তা যাবি না, না যাস ভালো। তুকে হাম কিছু বুলবে না, তু ভি হামারে কিছু বুলবি না। বেশ দুজনে ভাব করে লিব। তুর সীমানায় তু, হামার সীমানায় হামি আছে, কোনো হামলা—মামলার কারবার নেই। লেকিন জায়দা বাত হবে তো হেকড় খাবি সড়কির। এই সব বলতে বলতে ক—কদম পিছনে সরে বসল। সে এই সব বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কিছুটা। সে ঘুমে ঢুলছে। তবু কবরের ওপর জেগে বসে থাকল। কবরের ওপর জেগে পাহারা দিচ্ছে। শেয়াল—খটাশের সঙ্গে টানাটানি করতে হবে মড়া নিয়ে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে তো সব গেল। তখন মড়ার সঙ্গে ওর পা ধরেও টানবে বনবাদাড়ের জানোয়ারগুলো। সেজন্য কেবল সে বকছে। বকে বকে জেগে থাকছে।
সে তার অতীত জীবনকে এখন মনে করতে পারছে আর তাকে কেন্দ্র করেই বকে চলেছে। সে বকল—ডিহিবড়া সাপের চেয়ালগা। সুন্দরবইনা বাঘ—বাবুরা বুলেন রুয়েল বেঙ্গল টাইগার, নীলবানরের মাথা, বুনমানুষের হাড়, কুলকুহলীর গাছ, মরদরাজের মূল—এ ছ—দফের রেণু মিলে কবচ দিলে তার নাম মহাশক্তি কবচবাণ। গুণ আছে বহুত পেকারের—যে আদমি বিছানা খারাপ করে, যার গিটা বাত আছে, আস্বপ্ন—কুস্বপ্ন দেখে, যার বাদী—দুশমন—শত্রু আছে—বাণ মারে, বন্ধন করে, তার লাগি এই কবচবাণ। বড় সামান্য দাম আছে—মাত্তর সওয়া পাঁচ আনা দাম। খুব বেশি দাম লয়, ঘাটে পথে, দোকানে দুশমনে কত পয়সা যায়—মাত্তর সওয়া পাঁচ আনা। এর শক্তি বাবু লোকদের সব আপদ—বিপদে আসান দেবে। কিন্তু তবু ঘুম পায় কৈলাসের। সড়কির ওপর ভর করে দাঁড়াল।
সে জঙ্গলের ভিতর শব্দ শুনতে পাচ্ছে আবার। জঙ্গলের ভিতর জানোয়ারগুলো ঝগড়া বাধিয়েছে। কৈলাস পোড়ো বাড়িটার দিকে পা বাড়াল। হাতের ওপর বল্লমটা উঁচু করে বলল, খবরদার! মুর্দার পানে তুগো এমন খটাশের মতো নজর ক্যান? যা ভাগ, জঙ্গলের ছা জঙ্গলে পালা।
কৈলাস এ—সময় শুনল কারা যেন ছুটে গিয়ে পোড়োবাড়িটাতে উঠেছে। কারা যেন ছুটে গিয়ে পোড়োবাড়িটার চারপাশে নৃত্য আরম্ভ করেছে। এইসব শুনে এবং ভেবে কৈলাস খুব অসহায় ভেবেছে নিজেকে। এইসব শব্দ এবং চিৎকার যেন সে প্রথম শুনছে। অথচ কৈলাসের এমন হয় না। কৈলাস তো কোনোদিন এমনভাবে ভেঙে পড়েনি। সে এই ফরাসডাঙায় একা এসেছে, এক মুর্দা পাহারা দিয়েছে, জল ঢেলেছে এবং একা লাশটার বত্রিশটা দাঁত গুনে গুনে কঙ্কালের সঙ্গে গামছায় তুলে বেঁধেছে, অথচ সে ওর কবচওবচের জন্য, দ্রব্যগুণের জন্য এইসব পির—পরিদের এতটুকু পাত্তা দেয়নি। ওরা পোড়োবাড়িটাতে একবার হাসলে সে হাসত দুবার। সে ওদের ব্যঙ্গ করত। বিদ্রুপ করত। সেই কৈলাস এখন ডাকছে—গেরু ঘুমিয়ে গেলি?
ঘুমে অবশ গেরু কোনোরকমে উত্তর করল, হামারে ডাকছিস বাপ?
শুনে লে তো কারা যেন হাসি—মস্করা করছে।
কৈ শুনতে লারছি। কেবল তো শিয়াল ডাকছে।
থাক, তু ঘুম যা। শালা কানটাই হামার কম শোনে।
খুঁজে খুঁজে এক সময় বল্লমটা তুলে আনল পাশের জঙ্গল থেকে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল কবরটার পাশে। কোনো আওয়াজ শুনেই সে আর উঠল না। সে আর উঠবে না, যতক্ষণ না ভোর হয়, যতক্ষণ না জানোয়ারগুলি ফের হামলা করতে আসে। সে বসে থাকল এবং বসে বসেই চিৎকার করল, হে—ই—উ, হে—ই—উ। কবরটায় বল্লমটা দিয়ে জোরে জোরে বাড়ি মারল। ভয়ে জানোয়ারগুলো এদিকে আর আসছে না।
শেষরাতের দিকে উঠে গেরুকে ডেকে বলল, তু এবার উঠে বস। হামি পানি লিয়ে আসি ক হাঁড়ি। পানি ঢালতে হবে কবরে।
ক হাঁড়ি জল এনে কবরে ঢালল কৈলাস। জলে মাটিটা এবং মাটির নীচে লাশটাকে পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল। জল পেয়ে এবার লাশটা জলদি ফুলে ফেঁপে উঠবে। যত জলদি ফুলে ফেঁপে উঠবে, তত জলদি সে কঙ্কালটা ঘরে নিয়ে তুলতে পারবে। সে জল ঢেলে বলল, এবার হামি ঘুম যাই, তু জেগে পাহারায় থাক।
গেরুকে পাহারা রাখার সময় কৈলাস স্মরণ করিয়ে দিল, দুনিয়ার ভয়—বিস্ময়ের কিছু নাই। —তু তো রাজা রে, রাজার বেটা রাজা। কেউ তুর সঙ্গে বাদী দুশমনি করতে লারবে। তুর বাপ তুকে তিনটে কবচ দিল কত তন্ত্র করে। এ মন্ত্রের কারবার লয়। এ গাছ—গাছালির গুণ জুড়িবুটির কারবার। আমি মরলে তুকে একলা ফরাসডাঙায় আসতে হবে, তখন তু কেবল তিনটে কবচের স্মরণ লিবি। ভয়—বিস্ময় তুর কিছু থাকতে লারবে।
কৈলাস কয়েকটা ডাল কেটে এনে কবরটা ভালো করে ঢেকে দিল। শেয়াল—খটাশের দুশমনি থেকে দিনের আলোয় কবরটাকে রক্ষা করল।
কৈলাস এক সময় রাস্তায় বলল গেরুকে, কী রে ভয় ধরেছিল রাতে?
গেরু ভোরের দুনিয়ার রঙ মেখে বলল, না, ডরে ধরেনি। ওরা দুজন তখন চটানের দিকে যাচ্ছে।
শীতের উত্তুরে হাওয়া আজ আর নেই। তাজা চিতাটার পাশে একদল লোক একটা মড়া নিয়ে অপেক্ষা করছে। ঘন কুয়াশার ভিতর ওদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুখিয়া। ঘাটোয়ারিবাবু গঙ্গায় স্নান সেরে জপতপ করতে করতে ফিরছেন। কতকগুলো কুকুর চালাঘরটার পাশে পড়ে থেকে রোদের উত্তাপ নিচ্ছে। অন্য পারে যুবতী মেয়েরা ঘাটে কাপড় কাচছে, কাপড়—কাচার শব্দ ওপারে ঠুকঠুক করে প্রতিশব্দ তুলছে। দূরে শীতের গঙ্গায় পুল উঠছে। ওপারে ট্রেনের শব্দ। রিকশার ভিড়। যাত্রীরা সব নেমে আসছে। সেসময় গেরু অনর্থক বল্লমটা চালাঘরটায় ছুঁড়ে দিল। কুকুরগুলো ভয়ে চিৎকার করে উঠল। ওরা ভয়ে ছুটছে বল্লমের তাড়া খেয়ে। ওরা নদীর পাড় ধরে ছুটল। অথচ বেশিদূর যেতে পারছে না। তখন গেরু দেখল কিছু দূরে কুকুরগুলো যে—পথ ধরে উঠে গেল—সেখানে নেলি চুপচাপ বসে আছে। নেলির কাছে গিয়ে বলল গেরু, দেব শালা কুকুরকে আর একটা হেঁকড়।
