কৈলাস ধমকে উঠল, লারছি, লারছি। লারছি তো তুর বাপ এত পথ চলিছে কী করে! রোজল জঙ্গলে গিল কী করে?
গেরু আরও এক কদম হেঁটে পথের মোড়ে এসে দাঁড়াল! বাপ এগিয়ে আসছে। আলোটা দুলছে হাতে। বাপ জমি ভেঙে উপরে উঠল। যে পথ নদীর পাড়ে পাড়ে নবাবের রাজধানী পার হয়ে আরও উত্তরে গিয়ে পদ্মায় মিশেছে, সে পথ না ধরে ফরাসডাঙার পথে পড়ল। অন্য পথটা ডানদিকের জল—কল ঘেঁষে প্রাচীন ইংরেজ—কুঠির দিকে রওনা হয়েছে। গেরু এই পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে বাপকে উঠে আসতে দেখল, জল—কলের আলো দেখল, দূরের ফরাসডাঙার ছায়াছায়া অস্পষ্ট জঙ্গল দেখল।
কচ্ছপের মতো কৈলাস গুড়িগুড়ি হাঁটছে। সে হারিকেনের আলো এবং তেল বাঁচিয়ে হাঁটছে। জোরে সে হাঁটতে পারে না। ইচ্ছা করলেও না। অথচ গেরুকে বলবে, জলদি হাঁটলে হারিকেনের তেল উপরে উঠে আসবে। আলো নিভবে। অন্ধকার পথে চলতে কষ্ট হবে অথবা আর একটা দেশলাইর কাঠি জ্বালতে হবে।
বাবুঘাট থেকে এই পথের মোড় পর্যন্ত রাস্তা অত্যন্ত খারাপ। পথ উঁচুনীচু, ভাঙা। গোরুর গাড়ির চাকার দাগগুলো রাতে সাপের খোলসের মতো মনে হয়। মনে হচ্ছে। যত আঁধার হয়, যত আলোর জোর কমে, তত সাপের খোলসগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তত কৈলাস হোঁচট খায় বেশি, তত ওর খিস্তি করার শখ বাড়ে। সুতরাং এই পথটুকুই কৈলাস অত্যন্ত সন্তর্পণে হাঁটে। কারণ অধিকাংশ সময় সে বেসামাল হয়ে পড়ে।
এবার ওরা পুবদিকে চলল। এই পথও গেছে নবাবের রাজধানীতে। এ—পথ যেমন উঁচু তেমনি কুমিরের পিঠের মতো অমসৃণ। জল—কল ডাইনে ফেলে পথ কেবল জাফরিকাটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ছুটেছে। পথের দুপাশে রয়েছে রাজ্যের অনাবাদি জমি। ছোট ছোট বাচ্চা ছেলের কবর। নারকেল গাছ, হিজলির বন, কাশফুলের জঙ্গল। নীলকুঠি সাহেবদের ভাঙা বাড়ি। জায়গায় জায়গায় পথ ভেঙে গেছে। ওরা এই পথ ধরে হাঁটছে। রাত ঘন বলে কোনো জনপ্রাণীর সাড়া ওরা পাচ্ছে না। শুধু জল—কলে ইতস্তত দুটো—একটা আলো জ্বলছে। ভটভট শব্দ হচ্ছে ইঞ্জিনের। সদর দরজায় দারোয়ান কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। ভসভস করে তার নাক ডাকছে।
এ—সময় কৈলাস কাশল। জল—কলে শব্দ হচ্ছে। কাশির আওয়াজে জল—কলের দালানগুলো যেন নড়ছে। এত নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গ এইসব মাঠ, ঝোপ, জঙ্গল যে কৈলাস জোরে কাশতে পারল না পর্যন্ত। সে যতটা পারল কাশিকে প্রশমিত করে ঢোঁক গিলে হাঁটতে থাকল।
ওদের এখন আর সামান্য পথ হাঁটতে হবে। এই সামান্য পথটুকুই খুব ভয়াবহ। এখানে ঝোপ—জঙ্গলগুলো পথের উপরে হুমড়ি খেয়ে আছে। সাপখোপের এক্তিয়ার এটা। দক্ষিণে প্রকাণ্ড ঝিল, জগৎশেঠের বিখ্যাত সিঁড়ি। শেঠ পরিবারের ভাঙা পুরোনো পাঁচিল। ঝিলের ভিতর সব পুরোনো কেউটে সাপ। কেউ বলে জগৎশেঠের আমলের ওরা। যক্ষের ধন আগলাচ্ছে ফরাসডাঙায়। উত্তরে প্রকাণ্ড খাল। খালে জলো ঘাস দেখে চটান বলে মনে হয়। আঁধারে সাপখোপ, শেয়াল—খটাশ জলো ঘাসের ভিতর দিয়ে শেঠদের ভাঙা পাঁচিলের অন্যপাশে উঠে রাতের কান্না কাঁদে। হঠাৎ শুনলে মনে হবে অনেকগুলো পুরোনো আমলের প্রেতাত্মা হাল আমলের নসিব দেখে কেঁদে তামাশা দেখাচ্ছে। অথবা কেঁদে—কেটে অস্থির হচ্ছে।
খালের পাড় ধরে পায়ে—চলা সংকীর্ণ পথ। ফণীমনসার কাঁটা পথের দুপাশে। রাতের শিশিরে ওরা ভিজছে। এবং এটাই ফরাসডাঙার পশ্চিম সীমানা। দক্ষিণে শহর, উত্তরপ্রান্তে ঝিল। পুবে রেল লাইন। ইতস্তত আম—কাঁঠালের গাছ সব—অন্ধকারে তারা আচ্ছন্ন, ঝিমুচ্ছে।
নিচে নামার আগে হারিকেনের পলতেটা একটু উসকে দিল। এখানে হারিকেনের আলোটা যত জোরেই জ্বলুক না কেন—কৈলাস পরিতৃপ্ত হয় না। সে যতটা পারল আলোটা বাড়িয়ে দিল। এখানে ওর কেবলই মনে হয়—সে কালকেউটে কিংবা পদ্মনাগিনীর ওপর এই বুঝি পা—টা চাপা দিল। মনে হয় এই বুঝি ওরা কামড়ে দিল।
দূরে জল—কলের আলোটা ঝোপের আড়ালে এখনও যেন দাঁত বের করে হাসছে। ঝোপঝাড়ের ভিতর থেকে ভাঙা কাঁসরের শব্দ উঠছে ঝিঁঝি পোকার। ঝোপে—জঙ্গলে জোনাকি উড়ছে। ওরা ঝোপ থেকে অন্য ঝোপে ছিটকে পড়ছে এবং এই ফরাসডাঙার জঙ্গলকে যেন চিতার আগুন করে রেখেছে। কৈলাস সেই সময় হেঁকে উঠল, ওস্তাদ গুরুর দোহাই, মা মনসার দোহাই, শিবরাজের দোহাই—দোহাই ধন্বন্তরি ওঝার!
পিছনে গেরু হাতের বল্লম উঁচিয়ে বলল, কী হল রে বাপ?
গেরুর মুখের কাছে হারিকেন তুলে বলল কৈলাস, মা মনসার বাহন। গন্ধ পেইছিস না? ঢেঁকুর তুলে গন্ধ দিল। ঝোপে—ঝাড়ে কোথাও লুকিয়ে রইল লিশ্চয়।
ওরা দুধারে নজর রেখে চলেছে তখন। ঝোপ—ঝাড়ের নিচে বল্লম ঢুকিয়ে খুঁজে খুঁজে দেখছে—মরা মানুষটাকে কোথায় মাটি চাপা দিয়েছে। মাঝে মাঝে কৈলাস শ্বাস টানছে জোরে। গন্ধ নিচ্ছে এবং পরীক্ষা করছে শরীরটা মাটির নিচে পচে কোনো গন্ধ তুলছে কিনা!
শালারা। কৈলাস বিড়বিড় করে খিস্তি করল। —কোথায় রেখে গেল মড়াটা! পুঁতল কোন মাটির নিচে? ক্যাবলারা!
গেরু কাঁধের ভাঁড় হাতে নামাল। তারপর সেও বাপের অনুকরণ করে হাতের বল্লমটা জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিল। দেখলে বেওয়ারিশ মড়াটাকে কোথায় কোন জঙ্গলে ফেলে গেছে।
রেললাইনের ওপাশ থেকে কতক জাফরানি রঙের আলো পাতার অন্ধকার চিরে ওদের শরীরের ওপর পড়ছে সেই সময়। চাঁদের মরা মুখটা দেখার জন্য কৈলাস ঝোপের ভিতর থেকে উঁকি মারল। গেরু তখন বলল, কী দেখছিস বাপ? কৈলাস গেরুর কথার জবাব দিল না। সে ঘন ঝোপের ভিতর দিয়ে উঁকি মারছে আর ফোঁসফোঁস করে উঠছে। বলছে—শালারা! কোন তেপান্তরে পুঁতে গেলি রে শালারা! খটাশ—শেয়ালের খাবার করে দিলি!
