গোমানি কাঁপা হাতে চাল ভাজা এবং পেঁয়াজিগুলো নাড়তে থাকল। নেলির দিকে চেয়ে বলল, নেলি তুর মায়ী কী বুলত, তু তখন ছোট, খুব ছোট। বুলত খুনের লাশ কেটে তু ভি নরক হলি। বুলত কত কথা, কত তরাস তখন তুর মায়ীর।
গোমানির মাথার ভিতর ঘোরদৌড় হচ্ছে। সে জন্য সে বেশিক্ষণ ফুলনকে মনে রাখতে পারল না। সে এসময়ে নেলিকে পেঁয়াজি এবং চালভাজার সঙ্গে বোতলটা এগিয়ে দিল। —দ্যাখ, তুর লাগি কী লিয়ে এয়েছি। খা, খা। দুটো খেয়ে লে। কিন্তু নেলি খেল না বলে গোমানি বিরক্ত হয়ে চড়া গলায় হেঁকে উঠল, লে আও, লে আও বুলছি মাটির গেলাস। মদ খানেসে দুনিয়া ঠান্ডা হোতা হ্যায়, আওর তু ত নেলি।
নেলি বাপের কথায় জবাব দিল না। এমনকি বাপের দিকে মুখ তুলে তাকাল না পর্যন্ত। একমুঠো চালভাজা, দুটো পেঁয়াজি তুলে নিল। ওগুলো খেয়ে এক মালসা জল খেয়ে বাপের কাছে এল ফের। বলল, মাচানে চল, ঘুমোবি।
নেলির মিষ্টি কথায় গোমানি খুব খুশি হল। মাথার ভিতর ঘোরদৌড়টা এখনও টগবগ করে ফুটছে। সে বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠল—নেলি, তু বেড়ে কথা বুলেছিস। হামি বাঁচোগে নেই। তুর মাভি বুলত হামি বাঁচোগে নেই। লেকিন মা শীতলার কৃপায় তুর মায়ী জলদি জলদি পার পেল। তুকেও কৃপা করেছিল, লেকিন তু বেঁচে গেলি। একটু হেসে গোমানি কিছু মনে করার যেন চেষ্টা করল। তারপর বলতে থাকল—তা তু বুলতে পারিস হামি ইসপিরিট খাই ক্যানে, তুকে ভুখা রাখি ক্যানে, হামি থাকি ক্যানে, সব বুলতে পারিস। লেকিন বাত কী আছে তু জানে, খুনের লাশ, গলায় দড়ির লাশ, সকল লাশের পেট মাথা চিরে হামার মাথা ঠিক থাকে নারে, মাথাটা হামার গরম হয়ে উঠে। হামি পাগল বনে যাই। মদ খানেসে দেমাক ঠান্ডা হয়ে যায়। মদ পিনেসে দুনিয়া ঠান্ডা হোতা হ্যায়, আওর তু ত নেলি। খা, খা লে। স্পিরিটের বোতলটা গোমানি নেলির মুখের সামনে তুলে ধরল।
বাপ, বাপ, আর পারিনে! নেলি কান্না—কান্না গলায় চিৎকার করে উঠল। —তু আর বাপ জ্বালাসনে। নেলি গোমানির হাত ধরে টানতে থাকল। চটানের সব লোক তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। একমাত্র ঝাড়োর বৌ জেগে। বাঁশের পাতি তুলছে বসে বসে। ঘরে একটা লম্ফ জ্বলছে। নেলি এসময় বাপকে কোলে তুলে নিল। বলল, আ যা বাপ, তু আর জ্বালাসনে, হামার বহুত নিদ আতা বাপ। নেলি বাপকে তুলে মাচানে শুইয়ে দিল, এবং কাঁথা—কাপড় দিয়ে ঢেকে জোরে চেপে রাখল বাপের শরীরটাকে। ঠান্ডায় গোমানির শরীরটা বরফ হয়ে ছিল, এখন উত্তাপ সঞ্চার হচ্ছে।
রাত ঘন হচ্ছে। গভীর হচ্ছে।
বাপের পাশে শুয়ে রয়েছে নেলি। ওর ঘুম আসছে না।
আসবে না। শ্মশানের সব ছবিটা সে দেখতে পাচ্ছে। কটা কুকুর কয়েকটা কচ্ছপ ঘোরাফেরা করছে সেখানে। কয়েকটা শেয়ালের আর্তনাদ অথবা ইতস্তত জোনাকির আলো। রাত যত ঘন হবে জোনাকির আলো তত বেশি ভূতুড়ে মনে হবে, তত বেশি শরীরটা ছমছম করবে। অথচ নেলি ভয় পাওয়ার মতো করে হাঁটবে না। কিংবা ওকে দেখে মনে হবে না যে সে কোনো ভয় পাচ্ছে। বরং ওকে দেখলেই ভয় পাওয়ার কথা। কুকুর দুটোর জ্বলন্ত চোখ দেখে ভয় পাওয়ার কথা!
প্রথম দিকে দু একবার গোমানি জোর করে উঠে বসবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নেলি উঠতে দেয়নি। জোর করে চেপে রেখেছে। কাঁথা চেপে গোমানির ওপর বসে রয়েছে। এখন গোমানি হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। নেলি লম্ফর আলোটা তুলে আনল। বাপের মুখ দেখল। মুখ ভয়ানক কুৎসিত—মুখে কূট গন্ধ। ভিতরের দুটো কষ্টি কালো দাঁত শ্বাসের সঙ্গে নড়ছে। আরও ভিতরের আলজিবটা সে দেখতে পেল। আলজিবটা নড়ছে না—সুতরাং বাপ প্রচণ্ড ঘুমোচ্ছে। মুখের ভিতরটা স্পিরিট খেয়ে খেয়ে কালো হয়ে গেছে। যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। বাপের জন্য নেলির অদ্ভুত রকমের কষ্ট হতে থাকল।
মাচান থেকে নেলি সন্তর্পণে নামল। মেঝেতে গঙ্গা যমুনা মুখ গুঁজে পড়েছিল। জ্বলজ্বলে দুটো চোখ দিয়ে ওরা ওকে দেখল। নেলি ইশারা করলে চুপি চুপি ওরা উঠে এল। চুপি চুপি ওরা উঠোনে নামল। উঠোনে দুটো মালসা—কবুতরগুলো মালসায় জল খায় বিকেলে। সে মালসা দুটো হাতে নিল। একটা পোড়া হাঁড়ি নিল। নেলির চোখে দুঃসহ সংশয়। ভয়, দুখিয়া বেড়ার ফাঁক দিয়ে ওকে দেখে চিৎকার করে না ওঠে। চিৎকার করে না বলে—ডাইনি মাগি কাঁহা যাচ্ছে দ্যাখ। সে উঠোনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ভালোভাবে সব দেখে নিল। কেউ জেগে নেই। কেউ না। এমনকি ঝাড়োর বৌ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়েছে। একমাত্র ঘাটোয়ারিবাবুর ঘরে আলো জ্বলছে। এত রাতেও ঘাটোয়ারিবাবু জানালার ধারে বসে রয়েছেন, চেয়ারে বসে কিছু যেন করছেন না—অথচ বসে আছেন। নেলি কুকুর দুটোকে ফের ইশারা করলে! শিবমন্দিরের এবং বাবলার ঘন বন পার হয়ে সে ধীরে ধীরে শ্মশানের চালা ঘরটায় হাজির হল! এখানে সারারাত লন্ঠন জ্বলে। ঘাটোয়ারিবাবু জ্বালিয়ে দেন। বৃষ্টি—বাদলার রাতে আলো নিভে যায়। শীতের রাতে হাওয়া খুব না থাকলে নিবু—নিবু করে সারারাত জ্বলে। শ্মশানকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। নেলি সেই হারিকেনটা খুলে নিল এবং পলতেটা বাড়িয়ে গঙ্গার ঢালে নেমে গেল।
দুখিয়ার বৌ ঘরে ধড়ফড় করে উঠে বসল। ওর ঘরটা চটানের শেষ মাথায়। শিবমন্দিরের পথে নামতে সে দেখল যেন, স্পষ্ট দেখল যেন, নেলি চটান থেকে নেমে গেল। নেলির কুকুর দুটোও। মংলি তাড়াতাড়ি দুখিয়াকে ঠেলে তুলে দিল। বলল, দ্যাখ, দ্যাখ ডাইনি মাগি আঁধার রেতে পালাচ্ছে।
