নেলি শুয়োরের বাচ্চা দুটোকে খেদিয়ে খেদিয়ে ঘরে তুলল। পলো দিয়ে ওদের ঢেকে রাখল। টঙের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার আগে উঁকি মেরে দেখল সবগুলো ঢুকেছে কিনা। কাজগুলো সব শেষ করে নেলি লম্ফ জ্বালাল ঘরে। বাপ আভি তক এল না—মনে মনে এ কথাগুলো আওড়াল। বাপ এলে দুটো চাল দাল লিশ্চয়ই লিয়ে আসবে আজ—নেলি বাপের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। বাপ এলে দুটো ভাত ফুটিয়ে দেবে বাপকে, নিজেও দুটো খাবে। গঙ্গা যমুনাকেও ভাগ দেবে। শিবমন্দিরের পথটায় এসে নেলি এমন সবই ভাবছে তখন। গঙ্গা যমুনাও দু পাশে দাঁড়িয়ে গোমানি ডোমের অপেক্ষায় থাকল।
শিবমন্দিরের পথ ধরে বাবুদের মেয়েরা শরীরে ঠান্ডা মেখে ফিরছে। ওরা লাফাল। ওরা লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। নেলি দেখল—দেখছে। সুখ, সুখ—সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। নেলিও এমন সুখের ইচ্ছায় লাফাতে চাইল। শরীর দিচ্ছে না। শরীর দিলে সে সত্যি যেন লাফাত। গঙ্গা যমুনাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যেত। সুখের রাজত্বে কিংবা গেরুর জগতে। নেলি গঙ্গা যমুনাকে শুনিয়ে যেন বলল, গেরু হামার মরদ হবে। তখন তুরা ভুখা থাকবিনে। তুরা পেট ভরে খেতে পেলে নাচন—কোঁদন করতে পারবি বাবুদের বেটা—বেটির মতো। তুগো কোনো দুখ হাম রাখবে না। তুরা হামার বেটা—বেটির লাখান। সে কুকুর দুটোকে জড়িয়ে ধরল। আদর করল। সুখ জানাল।
তখন গোমানি ডোম ফিরছে। শিবমন্দিরের পথেই ফিরছে। আঁধার ঘন হয়ে উঠেছে এ পথটায়। গ্যাসপোস্টে আলো জ্বলছে। কোনো কোনো ঘরে হারমোনিয়াম বাজছে। ঘুঙুর বাজছে—নাচ গান হচ্ছে। হাসি—মস্করা, হালকা গান হচ্ছে। দু—একটা ঘাটের কুকুর নর্দমার ময়লা খাচ্ছে। তখন কিছু কিছু লোক গলি পথে হারিয়ে যাচ্ছে। ওদের পরনে, ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি। দুটো একটা মানুষ প্যান্ট পরে আলো আঁধারের দিকে হাঁটছে। তখন গোমানি ফিরছে টলতে টলতে। গালাগাল দিচ্ছে এই পথের বাসিন্দাদের। মুখে যা এল তাই বলে খিস্তি করল। শেষে একটা হালকা গানের সুর গলা বেয়ে উঠতে থাকল। নেলি বুঝল, গঙ্গা যমুনা বুঝল—বাপ চটানে ফিরছে।
গোমানি বলল, কোনরে? গঙ্গা যমুনা? নেলি?
নেলি বাপকে দেখে দাঁড়াল। গঙ্গা যমুনাও দাঁড়াল। গোমানি টলতে টলতে ফিরছে। —তুরা ইখানে বসে?
নেলি দেখল বাপের হাত খালি—কাঁধ খালি। গামছায় একটা ছোট্ট পুঁটলি ঝুলছে। নেলির জানতে বাকি নেই পুঁটলিতে কী আছে। রাগে দুঃখে নেলি কোনো কথা বলতে পারল না। বাপ খালি পেটে আজও মদ গিলে এসেছে। এই সব দেখে নেলি অত্যন্ত ক্লান্ত গলায় বলল, আ যা বাপ!
হরীতকীর ঘরের সামনে আসতেই গোমানি দাঁড়িয়ে পড়ল। ভোরের সব কথাগুলো ওর মনে পড়ছে—হরীতকী ভোরে ওকে গালমন্দ দিয়েছে। বলেছে, গোমানি, তুমি একটা বাপই বটে! গোমানি হরীতকীর বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খিস্তি করার আগে সামান্য হাঁটু দুটো একটু সামনের দিকে, কোমরটা একটু পিছনের দিকে দিয়ে দু পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াল। সে দাঁড়াতে পারছে না, তবু জোর করে দাঁড়াল। মাঝে মাঝে বড় বড় হাই তুলছে। সে যেন কী ভাবল—যেন কী বলতে হবে। যেন—তার মনে পড়ছে না। বিরক্তিতে সে পা দুটোকে বেতো রুগির মতো কয়েক বার কাঁপাল। কয়েক বার ভাঁটা ভাঁটা চোখ দিয়ে আশেপাশে কিছু খুঁজল যেন। তারপরই সব ঘটনাটা মনে পড়ায় বলল, মাগি জাত একটা জাত—ওয়ার আবার স্বভাব, ওয়ার আবার ধম্ম! মাগির বাচ্চা হয়েছে শ্মশানে—হবে না! মাগির নেই জাতের ভয়, নেই ধম্মের ভয়—চতুরাকে মদ খাইয়ে খুন করলে। ও শ্মশানে বাচ্চা বিয়োবে না ত হাসপাতালে বিয়োবে। যে খিস্তিটা ভোর থেকে মনে মনে গোমানি ডোম আওড়াচ্ছিল—মদ খেতে পেয়ে সে সবটা এবার উগরে দিল! —থু! এতেও শান্তি নেই, গোমানি হরীতকীর দরজার ওপর থুথু ছিটাল।
এই সব দেখে নেলি বাপের কাছে ছুটে গেল। সে বাপের হাত ধরে টানছে। এমনি হয়তো পিসি দরজা খুলে বের হয়ে অনর্থ বাধাবে। বাপের চুল ধরে টানবে। বাপের শুকনো দেহটা নিয়ে টানা—হ্যাঁচড়া করবে। বাপ হয়তো না পেরে পিসির পা কামড়ে ধরবে। বাপকে তাই টেনে নিয়ে যেতে যেতে ধমক দিল, বাপ, ফের তু ভুখা থেকে মদ গিলেছিস! ইসপিরিট খাচ্ছিস!
হে মদ গিলেছি ত! ইসপিরিট খাচ্ছি ত! গোমানি এবার জোর করে হাতটা নেলির হাত থেকে টেনে নিল!
ভুখা থেকে ইসপিরিট খেলে যে মরবি বাপ!
হাম মরোগে তু বুলছিস? হাম বাঁচোগে নেই!
হে তু মরোগে বাপ!
হাম নেহি মরোগে, নেহি মরোগে। তু মরবে নেলি। রাগে চোখ দুটো চিংড়ি মাছের মতো বাইরে বের হয়ে পড়তে চাইল। —গোমানি মরোগে! কোন বুলবে এ কথা। গোমানি নেলির পেটে লাথি বসিয়ে দিল। তারপর বলল, কোন শালে বুলবে একথা গোমানি মরোগে!
নেলির ইচ্ছা হল এই মুহূর্তে ঘাটের পোড়া কাঠ তুলে বাপের মাথায় বাড়ি মারে। ইচ্ছে হল বাপকে চেপে ধরে মাটিতে। কিন্তু বাপ তখন এত বড় বড় হাই তুলছে এবং বাপের পেটটা এত বেশি নিচে নেমে গেছে যে সে সব দেখে ওর ইচ্ছাগুলোর রঙ অন্যরকম হয়ে যেতে বাধ্য হল। সে অন্যরকম জবাব দিল, হাসপাতালে খুনের লাশ কেটে তু ভি নরক হলি বাপ। খালি পেটে তু হামারে লাথি মারলি? এ আচ্ছা কাজ হল তুর!
গোমানি টলতে টলতে নেলির সাপের মতো বাঁকানো শরীরটা দেখল। যেন ফুলন আবার চটানে ফিরে এয়েছে। যেন নেলি ফুলনের মতোই শাসন করছে বাপকে। গোমানি এবার কাছে এগিয়ে ধরতে চাইল নেলিকে, কিন্তু পা দুটো টলছে বলে এগোতে পারছে না। সে এবার দু পায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করল। এবং নেলিকে দেখে দেখে সে তার স্ত্রীর কথা ভাবল। স্ত্রীর কথা রোজ এইসময় তার মনে হওয়া মাত্র সে ঝিমিয়ে আসে। নেলি আজ ওর মার মতোই যেন বললে, হাসপাতালের লাশ কেটে তু ভি মরক হলি। গোমানি এইসব ভেবে দাঁড়াতে পারছে না। সে ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল। সেই ফুলনের চোখ দুটো নেলির চোখে, নাক, সেই মুখ, সেই গড়ন। নেলির পেটে লাথি মেরে সে এখন খুব দুঃখ পাচ্ছে। গলার গামছা নিচে রাখল। পুঁটলি খুলল। গামছার পুঁটলিতে স্পিরিটের বোতল, কিছু চালভাজা, কিছু পেঁয়াজি।
