প্রায় বেশি রাতটুকু পাহারা দেবে কৈলাস। শেষরাতে গেরু। বন—কাঁঠালের শেকড়ের মাথাটা এলিয়ে দিল গেরু। ঘুমোতে চাইল। জোনাকিরা জ্বলছে। মশার কামড়ে ঘুম আসছে না। পাশে কবরটা। মেয়েমানুষটা সেখানে পচছে। মুখটা মনে পড়ছে গেরুর। যত মনে পড়ছে তত বিরক্তি বাড়ছে ওর? এককালে মেয়েমানুষটা বেঁচে ছিল। এককালে নেলির মতো হয়তো বা খুবসুরত ছিল। সব ছিল, সব ছিল মেয়েটার। নেলির মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলত, কাপড় খসে পড়ত বুক থেকে—পাড়া—পড়শীরা দেখত ঢিকঢিক করে। যেমন করে রামকান্ত নেলিকে দেখে বেড়াচ্ছে।
গেরু চটানের কথা ভাবল বনকাঁঠালের শেকড়ে মাথা রেখে। ঘাটোয়ারিবাবুর কথা মনে হল। সেই যে কবে কালো বার্নিশ চেয়ারে বসেছেন, আজও বসে আছেন। মড়ার হিসাব রাখছেন কেবল—রসিদ দিচ্ছেন মরা মানুষের। দুখিয়া আর ওর বৌ চিরদিন ঘাটের ডাক নিয়ে কেবল মারধোর করেই গেল।
বে—ইজ্জতি লোক রামকান্ত। বড় বে—সরম। সুদে টাকা দেয় চটানে। বদলে সে চটান থেকে সুদ সহ অনেক কিছু নেয়। সে ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করছে চটানের। সর্দার একবার চোখ খুলে পর্যন্ত দেখে না। সর্দার পর্যন্ত বে—এক্তিয়ার হয়ে পড়ল। একমাত্র নেলিকেই বুঝি এতদিন পাহারা দিয়ে সে ঠিক রাখতে পেরেছে। এ—ব্যাপারে গোমানি খুব হুঁশিয়ার—কিন্তু লোকটা মদ গিলে যেভাবে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকে, আর—ঘরে খাবার না রেখে রেখে মেয়েটার ওপর যে অত্যাচার করে, তাতে মনে হয় নেলিকেও বুঝি চটানের বে—ইজ্জতি জীবনটা ধীরে ধীরে নিচে টানবে।
গেরু ভালো করে চোখ বুজল। ঘুমনোর জন্য চোখ বুজল। কবরের নিচে মেয়েমানুষটার মতো শক্ত হয়ে শুলো না, একটু ঘাড় কাত করে, কিছুটা ডানপাশ হয়ে শুতে চাইল। কিন্তু সেই চোখে নেলি কেবল উঁকি মারছে। নেলির মাচান, ওর ভাঙা ঘর, এ শয়তানের রাজত্বে ওকে বিব্রত করে মারছে।
কৈলাসও শুয়ে আছে। গোসাপের মতো হাত—পায়ের ওপর ভর করে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে গোসাপের মতো মাথাটাকে একবার পূর্ব, একবার পশ্চিম করছে। মাঝে মাঝে পচাই ঢেলে পচাই খাচ্ছে। কতকগুলো রাতের পোকা উড়ছে ওর মুখের চারধারে। ভাঁড় থেকে কিছু পচাই গড়িয়ে কবর ভিজছে। কৈলাস ভাবল মাটির নিচে মেয়েটার পচাই খেতে শখ জাগছে, সেজন্য এক গেলাস মদ মাটির ওপর ঢেলে দিল। এবং এক সময় যখন বুঝতে পারল শরীরটা মদের নেশায় খুবই টলছে, খুবই অসহায় হয়ে উঠেছে তখন বল্লমটা সে আরও শক্ত করে ধরল। দু আঙুলে একটা চোখ ফাঁক করে রেখে জেগে থাকার চেষ্টা করল, জেগে থেকে শেয়াল—খটাশ পাহারা দিল।
রাত যত বাড়ছে, হারিকেনের আলো তত কমে আসছে। শেষ পর্যন্ত হারিকেনটা নিভে গেল। অন্ধকারে কৈলাস চোখ পরিষ্কার করল। চোখ মুখ ঘষল। অন্ধকারকে ভালো করে দেখার ইচ্ছা। এবং শয়তানের রাজত্বে এই অন্ধকারটাকেই কৈলাসের যত অবিশ্বাস। বাধ্য হয়েই চোখ দুটো এ সময় যেন স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। অন্ধকারে সে ঠিক চিনতে পারে—কোন ঝোপে কোনো শেয়াল উঁকি মেরে আছে।
কিছু দূরে কৈলাস কোনো জন্তুর আওয়াজ শুনতে পেল। গোসাপের মতো শরীরটাকে তুলে দিল কৈলাস। কিছু দূরে পাতা খস—খস করছে। গোসাপের মতো শরীরটা টেনে চলতে চাইল সে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে কীসের আওয়াজ, কোনদিক থেকে আওয়াজটা আসছে, কতদূর পর্যন্ত যাবে।
আওয়াজটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। বনবেড়ালটা শুকনো পাতার ওপর পা ফেলে ক্রমশ কবরটার দিকে এগিয়ে আসছে। ঝোপের আড়ালে কৈলাসের চোখ দুটো জ্বলছে। বল্লমটা হাতে শক্ত হয়ে উঠছে। সে বল্লম টেনে বলল আ যাও মিঞা, আ যাও। আ যাও বেটা, খুশিসে আ যাও। তুমকো হাম তো পিয়ার করেঙ্গে দোস্ত, জরুর করেঙ্গে। তারপর একসময় বল্লমটা ছুঁড়ে দিয়ে খিস্তি করল—শালাসকল! কৈলাস জন্মেছে ডোমের চটানে, তুই বেটা বনবাদাড়ে—তফাত কত বুঝলি না! আঁধার রাতে চুপি—চুপি হাতসাফাই চালাতে এলি!
মাটির বুক হেঁচড়ে দু কদম সামনে এগিয়ে গেল কৈলাস। বলল, সামনের ঝোপটাকে উদ্দেশ করে, হে রে বেটা থামলি কেনে? কৈলাসকে ডরে ধরেছে? ও কিছু লয়, কিছু লয়। ওয়ার বুড়ো জান, লুট করে পড়লে খুট করে মরবে। ওয়ার ডর কীসের! আ যাও মিঞা!
এই সব বলতে বলতে নেশার ঘোরে কিছুক্ষণ কাঁদল কৈলাস। চটানের যত শোকের কথা মনে করে সে কাঁদতে থাকল। আবার নেশার ঘোরে সে খিলখিল করে হাসল। তখন চটানের যত সুখের কথা ওর মনে হল। জঙ্গলের জানোয়ারগুলো তখন পোড়োবাড়িটার পাঁচিল ঘেঁষে শিমুল গাছটার নিচে এসে থেমে গেছে। কৈলাস যতই শোক করুক কিংবা আনন্দ করুক, ওর চোখ সেখানে। সেজন্য অনেকগুলো চোখ শয়তানের রাজত্বে চারপাশে জ্বলছে।
হাঁটুর ওপর হামাগুড়ি দিয়ে সে সামনের ঝোপটায় ঢুকে পড়ল। সে বল্লমটা খুঁজছে। বল্লমটা খুঁজতে গিয়ে সে ঝোপের আরও ভিতরে ঢুকে গেল। সে অনেকক্ষণ খুঁজে, হাতড়িয়ে বল্লমটা বের করল। তারপর শিমুলের নীচে সেই সব চোখকে উদ্দেশ করে বলতে থাকল, রাজাবালা পাহাড়ে রাত কাটালাম, মুনমুন কাঠের লাগি ঘুরে মরেছি গারো পাহাড়ে, তুলোর পাহাড় দেখে লিয়েছি শ্বেত—শিমুলের গাছ, আর তু হামারে কী ভয় দেখাবি রে বেটা! লক্ষ্মীর মতো চুপ চুপ চলে যা। সরমকী বাত কী আছে এতে? গেরু কী দেখতে পেল—না তুদের দশটা জাতভাই দেখে ফেলেছে?
