গেরুর শরীর মজবুত এবং কষ্টিপাথরের মতো রঙ। একহাতে মদের ভাঁড় এবং অন্যহাতে বল্লম। সঙ্গে একটা হারিকেন আছে। গায়ে জড়ানো শ্মশানের কাঁথাকাপড়। কোমরে গামছা বেঁধেছে শক্ত করে। গেরুর শীত শীত করছে। উত্তুরে বাতাসে প্রচণ্ড ঠান্ডা। এই ঠান্ডায় ওর মুর্দা তোলার শখ অথবা খোঁজার শখ এখন আর থাকছে না। সে ভাবল, এই শীতে বরং চটানে মদ টেনে নেলির সঙ্গে মাতলামি করা ভালো। সুতরাং সে বল্লম দিয়ে একটা গাছকে ফুঁড়ে দিল।
কৈলাস তখন শীতের পোকা হয়ে বেশ গুটিগুটি চলছে। বেশ এক—পা দু’পা করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অনেক দূর চলে যেতেই ওর হুঁশ হল—গেরুর কথা মনে হল, মরদ বাচ্চা আর কতদূরে! মরদ বাচ্চা এ—কাজ করে খেতে পারবে কী পারবে না—সব কিছু মরদের চলার ঢং দেখে বুঝে নেবার চেষ্টা করল। কৈলাস এই অন্ধকারে, এই নদীর পারে পারে যেন বলতে চাইছে—হামার শরীরটা কঙ্কাল আছে, হামার কঙ্কাল দোসরা কঙ্কাল খুঁজতে যাচ্ছে। সে এইসব ভেবে হাত—পা শক্ত করার ভঙ্গিতে শরীর টানা দিল, তারপর চোখ দুটোকে জোনাকি পোকার মতো ছোট করে সে আঁধারে গেরুর পায়ের শব্দ শোনার চেষ্টা করল। গেরু আসছে এবং ওর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে ফের হাঁটতে থাকল। আঁধারে চলতে কষ্ট—তবু সে হাঁটছে। সে হারিকেনের আলো ধরালে না। তেল—খরচের কথা ভেবে সে অন্তত বাবুঘাটের ডহর পর্যন্ত এই আঁধারে চলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। সে আলো জ্বালাল না অথবা গেরুকে আলো জ্বালাতে বলল না।
সে হাঁটল। সে হাঁটছে। গেরু পিছনে—গেরু ওর ইচ্ছামতো আসুক এই ভাবনা এখন কৈলাসের অন্তরে।
কৈলাস যেতে যেতে কোঁচড়ের চালভাজাগুলো আঙুলে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল এবং টিপে টিপে দেখল। কোঁচড়ের ভিতরে ইতস্তত কাঁচা লংকার টুকরো ছড়ানো—কিছু কাঁচা পেঁয়াজের কুচি। একটা মাটির ভাঁড় কোমরের অন্য পাশটায় ঝুলছে। হাঁটবার সময় ভাঁড়টা দুলছে।
কৈলাস এই আঁধারে ধুকুস—ধুকুস করে চলছিল। জোনাকির চোখ নিয়ে সে এ—আঁধারেও চলতে পারে। অন্তত চলার চেষ্টা করে। এ—সময় ওরা বাবুঘাটের পারে এসে দাঁড়িয়েছে। চটানের আলো এখান থেকে আর দেখা যাচ্ছে না। শ্মশানের হারিকেনের আলোটা ওরা দেখতে পাচ্ছে না। বাঁকের মুখে মাঝিদের পুরোনো আস্তানা হারিয়ে গেছে। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে। নদী এখানে বাঁক নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে পদ্মার দিকে উজানে উঠে গেছে। দুপাশে সেই ঘন ঝোপ—সেই বনকুলের অন্ধকার, সেই সোনাব্যাঙের ঢিবি, খরগোশের গর্ত।
ওরা আঁধারের ভিতর সব টের করতে পারছে। ওরা এখানে মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল। প্রকাণ্ড ডহরটা ওরা পার হবে। আঁধারে পার হতে গেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ার ভয় থাকে। সেজন্য বাপের কথামতো গেরু মদের ভাঁড় মাটিতে রাখল। বল্লমটা নিচে রাখল। এবং হারিকেনটা নিচে রেখে দেশলাই জ্বেলে আলো জ্বালাল। কাঠিটা খস করে জ্বললে গেরু বাপের মুখ দেখল। বাপ গেরুর মুখ। গেরু বাপকে এখন চিনতে পারছে না। মুখটা ওর কেমন ভয়ানক হয়ে উঠেছে। কেমন ভয়াবহ। সে বাপের দুটো বেড়ালের মতো চোখে শিকারের এক ভয়ংকর ইচ্ছাকে দেখতে পেল। সে ডাকল, বাপ! চল বাপ! সে কেমন ভয়ে ভয়ে বাপকে কথাগুলো বলল।
কৈলাস গেরুর কথা শুনল না অথবা শোনার ইচ্ছে ছিল না। গেরু হারিকেন জ্বাললে হারিকেনটা সে তুলে নিল এবং হারিকেনটা ঘুরিয়ে—ফিরিয়ে দেখল। সেই পুরানো জং—ধরা ঢাকনা, সেই ফাটা চিমনি—কোনো পরিবর্তন নেই, অথচ ওর দেখার অভ্যাস। রোজ জ্বেলে একবার ঘুরিয়ে—ফিরিয়ে দেখবে হারিকেনটা। অনেক কালের এবং অনেক পুরোনো বলে কৈলাসের মমতা হারিকেনটার ওপর খুব বেশি। এখনও সে ওর শরীরের মতো এটাকে কোনোরকমে জিইয়ে রেখেছে। জিইয়ে রেখে পুরোনো স্মৃতির ঘরে সে অনেকক্ষণ কদম দিতে পারে।
কৈলাস তখন হেকিমি করত শহরের ফৌজদারি আর দেওয়ানি কোর্টে। দাওয়াই বিক্রির সময় চেঁচাত, পুন্ন—পদের মাদুলি! এ ঝাড়ফুঁক লয়, এ জাদুমন্তর লয়—এ আছে জুড়িবুটির কারবার—দব্যগুণ। ডানপুকুসে টান মারে, তোষক করে, পির—পরিতে নজর দেয়, বাণ মারে, এ—মাদুলি দেহে লিয়ে লিলে আসান পাবেন বাবুলোক—বহুত সামান্য দাম, লিয়ে যান, বিবি—বুঢঢার লাগি লিয়ে যান। এইসব মাদুলি বিক্রি করে সে যখন চটানে ফিরত তখন রাত হত গভীর। কৈলাস সাপখোপের ভয়ের জন্য বিপদে পড়ে এই হারিকেনটা কিনেছিল। আর হারিকেনটা যত পুরোনো হল, যত দিন গেল চটানে, সে অক্ষম হয়ে পড়ছে, তত হারিকেনটার ওপর ওর মমতা বাড়ছে।
এ—সময় গেরু দুটো বিড়ি বের করে বাপকে একটা দিল, নিজে ধরাল একটা। ওরা দুজন বিড়ি খেতে খেতে ফের পথ চলতে থাকল।
অনেকগুলো পরিচিত ঝোপ পার হয়ে কৈলাস অন্য একটা ডহরের পারে এসে থামল। শহরের নালা নর্দমার জল এই ডহর ধরে গঙ্গায় গিয়ে নামে। কৈলাস ডহরের পারে অন্য দিনের মতো আজও উঁকি মারল। লাফ দিয়ে পার হতে পারবে কিনা দেখল। শেষে গেরুর হাতে হারিকেন দিয়ে ব্যাঙের মতো হাতে—পায়ে লাফ দিয়ে ওপারে পড়তে চাইল। পড়ল, হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ভিজে ঘাসের জলে ওর শরীর ভিজে উঠল। শীত—শীত রাতে শীতের ভারে সে তখন কুঁকড়ে উঠেছে। সে যেন নড়তে পারছে না। শীতের কুকুরের মতো সে আর্তনাদ করতে চাইছে। বাপের এইসব ভাব দেখে গেরু হেসে বাঁচে না। রাগে দুঃখে কৈলাস গালমন্দ দিল গেরুকে। নীরস মাটিকেও সে ছেড়ে কথা বলল না। খিস্তি করল। সব আক্রোশ ওর এই মাটির উপর, এই ডহরের উপর। —শালী হামার! শালীর বুক—পিঠ গেন—গম্যি না হল। বুড়া জান—হুট করে পড়লে খুট করে মরবে। মরা কৈলাস বিচে খালাস পাবে গেরু।
