তার কবচের কথা ভাবল। সবই ধাপ্পাবাজী। কৈলাস কিছুকাল থেকে ওর কবচের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে এই ধরনের কথা বলতে শিখেছে। সে একটু কাত হয়ে শুলো। যতক্ষণ বৌটা ঘাট থেকে না ফিরছে, ততক্ষণ শুয়ে থাকা, ততক্ষণ এইসব ভেবে সুখী হওয়া যাক। অথবা জ্বালা থেকে আসান পাওয়ার জন্য যেন সে চোখ বুজল।
কৈলাসের ইচ্ছা নয় গেরু জানুক মহাশক্তি কবচবাণ, মহাশক্তি কোমরবাণ, পুন্নপদের মাদুলিতে কোনো দ্রব্যগুণ নেই। ইচ্ছা নয় এইসব মাদুলির ওপর গেরুর বিশ্বাস ভেঙে যাক। কারণ এ—চটান বড় বেইমান। সহজে সে দু মুঠো কাউকে খেতে দেয় না। কৈলাস মরে গেলে গেরুকেও দেবে না। গেরু না খেতে পেলে ফের চটানে ভুখা থাকতে শুরু করবে। গোমানির বিটির মতো এ—ঘর সে—ঘর করবে। তাই সে মড়ার হাড় খুঁজতে যাওয়ার সময় ওকে সঙ্গে নিয়েছে; দ্রব্যগুণের কথা বলেছে। বলেছে, এ—মাদুলি দেহে ধারণ করলে, পির—পরি, সাপখোপ, জীন—দৈত্য কিছুতে নাকাল করতে পারবে না। বলেছে, ডানপুকুসে টান মারতে পারবে না। কবচের প্রতি গেরুর বিশ্বাসকে অক্ষয় অমর করার জন্য, চটানে দ্বিতীয় পক্ষের বৌটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এমন অনেক মিথ্যা বলেছে, যা সে একদা ওস্তাদ গুরু হারুন রসিদের কাছ থেকে শিখে ভেবেছিল, দুনিয়ার ঈশ্বর যদি সত্যি হয় তবে আল্লার কসম খেয়ে সে বলতে পারে এ জুড়িবুটির মাদুলিও অক্ষয় সত্য। সেই অক্ষয় সত্যের ওপর নির্ভর করেই সে ফরাসডাঙার ঝুমঝুমখালিতে বসন্ত—কলেরার এবং যত বেওয়ারিশ মড়ার কঙ্কাল সংগ্রহ করে বেড়িয়েছে। কোনোদিন যদি আঁধার রাতে সে হেলে পড়ত ভয়ে, দুহাত উপরে তুলে, আকাশে বল্লম ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠত, ওস্তাদ হারুন রসিদের দোহাই! গেরুকেও বারবার সেই দোহাই দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে বলেছে। কারণ, কৈলাস জানে গেরুকে কঙ্কালের পয়সাতেই চটানে টিকে থাকতে হবে, চটানে বেঁচে থাকতে হবে।
