নেলি উত্তর করছে না। কোনো জবাব দিচ্ছে না। অথবা গেরুর দিকে একবার মুখ তুলে তাকাল না।
তখন ঝাড়ো ডোম ঘাটে এসে শ্মশানের বাঁশ সংগ্রহ করছে। গেরু হাতে বল্লম দুলিয়ে এখানে হেঁকড়, সেখানে হেঁকড় দিতে দিতে নেলির চারপাশটায় ঘুরছে। লখি, টুনুয়া ঘাটে নেমে এসেছে। ওরা মড়াটাকে উঁকি মেরে দেখছে। মড়ার তোশক—চাদর দেখছে। ওরা তারপর উঠে গেল! নেলিও উঠল। ওদের সঙ্গে সে—ও কাঠ বইবে। গেরু হাতে বল্লম দুলিয়ে এখানে হেঁকড় সেখানে হেঁকড় মারতে মারতে নেলির পিছু পিছু হাঁটছে। নেলির সঙ্গে সে—ও কাঠ বইবে। যে দু—চার পয়সা হবে—নেলিকে সবটা দিয়ে দেবে এমনও ভাবল গেরু। চটানে ওঠার আগে নেলির কানে কানে বলল, ভয়ডরকে জিতে লিচ্ছি। এই মুহূর্তে নেলিকে ফরাসডাঙায় ঘটনার কথা বলে নেলির যুগ্যি মরদ হওয়ার ইচ্ছা। নেলি শুনে যেন ভাবে—মরদ আছে বটে। মরদের মতো মরদ। কিন্তু নেলির বিষণ্ণ মুখ দেখে এবং দুদিনের অভুক্ত শরীরটার দিকে চেয়ে সে কিছু বলতে পারল না। ওরা দুজন চুপচাপ একসঙ্গে চটানে উঠে এল। ঘাটোয়ারিবাবুর অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। কখন বাবু ডাকবে, ওরে বাপ, আমার চোদ্দপুরুষের মনিব, গঙ্গাপুত্তুরের দল, একবার একটু ইদিকে আয়। মড়ার দায়টা আমার খালাস কর। ওরা সকলে অপেক্ষা করছে। বাবু ডাকবেন—ওরা যাবে। কাঠ মাপবে, কাঠ নিয়ে ঘাটে নামবে।
ঘাটোয়ারিবাবু এক সময় ডাকলেন, কৈ রে তোরা?
এই যে বাবু আমরা। নেলি জানালার নিচ থেকে উত্তর করল।
কে রে? নেলি!
জি বাবু।
কাল গহনা পেলি?
নেলি উত্তর করছে না।
ভেবেছিস আমি কিছু টের করতে পারি না।
নেলি তখনও কোনো উত্তর করল না।
এই মাগি, কথা বলছিস না কেন? গহনা পেলি?
নেলির ইচ্ছা হল সহসা চিৎকার করে ওঠে—না, না!
চালাঘর থেকে হারিকেন খুলে নিয়ে রাতে তাজা চিতায় পড়ে থাকলি। কিছু হল?
না বাবু, কিচ্ছু হয়নি।
ফের মিথ্যা কথা বলছিস?
না বাবু, কিচ্ছু হয়নি। গঙ্গা মায়ীকি কসম।
ঘাটের কাঠ বয়ে পেট ভরবে?
নেলি এবারেও কোনো জবাব দিল না।
ঘাটোয়ারিবাবু রেগে উঠলেন,—ভেবে রেখেছিস আজও চটানে উপোস দিবি? ও—সব হবে না। এ—চটানে ও—সব হবে না। জিয়াগঞ্জ চলে যেতে বলবি তোর বাপকে। সেখানে গিয়ে যত খুশি উপোস করগে। কেউ কিচ্ছু বলবে না। যাবি। কাল নির্ঘাত চলে যাবি।
নেলি জানালার নীচে দাঁড়িয়ে হাসল। ঘাটোয়ারিবাবু ফের কষ্ট পেতে শুরু করছেন। এবং এই উপযুক্ত সময় ভেবে সে বলল, বাবু……
বল।
বাবু, একটা টাকা ধার দিবি?
আমি তো একটা গাছ—ঝাড়া দিলেই পড়বে।
নেলি সাহস করে আর বলতে পারল না কিছু। যেখানে কাঠ মাপা হচ্ছে সেখানে চলে গেল। গেরুও নেলির সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বাবু ডাকলেন—তোর বাপ ফরাসডাঙা থেকে ফিরল?
জি ফিরেছে।
ওকে ডেকে দে। কথা আছে।
গেরু ডাকল, বাপ, তু আয়। তুকে ডাকছে বাপ।
দূর থেকে কৈলাস বলল, হামাকে কিছু বুলছেন বাবু?
জি হুজুর, আপনাকে কিছু বুলছি। ঘাটোয়ারিবাবু রাগে এখন বসে বসে হাত কচলাচ্ছেন। তিনি কৈলাসকে বড় বড় চোখে দেখছেন এখন।
জানালার পাশে এসে কৈলাস দাঁড়াল। রাত জেগে ওর চোখ দুটো লাল। চোখ দুটো খুব বসে গেছে। দাঁড়িয়ে থাকতে ওর কষ্ট হচ্ছে। জানালার ওপর যতটা পারল ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। বলল, বুলেন বাবু।
ভিতরে আর হারামজাদা, ভিতরে আয়।
ভিতরে গিয়ে কৈলাস একই কথা বলল, বুলেন বাবু।
বুলেন বাবু! ব্যঙ্গ করলেন তিনি। কী বলব রে বেটা ডোম! তোকে বলবটা কী শুনি? তোকে বললে ব্যবস্থা করতে পারবি? সামলাতে পারবি সব?
কী সামলাব বাবু?
বৌকে সামলাবি। বৌকে সাবধান করে দিবি। সাবধান না করিস তো পুলিশে খবর দেব।
এতক্ষণে কৈলাসের যেন হুঁশ হল। এতক্ষণ কৈলাস খুব ভাবনায় পড়ল। মুখটা ভয়ে খুব শুকিয়ে গেল।
কী হয়েছে মেহেরবানি করে বুলেন বাবু। না বুললে যে কিছুই বুঝতে লারছি।
পারবি, পারবি। সব পারবি। ঠেকায় পড়লে পারবি।
কৈলাস ঘাটোয়ারিবাবুর পা দুটো জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল। পুলিশকে ওর ভীষণ ভয়। ঘাটোয়ারিবাবু ইচ্ছে করলে যে—কোনো সময় ওকে জেলে ভরে দিতে পারেন। তাই সে কেনা গোলামের মতো বলল, আপনি কিছু করে লিবেন না বাবু! যা করে লিবেন এখানে করে লেন। পুলিশকে খবর দিবেন না বাবু! চটানের মা—বাপ তু আছে।
তোর বৌর জন্য রাতে ঘুমুতে পারিনি রে বেটা ডোম! গোটা রাত দরজায় এসে হামলা করেছে।
কৈলাস এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হল। জবাব দিল খুশি হয়ে—ওঃ, তার লাগি। তা দেব। এয়াকে সাবধান করে জরুর দেব। ও বেটি হারামি আছে বাবু। কথায় বুলে—পুরুষমানুষের ছ গুণ মেয়েমানুষের ল গুণ। বুড়া হাড়ে হামার আর রস নাই বাবু। শালী হামার কেবল রস চিবাতে চায় গ। পায় না তাই এখানে সেখানে ঢুঁড়ে বেড়ায়।
কিন্তু তিনি আর এক ধমক দিলে কৈলাস সুড়সুড় করে চটানে নেমে গেল। কৈলাসের এ—বৌ শেষ বয়সের। তৃতীয় পক্ষের। গেরুর মা নেই সে অনেক কাল। সে স্ত্রী দ্বিতীয় পক্ষের। কৈলাস তার হেকিমি জীবনে বৌটাকে তিন মাসের গেরুর সহ নিকা করেছিল। কিন্তু বড় দুর্ভাগ্য, দু—বছরও গেল না, বৌটা পালাল। তারপর অনেক কাল কেটেছে কৈলাসের। তখন স্ত্রী ছিল না, ঘর খালি ছিল। গেরু ছিল একা। পরের বাচ্চাটা নিজের বাচ্চার মতো হয়ে যাচ্ছে। সে বাচ্চাকে সে পুষে পুষে এতদিন বড় করেছে। এবং এ—বৌটা এসেছে কিছুদিন। ইদানীং কৈলাস জোগাড় করেছে। কোত্থেকে, কেমন করে জোগাড় করেছে চটানের মানুষগুলো তার খবর রাখে না। শুধু ওরা এক সন্ধ্যায় দেখেছে কৈলাস কাটোয়া গিয়েছে। তারপর আর এক সন্ধ্যায় দেখেছে, কৈলাস চটানে ফিরেছে। নেশায় বুঁদ হয়ে আছে মানুষটা। একটি মেয়ে ওকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে তুলল। কৈলাসের ঘরে ঢুকল মেয়েটা এবং শেষ পর্যন্ত সেই কৈলাসের বৌ হয়ে চটানে থেকে গেল।
