ঘাটোয়ারিবাবুকে দেখেই গোমানি কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। খুন হো যাবি, জবাই হো যাবি বলে আর চিৎকার করল না। এখন সে যথেষ্ট ভালো মানুষ। এখন সে চটানের কোনো ঘটনারই সাক্ষী হিসাবে থাকতে যেন নারাজ। কিছু ঘটেছে যেন এও মিথ্যা। কিন্তু ঘাটোয়ারিবাবু ঘরে উঠে এলে খুব বিষণ্ণ গলায় বলল, বাবু, নেলি চটানসে ভেগে গেল আঁধার রেতে। বাবু, হামি কী করব? মেয়েটা হামাকে ফাঁকি দিল বাবু।
গোমানির শরীরটার দিকে চেয়ে ঘাটোয়ারিবাবুর মনটা ভিজে উঠল। তিনি বললেন, ও তো প্রায় রাতেই যায় রে! আজ প্রথম গেল ভাবছিস!
গোমানি দা—টা মাচানের নিচে রেখে দিল। —লেকিন কাঁহা যায় হাম ত না জানে বাবু!
ঘাটোয়ারিবাবু এখন উপদেশ দেওয়ার মতো করে কথা বলছেন। —তবে চুপ করে থাক। চুপ করে শুয়ে থাক। খুনোখুনি করবি কাকে? খুন ত বেটা তুই নিজেই হয়ে আছিস। মদ খেয়ে দিনরাত পড়ে থাকবি, মেয়েটাকে খেতে দিবিনে। মা—মরা মেয়েটা সারা দিন রাত খেতে না পেয়ে এঘর—ওঘর করবে, না খেতে পেয়ে মেয়েটা কাঁদবে—আর আঁধার রাতে ভেগে গেল ত হুঁশ হল—মেয়েটা কাঁহা যায় হাম ত না জানে বাবু। শালা শুয়োর—হারামজাদা গঙ্গাপুত্তুর! শুয়ে থাক হনুমানের দালাল কোথাকার! শেষে তিনি দুখিয়ার দিকে চেয়ে বললেন, এই দুখিয়া, বেটা সুদখোর, তুই আবার এখানে কেন?
ভয়ে ভয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল মংলি। দুখিয়া আমতা আমতা করতে থাকল প্রথমে, পরে কিছু বলার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘাটোয়ারিবাবুর চোখের দিকে চেয়ে কিছু বলতে সাহস করল না। হরীতকী তখন দুখিয়ার দিকে আড়ে ঠারে চাইল। ব্যঙ্গ করল। রসিকতা করতে চাইল—জানে না বাবু উইত উবকার করতে এল নেলির।
হো উবকার করতে চেয়েছে। একটা তির্যক গলা ভেসে আসছে দুখিয়ার ঘর থেকে। মংলি ঘরে বসে হরীতকীকে উপলক্ষ্য করে কথাগুলো বলছে। ঘরে বসে বসেই হাত—পা নাড়ছে এবং চোখমুখ টেনে হরীতকীর জবাব দিচ্ছে।
দুখিয়া ভালোমানুষের মতো কথা বলল এবার। —শুয়ে পড় গোমানি। কী আর করবি—সব নসিব। কাঁহাতক আর বসে থাকবি বেটির লাগি—শুয়ে পড়। বেটি তুর কামাই করে ফিরতে বহুত রাত হবে। যেন দুখিয়া এখন কত ভালোমানুষ হয়ে গেছে, যেন গোমানির দুঃখে সে খুব কষ্ট পাচ্ছে। গোমানির মেয়েটা ফিরতে রাত হবে বলে যেন ওরও ঘুমোবার অসুবিধা। সে এবার ঘাটোয়ারিবাবুর দিকে চেয়ে বলল, কী বাবু, হামি ঠিক বুলছি না, ও এখন শুয়ে পড়ুক।
ঘাটোয়ারিবাবু কোনো জবাব দিতে পারলেন না দুখিয়াকে। নেলির কামাই করে ফিরতে রাত হবে কথাটা দুখিয়ার গলায় নষ্ট ঠেকল। তিনি হরীতকীর দিকে চাইলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্য মানুষ হয়ে কী এক অন্য ভাবনার ভিতর ডুবে চটান থেকে উঠে গেলেন। দুখিয়া এ—সব দেখে হাসল। হরীতকীর দিকে চেয়ে চোখ টানল। তারপর বেশ বড় বড় পা ফেলে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় বলল—তুর মেয়েটা চটানে দিন দিন ডাইনি বনে যাচ্ছে। ও কী হরীতকীর লাখান একটা বাচ্চা দিয়ে লিবে চটানে। গোমানিকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলল দুখিয়া। গোমানি শুনল। চোখ তুলে হরীতকীকে দেখে বড় বড় পা ফেলে সেও ঘরে ঢুকে গেল। যেন হরীতকীকেই ওরা সবাই শাসন করে গেল—নেলিকে নয়।
হরীতকীর তখন ইচ্ছে হল বলতে, হে দিয়েছি ত, হে দি লিছি বাচ্চা। তেরে বহুকা মাফিক হামি কী পোড়াকাঠ যে আগুন দিলে ভি জ্বলবে না। তাজা কাঠ আছি—আগুন গিলেছি, বাচ্চা দে লিছি। এ—লাজ না খোঁটার কথা আছে। হরীতকী, মংলিকে উদ্দেশ করে সারারাত ধরে গালমন্দ দেওয়ার কথা ভাবল। কিন্তু কিছু বলল না। এই নিশুতি রাতে চিল্লাতে শুরু করলে ফের ঘাটোয়ারিবাবু ছুটে আসবেন এবং তিনি দুখিয়া—মংলির এমন সব ইশারাতে সরম পাবেন। সেইজন্যই আঁধার রাতে কোনো গরল না ঢেলে হরীতকী নিজের ঘরে গিয়ে বাচ্চাকে চেপে ধরল এবং সমস্ত দুঃখ ভুলে আদর করল, শনিয়া, তু মেরে লাল।
কাঁথা—কাপড়ে শরীর ঢেকে গোমানি বেশিক্ষণ মাচানে বসে থাকতে পারল না। লম্ফটা দুবার দপদপ করে জ্বলে শেষে নিভে গেল। ঘরটা অন্ধকার হয়ে উঠল। গলা বেয়ে ফের কাশি উঠছে। খকখক করে ক’বার কেশে সে উপুড় হয়ে শুল। হেঁপো রুগির মতো কিছু কাঁথা বালিশ এনে বুকের নিচে ঠেসে দিল। কাশি দম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল। মাঝে মাঝে কোনো শব্দ হলেই কাঁথা—কাপড় থেকে মুখ বের করে দেখল—নেলি এসেছে কিনা! এল না! নিচে বাচ্চা শুয়োর দুটোর শব্দ। ফের মুখ বের করল—নেলি আসেনি। নিচে অথবা টং—এ কবুতরের শব্দ। এ—আঁধার রাতে নেলি কোথায় গেল! কাঁহা গেল মেয়েটা। ওর কষ্ট হতে থাকল। এ—সময় ওর ফুলনের ওপর রাগ হল। ফুলনের মৃত্যুর উপর। ফুলন মরে খুব অপরাধ করেছে এমন একটা ভাব কাজ করছে ওর মনে। ফুলন বেঁচে থাকলে এসব হাঙ্গামা ওকে পোয়াতে হত না। এইজন্য সে মাঝে মাঝে মেয়ে এবং মার ওপর খুব রেগে উঠছিল। তখন গোমানির চোখে মুখে কেমন বেপরোয়া ভাব। চোখ দুটো আঁধারেও কেমন ঘোলা ঘোলা। নেলি ফিরছে না—বড় কষ্ট হচ্ছে ওর। চটানে নিশুতি রাত নেমেছে। বরফের মতো ঠান্ডা নেমেছে। নেলি এই ঠান্ডায়, এই শীতে কিনা জানি করছে! চটানে এখন আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। শ্যাওড়া গাছে ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। ঘাটে মড়া নেই। দূরে কয়েকটা কুকুর আর্তনাদ করছে। সে অনেকগুলো শেয়ালের ডাক শুনল বাবলার ঘন বনে। শীতের ঠান্ডায় মুরগিগুলো ডিমে তা দিতে দিতে চিৎকার করছে কৈলাসের ঘরে। কৈলাসের ঘরে ওর তৃতীয় পক্ষের বৌটা একা। বৌটা মদ খেয়ে পেট ঢাক করে চিত হয়ে ঘুমোচ্ছে। শুয়ে শুয়ে এটা সে আন্দাজ করল। এ—সময়ই উঠে পড়ে নেলিকে ঢুঁড়তে যাওয়ার ইচ্ছা হল গোমানির। এক ফাঁকে একটা নজর দিয়ে আসবে কৈলাসের ঘরে এই ওর বাসনা। অথচ উঠতে গিয়ে দেখছে শরীরটা ওর যেন পাথর হয়ে গেছে।
