ঘাটোয়ারিবাবু যখন চটানে নেমেছিলেন, নেলি তখন গঙ্গার ঢালু বেয়ে নামছিল। গঙ্গা যমুনা আগে আগে যাচ্ছিল। ওরা ঘেউঘেউ করছে। বাবলার ঘন বনে কটা শেয়াল ডাকছে সেজন্য। গঙ্গা যমুনা মাটির গন্ধ নিতে নিতে নিচে গিয়ে নামল।
নেলি সেই তাজা চিতাটা খুঁজছে। খুঁজে বের করবার চেষ্টা করছে। এখানে ইতস্তত কাঠ, কয়লা, ভাঙা কলসি, ছেঁড়া তোশক, বালিশের তুলো মাটির সঙ্গে মিলেমিশে আছে। নেলি ওগুলোর ওপর দিয়েই হেঁটে গেল। হারিকেনের আলোয় সে ঠিক ধরতে পারছে না কোথায় তাজা চিতাটাকে সে রেখে এল। সে খুঁজছে। খুঁজছে। নদীর বালিয়াড়িতে সে এসে নামল। একটা কাঁচা বাঁশ দেখল। নদীর চরে বাঁশটা এখনও পোঁতা আছে। সে বুঝল কচ্ছপেরা এখনও এসে এখানে ভেড়েনি। সে তাড়াতাড়ি বাঁশটা তুলে আনল জল থেকে এবং বাঁশের ডগায় মাংসপিণ্ডটাকে দু’ভাগ করে গঙ্গা যমুনাকে খাওয়াল। তারপর ফের গঙ্গার ঢালু বেয়ে উপরে উঠে সেই তাজা চিতাটাকে খোঁজা—যেখানে দুখিয়ার নসিব খুলেছে।
এই ভর নিশুতি রাতে প্রেতের মতো দুটো কুকুরকে নিয়ে নেলি তাজা চিতাটা খুঁজছে। নেলির মনে হল তখন কে যেন দূরে শহরের দিকে ছুটছে। নেলি হাসল—ভয় পেয়ে এমন হয়। নেলি তারপরই চিতাটা খুঁজে পেল। এ—সময় নেলির মনটা আনন্দে ভরে গেল। ভয়ানক আনন্দে সে পুলকিত হল। আঁধার রাতে আকাশটায় কত নক্ষত্র, আর এই নিচের পৃথিবীতে কত সুখ—দুঃখ। কত বেদনা। নেলি এমন করে ভাবতে জানে না—কিন্তু মনের ভিতর গহনা পাওয়ার আশা এবং এই সুখানুভূতি ওর অনুভবে ঘা দিচ্ছে এবং তারই প্রকাশ যেন আকাশটায় অনেক নক্ষত্রের নিচে পৃথিবীর অনেক সুখ—দুঃখের মতো।
সে আশার ডিমে তা দিচ্ছে। আহা কাল সে খাবে, কাল সে পেট ভরে ভাত দিয়ে লিবে বাপকে। আহা গঙ্গা যমুনারে! নেলি এখন এই ‘আহা’র জগৎ ধরে দুখিয়ার ধোওয়া কয়লাগুলো হাঁড়িতে ভরছে, জলে ধুয়ে নিচ্ছে—এই ‘আহা’র জগৎ ধরে জল ফেলে দিয়ে কয়লার তলানি খুঁজছে। লন্ঠনের আলোয় তলানি দেখার আগে উত্তেজনায় অধীর হচ্ছে। চোখে মুখে কত সুখের উত্তেজনা। গহনা পেলে কাল গেরুকে খেতে বলবে। গহনা বেচে চাল, ডাল, একটু মাছ নেবে। বাপ মাছ খেতে ভালোবাসে। গেরুর জন্য একটু শুয়োরের মাংস অথবা চর্বি। গেরু শুয়োরের চর্বি খেতে ভালোবাসে।
নেলি তলানি খুঁজল। একটা আঙুল দিয়ে তলানির ছোট ছোট অণুর মতো টুকরোগুলোকে ঘষল। সব জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কিছুই শক্ত ঠেকছে না। পিতল কাঁসা কিংবা লোহার মতো সোনার মতো ঠেকছে না। অণুর মতো ঠেকছে না। দুখিয়া কয়লা ধুয়ে কালি পর্যন্ত তুলে নিয়ে গেছে। নেলি সব কয়লাগুলো জলে ধুলো এবং মালসাতে জলের তলানি খুঁজল—কিচ্ছু নেই। সে নিরাশ হচ্ছে। ওর চোখ দুটোতে ফের দুঃসহ যন্ত্রণা। ফের সে ইচ্ছে করে মাতাল হয়ে উঠেছে। সে ডাক দিল—দোহাই ডাক ঠাকুর, দোহাই তুর।
সে এবার কয়লা ফেলে শ্মশানের ভিজা মাটিগুলো তুলল হাঁড়িতে। যদি কিছু গয়না গলে মাটির সঙ্গে মিশে থাকে।
নেলি আবার আশার ডিমে তা দিতে দিতে জলে মাটি গুলল। জল ফেলে তলানি ঢালল মালসাতে। দু মালসায় তলানি জল ঢেলে জলটা আরও কমাল।
তারপর! এগুলো সে কী দেখছে—এত গহনা! এত টুকরো গহনা! চোখ ওর উজ্জল হয়ে উঠল। চোখ ওর আনন্দে জলে ভরে উঠল। এত! এত সোনার সব টুকরো! সব অণু। নেলি হারিকেনটা আরও কাছে নিয়ে গেল। টুকরোগুলো সব ঝিকমিক করছে। মালসাটি বুকের কাছে চেপে ধরল। —দোহাই ডাক ঠাকুর, দোহাই তুর। হামারে থোড়া শক্তি দে। সে একটা আঙুল দিয়ে নেড়ে নেড়ে দেখতে চাইল। আঙুলটা পর্যন্ত কাঁপছে। তবু যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে একটা অণুর স্পর্শ আঙুলে পেতে গিয়ে দেখল সেগুলো জলের সঙ্গে গুলে যেতে চাইছে।
নেলি আর পারছে না। সে আঙুল দিয়ে ফের চাপ দিল। ওরা ভেঙে যাচ্ছে। জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। নেলি আর পারছে না। আর পারছে না। ডাক ঠাকুর তু হামার সাথ বেইমানি মত কর। পেটের দুঃসহ যন্ত্রণা, শরীরটার দুঃসহ যন্ত্রণা, এইসব যুবতী মেয়ের পোড়া অণুবৎ হাড়ের টুকরো ওকে পাগল করে দিচ্ছে।
নেলি পাগলের মতো প্রেতের মতো সমস্ত রাত এইখানে পড়ে থাকল। এবং ভোর রাতের দিকে নেলি পাগলের মতোই অর্থাৎ ডাইনির মতো হয়ে—চোখ দুটো ফোলা ফোলা চুলগুলো খাড়া খাড়া করে চটানে উঠে গেল। গোমানি রাগে দুঃখে ওর কোমরে কয়েকটা লাথি মেরেছিল—অথচ নেলি কিছু বলেনি, চুপচাপ মাচানে গিয়ে হাত—পা ছড়িয়ে চোখ দুটো স্থির করে—কাঁথা—বালিশের নিচে আশ্রয় খুঁজেছিল এবং ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
দুই
তখন সূর্য পাটে বসেছিল। তখন খেয়াঘাটের মাঝিদের সঙ্গে গোমানি ডোম ঢকঢক করে স্পিরিট গিলছিল এবং তখনই নদীর পার ধরে নামছিল কৈলাস এবং ওর সঙ্গে ওর মরদ বাচ্চা গেরু ডোম। ওরা অনেক খানা—খন্দ পার হয়ে, অনেক ডহর—ডোবা পার হয়ে নদীর পাড় ধরে চলছিল।
ওরা ক্রমশ উত্তরের দিকে নেমে যাচ্ছে। গেরু মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল—শ্মশান পেছনে, শ্মশানটা হারিয়ে যাচ্ছে। চটানটা আর দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং সামনে ফরাসডাঙা, সুতরাং সামনের দিকে ওরা চলতে থাকল। ফরাসডাঙার জঙ্গলে মৃত মানুষের কবরে, অথবা সে ভাবল নতুন কবরে, যত তন্তর—মন্তর শিখল বাপের কাছে সব উগরে দেবে। তারপর তন্তর—মন্তরের গুণাগুণ দেখে সাহস সঞ্চয় করে নেবে।
