দুখিয়া উঠে প্রথমেই হারিকেনের আলোটা উসকে দিল। হারিকেনটা নিয়ে ধীরে ধীরে বাইরে এসে দাঁড়াল। হারিকেনটা উপরে তুলে নেলি কাছে কোথাও আছে কিনা দেখল। না দেখে সে হাজির হল গোমানির ঘরে। গোমানি নাক ডাকিয়ে ঘুমচ্ছে—বেটা হাড় হাভাতে! দুখিয়া গাল দিল মনে মনে। —বেটা ইসপিরিট খোর। প্রথমে সে মাচানের কাছে গিয়ে নাড়া দিল—গোমানি গোমানি, অঃ গোমানি! হারে উঠ। উঠে তামাশা দেখে লে। জোয়ান বেটির তামাশা। বেটি ত তর ভাগলবারে। তুর বেটির ঘাড়ে ভূত সোয়ার হো গিয়ারে গোমানি! বেটি তুর ডাইনি বন গিয়া।
গোমানি কাঁথা—কাপড় ঠেলে উঠে বসল। কিন্তু ব্যাপারটা ধরতে পারছে না। মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে। এখনও শরীরটা ক্লান্ত, ভারী—ভারী। কে কী বলছে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না—বুঝতে পারছে না। সুতরাং সে ফ্যালফ্যাল করে দুখিয়ার দিকে চেয়ে থাকল।
হামারে দেখে তুর হবেটা কী? নেলি আঁধার রাতে কাঁহা গ্যাল দ্যাখ। দু চারঠো আখেরের কাজ কাম কর।
কাঁহা গ্যাল।
কাঁহা ভি গ্যাল।
তু না জানিস?
হাম না জানে?
চটানের কৈ না জানে?
দুখিয়া ঠোঁট উলটে বিদ্রূপ করল, কোন জানে!
গোমানি এবার মরিয়া হয়ে ডাকতে থাকল, হরীতকী, হরীতকী!
হরীতকী শুয়েছিল। ঘুমিয়েছিল। গোমানির চিৎকারে সে জাগল। বসল এবং দুয়ার খুলে বের হয়ে দেখল দুখিয়া, ওর বৌ মংলি এবং গোমানি চটানে হইচই বাধিয়ে দিয়েছে। হরীতকীকে দেখে গোমানি ওর কাছে ছুটে গেল। বলল, তু জানে নেলি এ—আঁধার রাতে কাঁহা গ্যাল? জানে তু?
হাম না জানে গোমানি।
তু না জানে, দুখিয়া না জানে, কৈ না জানে, তব কোন জানে? কোন!
গোমানির মাথায় এখন আর তেমন ঘোড়দৌড় হচ্ছে না। এতক্ষণে শরীরটা হালকা বোধ হচ্ছে যেন। তবু সে জোরে কথা বলতে পারল না। শরীর দুর্বল। সে বুঝতে পারল—সে কত অসহায়। এজন্য দুখিয়া, হরীতকীর দিকে চেয়ে নেলির অনুসন্ধানের প্রত্যাশা করল। যদি ওরা কিছু বলতে পারে, অথবা ঢুঁড়ে এসে খবর দেয় নেলিকে পাওয়া গেছে, নেলি মালসা করে ডাল, ভাত, মাছ, মাংস আনতে যায়নি। যদি ওরা বলে নেলির ভিতর ডাইনি হওয়ার মতো লক্ষণ আপাতত প্রকাশ হচ্ছে না। যদি বলে নেলিকে পাওয়া গেছে—তু চিন্তা না করে গোমানি। কিন্তু ওরা নড়ল না, কিছু বলল না। ওরা দাঁড়িয়ে থেকে গোমানির অথর্ব শরীরটা দেখল শুধু।
এতটা অথর্ব বুঝেই দুখিয়া বলতে বুঝি সাহস করল, হামি ত তুর বেটির জন্য পাহারাদার না আছে। তুর বেটি কাঁহা গ্যাল ও হামাদের বুলতেই হবে। বেটি তুর আচ্ছা লয় গোমানি। ওকে থোড়া সমজে রাখ।
উঠোনের অন্যপাশ থেকে মংলি বলল, তু দুখি, চলে আয়। গোমানির বেটি আঁধার রেতে কাঁহা গেছে ও গোমানি বুঝবে। তু ওকে ভালাই করিস ত ও বুঝবে মন্দ। লয়ত ওয়ার বেটি রাতে কাঁহাসে ভাত দাল মাছ মাংস লিয়ে আসে। —এক দফে ও বুলবে না ওয়াকে। হাপুস হাপুস শুধু গিলবে।
ও বাত ঠিক লয় বৌ, গোমানির বেটি মন্দ কাজ করে বেড়াবে, পহর রাতে ডাইনি সেজে ঘোরাঘোরি করবে, ও কথা ঠিক লয়। চটানে ঝাড়ো ডোম আছে, সর্দার আছে, ঘাটোয়ারিবাবু আছে, পাঁচজনার পাশ জরুর নালিশ দিতে হবে। হয় গোমানি থাকবে চটানে, লয় তো হামি থাকবে। চটানে দিন দিন বেজাত অজাত হয়ে উঠছে। বহুত বেইমানি আচ্ছা লয় গোমানি।
গোমানির মন পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠছে। হাসপাতালের খুনের লাশ কাটার সময় যেমন সে ক্রমশ নিষ্ঠুর হয়ে উঠত, সে এখন সেরকম নৃশংস। চোখ দুটো ফের চিংড়ি মাছের মতো ঝুলে পড়তে চাইল মুখ থেকে। সে দুখিয়ার মুখের ওপর গিয়ে ফেটে পড়ল, বেইমানি কোন কিয়া? হাম!
না, তেরে বেটি। হারামি আছে ও। হামার বেটি হোত তু।
জবাই করতি।
জরুর।
হাম ভি করে জবাই। যেন নেলিকে জবাই করে চটানে সসম্মানে বেঁচে থাকা গোমানির একমাত্র পথ। নেলির জন্যই যেন সে এত ছোট হয়ে গেছে। এত দুর্বল হয়ে আছে চটানে। এবং নেলিকে জবাই করলে চটানের সকলে যদি খুশি হয়—তবে আজ সে তাই করবে। তাই করে সকলকে খুশি করবে। এই ধরনের কিছু ভাব গোমানির মনে বারবার চাপ দিচ্ছে। সে মাচানের নিচে থেকে দা—টা খুঁজে বের করল এবং দুখিয়ার সামনে গিয়ে জবাই—এর কসরত দেখাল। তারপর চিৎকার করে উঠল—নেলিরে, তু আজ চটানে জবাই হ যাবি।
ঘাটোয়ারিবাবুর ঘুম আসছিল না। তিনি ঘুমোতে পারছিলেন না, শরীরে কম্বল জড়িয়ে চেয়ারে বসে ছিলেন। বসে থাকতে থাকতে কখন একটু ঘুম লেগে এসেছিল টের পান নি। গোমানির উৎকট চিৎকারে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ঘুমোলেন না। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। গঙ্গাপুত্তুরের দল ঘোর হামলা বাধিয়েছে। ফের চটানে খুনোখুনি আরম্ভ হয়েছে। তিনি জানেন এইসব লোকেরা সমস্ত রাত আর তাকে ঘুমোতে দেবে না। গালমন্দ, খিস্তি, হামলা, মারধোর তিনি না গেলে সারারাত ধরে চলতে থাকবে। সেজন্য কম্বল গায়ে খড়ম পায়ে তিনি চটানে নেমে গেলেন।
ঘাটোয়ারিবাবু চটানে ঢুকেই ধমকে উঠলেন গোমানিকে, এই শুয়োরের বাচ্চা হারামজাদা গঙ্গাপুত্তুরের দল, তোদের জন্যে রাতে ঘুম যেতে পারব না পর্যন্ত। তোদের দিনরাত খুনোখুনি লেগেই আছে। এ কিরে বাবা! এ যেন হনুমানের রাজত্ব। বেটারা সব হনুমানের দালাল দেখছি। কী হচ্ছে এইসব। হৈ—হল্লা চিৎকার! এই শুয়োরের বাচ্চা গোমানি, কাকে খুন করবি—তোর কোন শত্রুকে?
