গেরুর দিকে কৈলাস কড়া নজরে চাইল—যেন গেরুকে সে এখন বিশ্বাস করতে পারছে না, যেন গেরু এখুনি কৈলাসের কঙ্কাল নিয়ে জগুবাজারে হিল্টন কোম্পানির বড়বাবুর কাছে ছুটবে। সে ফের গাল দিল—শালা হামার বাচ্চা কোন বলিছে! বেতরী শালার মুখে দানা খামোকা দিলাম।
ততক্ষণে গেরু লাফ দিয়ে ডহর পার হয়েছে। বাপকে মাটি থেকে তুলেছে এবং বলেছে, তু গিরে গেলি তো হাম কিয়া করে! হামার হাসি ভি পেল, লেকিন হাম কিয়া করে! হামার কী কসুর আছে তু বুল।
নদীর পাড় ধরে চলার সময় গেরু বলল, চোট লাগল না তো রে বাপ!
কৈলাস উত্তর না করে হাঁটছে। সে যেন অন্যমনস্কভাবে হাঁটল। কিন্তু কিছু দূর এসে কী ভেবে বলল, লাগেনি। লাগবে ক্যানে! ঝাড়ফুঁক জুড়িবুটির পুন্নপদের মাদুলি হামার দেহে কতকাল ধরিয়ে বেঁইধে দিয়েছি। দশকুড়ি দশটা দব্যগুণ আছে ওয়াতে। তুরে ভি বেঁইধে দিয়েছি। পির—পরির নজর, ভূত—পেঁতের শ্বাসে তুরে ভি খাবে না। এইসব কথা বলতে গিয়ে ওর গলা শুকিয়ে উঠছে। সে ঢোঁক গিলল। সে এই শীতে পারলে জল খেত। সে এই শীতে পারলে এখুনি বসে ভাঁড়ের সবটুকু মদ টেনে নেয়।
সে কোঁচড়টা টিপে টিপে দেখল। আছাড় পড়ে সব আবার পড়ে গেছে কিনা দেখল। কোমরের ভাঁড়টা ভেঙেছে কিনা দেখল। ভাঁড়, কোঁচড়ের চালভাজা, কাঁচালংকা, পেঁয়াজকুচি সব ঠিক আছে দেখে সে খুশি হল। এই সব ভাবতে গিয়ে দেখল কৈলাসের গলাটা নিজে থেকেই ভিজে উঠছে। জিভে লাল জমছে। সে তার ডানহাতের সড়কিটা বাঁ হাতে নিয়ে বলল, এ বছরে জাড় যেয়েও যেছে না রে!
চলতে চলতে কৈলাস ভাবল—কঙ্কাল টেনে তুলতে আরও কিছুদিন বাকি। সে ভাবল—ফরাসডাঙার কোন জঙ্গলে মড়াটা পুঁতল। বেওয়ারিশ মড়ার হদিস নিতে কত সময় নেবে, কত সময় ওরা সেখানে পৌঁছবে এই চিন্তায় কৈলাসকে খুব বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
সহসা আঙুলের ওপর কৈলাস কড় গুনল। সে খুশি হল। গেরুকে হাত নাচিয়ে বলল, বাঁচোয়া। দু দফে পানি ঢাললে জায়দা লাগে তো দশ রোজ।
গেরু সকল কথায় কান দিতে পারছে না। ভয়ে কিছুটা সে আড়ষ্ট। সে এখন আগে আগে চলেছে। জীবনে প্রথম কঙ্কাল খুঁজতে এসে ওর ভয় ধরেছে। ভয়ের কথা বাপকে বলতে পারছে না। বাপ এখুনি তবে গোসা করবে, গালমন্দ দেবে। এতদিন বাপ একা এসেছে। আজ ওরা দুজন। এতদিন বাপ কঙ্কাল কুড়িয়ে চটানে শুধু গেরুকে গল্প করেছে, ওর ভয়—ডর ভাঙানোর চেষ্টা করছে—আজ ওরা দুজন। এতদিন বাপ কসরত দেখিয়েছে তাবিজের, শরীরের—আজ ওরা দুজন! সুতরাং ভয়—বিস্ময়ের কিছু নেই। এখন কিছু নেই। এখন কিছু বললেই বাপ চেঁচিয়ে জঙ্গল মাথায় করবে—বলবে, বেইমান, গোলামের বাচ্চা, তু ভাগ হিঁয়াসে!
কৈলাস বলল, তুকে লিয়ে এলাম গেরু! বলা তো যায় না বাপজী ঠাকুরের কখন কী মরজি! হামি মরে গেলে তুকে কোন দেখবে। সে যেন এই বলে গেরুকে অজুহাত দেখাল।
গেরু আগে আগে হাঁটছে। বাপকে ভূতের মতো মনে হচ্ছে। এখন মদের ভাঁড়ের ভিতর সড়কি—কাঁধের ওপর ভাঁড়। ওরা আঁধার ভেঙে, ঝোপ—ঝাড় ভেঙে চলছে তো চলছেই। রাতে এ পথ গেরুর ভয়ানক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। পথ দীর্ঘ বলে এবং ভয়াবহ বলে সে নেলিকে ভাববার চেষ্টা করছে। নেলিকে ভেবে ভয়ের কথা ভুলতে চাইছে, অথবা নেলিকে গভীরভাবে ভালোবাসতে চাইছে।
কৈলাস আর গেরুর ব্যবধান এখন বেশ ফারাক। গেরু রয়েছে সামনের পিঠুলি গাছের নিচে, আর বুড়োটা রয়েছে নিজের হারিকেনের আলোয়—শিরীষ গাছের নিচে। বাচ্চাটা এখন বড় হয়েছে, জোয়ান হয়েছে। বড় বড় পা ফেলে সে এখন হাঁটে। বুড়ো কৈলাসের জোয়ানকি গেছে, হেকিমি জীবনের জয়—জয়কার গেছে, সুতরাং সে হাঁটে আস্তে। যত সে বুড়ো হয়েছে—পা দুটো, কোমরটা, বুকটা তত সরু হয়েছে। তত সে চলতে পারছে না, তত ওর নিজের উপর, কবচ—ওবচের ওপর বিশ্বাস ভাঙছে। তত সে গেরুকে কাছে টানতে চাইছে এবং ব্যবসা শেখাবার সব রকমের ফন্দি—ফিকির আঁটছে। এইজন্যই সে বেওয়ারিশ মড়াটার জন্য এতটা পথ ছুটে এসেছে। সে যেন আর এই শরীরের ওপর ভরসা পাচ্ছে না।
শরীরের দিকে চাইলে এখন ওর নিজেরই কেমন সরম আসে। ভাঙা আরশিতে মুখ দেখার স্বভাব কৈলাসের এখনও আছে। যখন শেষ পক্ষের বৌটা বেশি উতলা হয়, বেশি ঘর—বার হয়, তখন কৈলাস আরশি নিয়ে দাওয়ায় বসে, আর গোঁফ টেনে টেনে বড় করে। তখন সে তার হাজা—মজা মুখটার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটে। বলে, বাহবাঃ, কৈলাস তুর, জোয়ানকি তবে গিল রে! তোর বহু এখন ঘর—বার হল রে। বাহবাঃ, বাহবাঃ, কৈলাস! আরশির মুখটা তখন ওকেও ভেংচি কাটে, যেন বলতে চায়—মর, মর, মরে চটান খালাস কর।
কৈলাস বড় করে মাথায় পাগড়ি বেঁধেছে। মাথার টাক ঢেকেছে। তবু চলতে চলতে ওর মনে হচ্ছিল পাগড়ির ভিতর দিয়ে টাকে ঠান্ডা হাওয়া ধাওয়া করছে। সে মাথার পাগড়িটা কষে বেঁধে নিল কতকাল আগের মতো। তখনও সে কোর্টে হেকিমি করত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের সরু লাঠিটা চটের ওপর পড়ে থাকা জুড়িবুটির ওপর ছুঁইয়ে দিয়ে বলত, রাজধনেশের ঠোঁট, কাকধনেশের পালক, আওর ময়না—ধনেশের তেল শিরমে দু’দফে দিয়ে লিন বাবুলোক—মাথায় রোঁয়া একগাছা উঠে তো হামার ওস্তাদের কসম। তখন কৈলাস মাথায় টুপি দিয়ে টাকটা ঢেকে রাখত।
কিছু সাহস সঞ্চয় করে দূরে গেরু হাতের ওপর বল্লম উঁচিয়ে হাঁকরাল, কী রে বাপ, তু হাঁটতে লারছিস?
