রেল—সীমানার শেষে আকাশ, চাঁদ এবং গ্রহ—নক্ষত্রের ছবিটা সহসা ভালো লাগল গেরুর। বুঝি নেলির মুখ মনে পড়ল। নেলির মুখটা দেখতে দেখতে পাঁশুটে হয়ে গেল। মরা মানুষের মুখের রঙের মতো। সুতরাং গোমানির মেয়েটাও মরবে একদিন। তখন পুঁতে পচাবে কী ঘাটের আগুন জ্বালাবে, আজ যেন ঠিক করতে পারছে না। মেয়েটা হয়তো বাপের সঙ্গে এখন মাচানে ঘুমাচ্ছে। অথবা ভাঙা চালের ফাঁকে আকাশ দেখছে। নেলির এ সময় এ মুখ বড় অদ্ভুত। ভয়ানক বিস্ময়ের। গেরুর মনে এ—সময় সুখ জাগে। নেলিকে নিয়ে ঘাটের আঁধারে নামার শখ হয় তখন। বেয়াড়া রকমের একটা ইচ্ছা ওকে কেবল তাড়না করে মারে।
কৈলাস তখন হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। সে শুনল—সে শুনতে পাচ্ছে। শেয়াল—খটাশের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে। ওরা কোথাও যেন মড়ার শরীরটা চুষে খাওয়ার জন্য নিজেরা ফাটাফাটি করছে। কৈলাস ছুটল। সে পাগলের মতো ছুটছে। ওর ভয়ে দুটো শেয়াল ঝোপ থেকে অন্য ঝোপে চলে গেল। গেরু বাপের পিছনে ধাওয়া করছে। কিন্তু খালে নামতে গিয়ে গেরু আর নামতে পারছে না। কারা যেন ওর আশেপাশে গোঙাচ্ছে। কারা যেন ওর আশেপাশে ফিসফিস করে কথা বলছে। শেঠদের ভাঙা পাঁচিলের ওপাশে কারা যেন দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অথবা দূরে ভাঙা কুঠিবাড়িতে কেউ গলা টিপে মানুষ হত্যা করছে। গেরুর চুলগুলো ভয়ে শক্ত হয়ে গেল। সে থামল। সে দাঁড়াল। সে চলতে পারছে না। আর সেই দেখে কৈলাস খিস্তি করল, হ্যাঁ রে বেটা, তুরে তো হাম বহুত দফে বলিয়েছে, জীনপুরী, সাপখোপ, ভূত—পেঁত কেহো তুর গা ছুঁতে লারবে। তুর দেহবন্ধন করে দিছি যোগ। তারপর কাছে গিয়ে ওর শরীর ঝাঁকিয়ে বলল, ওগুলো মানুষের ডাক লয়, ভূত হয়, ওগুলো পেঁচার, শেয়াল—খটাশের জাত। তু হেঁটে আয়। জলদি আয়।
গেরু কিছু বললে না। বাপ যেন ওর ওপর তন্তর—মন্তর করল। বাপ যেন ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে যেতে থাকল। হারিকেনের ফ্যাকাশে আলোতে শেঠদের ভাঙা পাঁচিল, ভাঙা কুঠি সব এখান থেকে সে দেখতে পাচ্ছে। সে ভয়ে ভয়ে কৈলাসকে বলল লক্ষ্মীপেঁচা না কালপেঁচা বাপ?
হবে একটা। তু চল। পথ চল। শেষে কী ভেবে সে নিজেই হারিকেনটা নিয়ে ছুটতে থাকল এবং বলতে থাকল, গেরু ছুটে আয় বাপ, জলদি আয়। জলদি পা চালা। সর্বনাশ করে লিল রে, সর্বনাশ করে লিল। —শালারা! ভয়ে গেরুর হাত থেকে বল্লমটা খসে পড়ল। কোনোরকমে গোঙাতে গোঙাতে সে বলল, কী হল রে বাপ! কিছু দেখে লিলি রে? জীনপরী, সাপখোপ কিছু? হায়, হায়, কিছু দেখে লিলি রে? কিন্তু কৈলাসকে দূরে চলে যেতে দেখে ওর ভয় আরও বাড়ল। বাপের কোনো জবাব না পেয়ে ওর পা দুটো যেন খালের কাদায় ডুবে যাচ্ছে। সে যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলল, বাপ, হামার পা চলতে লারছে।
না চলুক। মর শালা। বেটা কেবল ভয়ে মরে গ। কৈলাস এই সব কথা বলতে বলতে পোড়োবাড়িটার দিকে ছুটছে। হাতে ওর হারিকেনটা তেমনি দুলচে। মদের ভাঁড়াটা টলছে। বল্লমটা ঢেউ খেলিয়ে চলছে বাতাসের ভেতর। একটা ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, হে—রে, শুনতে লারছিল, শেয়াল—খটাশগুলো বনকাঁঠালের ঝোপে কেমন দুশমনি করছে। লিশ্চয় মানুষটাকে ওখানে পুঁতল। তু আয়, পা চালিয়ে আয়, লয়তো শেয়াল—খটাশ ভাগ বসাবে।
শেয়াল—খটাশ ভাগ বসাব এ ঠিক নয় গেরু বোঝে। আর এও বুঝতে শিখেছে কঙ্কালটা ঘরে অক্ষত নিতে পারলে দাম ওর অনেক হবে। সে তাই মাটি থেকে বল্লমটা কুড়িয়ে পোড়োবাড়িটার দিকে ছুটছে। খালের মাটি ওর আর পা টেনে ধরছে না। সে পোড়োবাড়ির পাঁচিল ঘেঁষে চলছে। জাফরিকাটা সব বন—লতার জঙ্গল ডিঙিয়ে কৈলাসকে অনুসরণ করছে। কিন্তু পোড়োবাড়িটার কাছে আসতেই এবং কবরের নিচে মরা মানুষটার ছবি ভাবতেই শরীরটা শিউরে উঠল। মাথার চুলগুলো শজারু—কাঁটার মতো আকাশমুখো হয়ে দাঁড়াল। ভয়ে বিস্ময়ে হাতের বল্লমটা বাতাসে উঁচিয়ে চিৎকার করে বাপের মতো বলে উঠল, ওস্তাদ গুরুর দোহাই! এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে হল সব ভয়টা ওর কেটে গেছে। সে এই জঙ্গলের মানুষ হয়ে গেছে। অথবা মড়া খোঁজার মানুষ হয়ে গেছে। সে নির্ভয় হতে পেরে বলে উঠল, বাপ হাম তো তুর মতো হ গেলাম। কোনো ভয়—ডর আওর না থাকল।
শেয়াল—খটাশগুলো মানুষের শব্দ পেয়ে সরে গেছে। এইবার গেরু আর কৈলাস কবরের ঝুরঝুরে মাটির বুকে উপুড় হয়ে পড়ল এবং অনেকগুলো আঁচড় দেখল। শেয়াল—খটাশের এইমাত্র দুশমনি করে সরে যাওয়ার চিহ্ন দেখল। আর কিছু সময় মাটি সরাতে পারলে মরা মানুষটার দুটো পা উপরে উঠে আসতে পারত। তার আগেই চটানের মানুষ হাজির। কৈলাস লোভে পড়ে গিয়ে বলল, মাটি তুলে দেখবি নাকি রে তু, লাশটার বত্তিশটা দাঁত থাকল কী থাকল না। খুঁড়ে একবার দেখলে হয়।
বনকাঁঠালের ঝোপে দাঁড়িয়ে সুখী কৈলাস হিহি করে হেসে ছিল। হাসবার সময় দুটো দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ঝরল। সে ঢুলতে ঢুলতে বলল, শেয়াল—খটাশ লাগাল পেল না রে মড়াটার। মড়ার খবর ওরা জানতি না জানতি হামি তু দো শেয়াল হাজির হ গেলাম। সে হাসতে হাসতে কথাগুলো বলল। যখন সে কথা বন্ধ করল তখন শুনল গেরু, পোড়োবাড়িতেও কারা যেন কৈলাসের মতো হিহি করে হাসছে। হেসে তামাশা করছে ওদের সঙ্গে। কৈলাস ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গেরুকে বুকের কাছে টেনে আনল। এবং বলল, ডর কীসের রে বাপ! তু আর হামি আছে, বাপ—বেটে আছে, তবে আর ডর কীসের? ভূত—পেঁত, পির—পরির নজর, মড়ার হজমি সব আছে তোর বাপের কাছে। তারপর গেরুকে আরও বুকের কাছে চেপে বলল, তুর কোনো ডর থাকার কথা লয়।
