কৈলাস গেরুকে কবরের পাশে বসিয়ে বলল, এ কাম করে খেতে পারলে চটানে তুকে ভুখা থাকতে হবে না। জগুবাজারের হিল্টন কোম্পানির বাবু থাকলেন, আর থাকল মুর্দার হদিস। এমনকি বাপ তুর মর যায় তো বাপের কঙ্কাল ভি বিচতে পারবি। বিচে পয়সা কামাতে পারবি।
কোমর থেকে পুঁটুলি খুলে কবরের পাশে রাখল কৈলাস। মদ খাওয়ার ছোট ভাঁড়টা পাশে রাখল। মুখ ঘুরিয়ে গেরুকে দেখে নিজের চোখ দুটোকে ফের টান টান করল।
গেরু মদের ভাঁড়টা বাপের কাছে এগিয়ে দিল। কৈলাস দু গেলাস মদ ঢেলে দিল। প্রথমে নিজে খেল, পরে গেরুকে এক গেলাস মদ ঢেলে দিল। পুঁটলিটা খুলে কিছু চালভাজা খেল, কিছু কাঁচা পেঁয়াজের কুচি, কিছু কাঁচা লংকার কুচি খেল। ফের মদ খেল। মদ খেয়ে শরীরে রস জমাতে চাইল। শরীরে আসক আনতে চাইল মুর্দা পাহারা দেওয়ার জন্য। দুহাতের ওপর শরীরে ভর দিয়ে কৈলাস বলল, খুদে দেখবি লাকি রে তু, লাশটার বত্তিশটা দাঁত থাকল কী থাকল না। খুদে একবার দেখলে চলত।
কৈলাস বল্লমটা হাতে নিয়ে তিনবার পাক খেল কবরটার চারপাশে। সে মড়াটাকে মন্তর—তন্তর দিয়ে বাঁধল। মড়াটার ভিতর আর শয়তান ঢুকতে পারবে না। সে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে থাকল এবং থুতু ছিটাতে থাকল কবরটার ওপর। শেষে নিজের বুকের ওপর একদলা থুতু দিয়ে বুকটা মালিশ করে দিল। গেরুর মুখেও মালিশ দিয়ে সে বল্লমটা নিয়ে মাটিতে খুঁড়তে বসল। কবর খুঁড়ে মড়ার মুখ দেখার ইচ্ছে। মড়ার বত্রিশটা দাঁত দেখার ইচ্ছে!
এই আঁধারে, ঝোপ—জঙ্গলের নিঃসঙ্গতায়, হারিকেনের অস্বচ্ছ আলোয় কৈলাসকে পৃথিবীর মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। বাপের শয়তানের মস্ত মুখটা দেখে গেরুর ফের ভয় ধরেছে। শয়তানটা মড়ার ওপর ভর না করে বাপের ওপর যেন ভর করেছে। কিংবা এতক্ষণ তন্ত্র—মন্ত্র পড়ে শয়তানকে নিজের কাঁধেই ভর করিয়েছে যেন।
গেরুর এ সময় ইচ্ছে ঝোপ—জঙ্গল ভেঙে চটানের দিকে ছুটতে। ইচ্ছে হচ্ছে বাপকে একা ফেলে অন্য কোথাও চলে যায়। সে এতদিন শুনে শুনে ভেবেছিল খুব সহজ, ভেবেছিল বাপের মতো সে—ও মরদের বাচ্চা, তখন ভয় থাকার কথা নয়। কিন্তু এইসব দেখে ওর মনে হল, শয়তানের রাজত্বে চলে এসেছে! বাপ এখানে শয়তানের বান্দা সেজেছে। যেন বাপ ষড়যন্ত্র করে ওকেও খুন করতে এনেছে এ জঙ্গলে। সে উঠে ছুটতে যাবে এমন সময় দেখল কৈলাস পিছন থেকে ওকে ধরে রেখেছে। —ভয় না পাস বাপ, ভয় না মান। কৈলাস গেরুকে টেনে বসাল। গেরু বাপের হাতে কলে—পড়া ইঁদুরের মতো হয়ে বাপের পাশে বসে পড়ল।
কবরের ওপর মাটির ডেলা ডেলা চাঙড়। সুতরাং আপাতত সেগুলো না খুঁড়লেও চলে। গেরু একটা একটা করে মাটির ডেলা তুলতে থাকল। কৈলাসের ধমকে গেরুর হুঁশ হল। —হে রে বেটা, বুকের মাটি ফেলছিস ক্যানে? তু কী লাশটার বুক দেখবি?
অনেকক্ষণ পর কৈলাস হাত দুই নীচে মড়ার মাথাটা পেল। কৈলাস নীচে হাত বাড়িয়ে দিল। এবং বলল, শালার সময় অসময় লাইক! ঢুকুস—ঢুকুস কেবল মদ গিলছে।
ঘাড় কাত করে গেরু জবাব দিল, খবরদার বাপ, তু হামারে শালা শালা বুলবি না। সড়কির ঘায় তর পেট ফুঁসে দেব।
অন্য সময় হলে দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে যেত—কিন্তু এখন কৈলাসের সে সব হচ্ছে না। এখন কৈলাসের দক্ষযজ্ঞ করার মতো ফুরসত কম—হে রে বেটা দেখ, আলোটা লিয়ে এসে দেখ, মানুষটা মেয়েমানুষ রে! লাকে ওয়ার লাকছাঁবি আছে।
গর্তের ভিতর কৈলাসের হাতটা তখনও ঢোকানোই আছে। তখনও কৈলাস আন্দাজে ভারী ভারী ঠোঁটের ভিতর দাঁত গুণছে। দাঁত বত্রিশটা থাকল কী থাকল না দেখছে। যখন দেখল বত্রিশটা দাঁতই আছে তখন খুশি খুশি হয়ে বলল, দাঁতগুলো সবই ঠিক আছে রে বেটা।
কৈলাস হাতটা তুলে আনলে গেরু হারিকেনের আলো গর্তের ভিতর নামিয়ে দিল। অনেকক্ষণ ধরে মড়াটা দেখল। দেখে গম্ভীর হয়ে গেল। মেয়েমানুষটার মুখে মাটি পড়ে ঠোঁট দুটোর রঙ ধূসর। ঠোঁটগুলো পটলের মতো ফুলে উঠেছে। ডাইনে নাকটা ঝুলে আছে। চোখ দুটো ফেটে গেছে। দাঁতগুলো অত্যন্ত উঁচু উঁচু দেখাচ্ছে। যেন জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে আছে মেয়েমানুষটা। গেরু ভয়ে শেষ পর্যন্ত মুখটা তুলে আনলে। সেই সঙ্গে একটা মুখের রঙও উঠে এল। সে মুখ নেলির। গেরুর ভয়ানক কষ্ট হতে থাকল।
মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে গেরুর। ওর ভালো লাগছে না, ভালো লাগছে না এসব। বাপ দু হাতের ওপর ভর দিয়ে দুলছে তো দুলছেই। একটা রাতের পোকা কৈলাসের ঠোঁট বেয়ে ক্রমশ ওপরে উঠছে। সে মুখের ওপর হাত লপটাচ্ছে অথচ পোকাটাকে ধরতে পারছে না। পোকাটা ছুটছে। কৈলাসের হাত কাঁপছে। সে তবু ধরতে পারল না। পোকাটা কানের পাশ দিয়ে পিঠে নেমে যাচ্ছে। সে এবার উঠে দাঁড়াল। ধেইধেই করে ঘুরপাক খাচ্ছে। পিঠের পোকা তাড়াতে চাইছে। তখন চোখের ওপর আকাশের তারাগুলো নাচছে মনে হল অথবা নাচের আগে তাল ঠুকছে মনে হল। নেশায় বুঁদ হয়ে বললে, হে রে, অমন না হলে তেমন হয়। বঙ্গালী বাবুরা কেমন কথা বুলে দেখতে লারিস? তবে হা, মেয়েমানুষটা কম বয়সের হলে কেমন হত রে গেরু বেটা শালা হামার! কৈলাস এই সব বলে উপুড় হয়ে পড়ল কবরটার ওপর। দুহাতে পাশের মাটিগুলো টেনে কবরের মুখটা ভরে দিয়ে চালভাজার পুঁটলিটা টেনে নিল। হাঁফ ছাড়ল আবার। হাঁফের টান তুলল আগের মতো। এবং কিছুক্ষণ দু ঠ্যাঙের ভিতর মুখ গুঁজে পড়ে থেকে বললে, খা, খেয়ে লে। খেয়ে খেয়ে পেট ভার কর শালা। জেরাসে ঘুমিয়ে লে। তুর বাপ কৈলাস পাহারায় থাক।
