কাঁথা—কাপড়ের নিচে থেকে নেলি জবাব দিচ্ছে, দুদিন ভি হামার তর সইবে না। চটানে ভুখা থেকে হাম নেই মরেগে। কাঁথা—কাপড়ের আঁধারে নেলির বাঁচার ইচ্ছা একান্ত।
লেকিন হাম কিছু শিখলাম না, না দানরি, না হেকিমি। রাহুচণ্ডালের হাড় ভি নেই যে হেকিমি দানরি ব্যবসা করে খাব। বাপ লিয়ে যাচ্ছে আজ, এই পয়লা ফরাসডাঙায় মুর্দার কঙ্কাল তুলতে যাচ্ছি—বাপের ব্যবসা শিখে লিচ্ছি।
নেলির কপালে কতকগুলো রেখা ফুটে উঠল তখন। রেখাগুলো কপালের উপরেই নাচছে। মনে মনে সে যেন কোনো বাঁচার কৌশলকে আয়ত্ত করছে। সে কাঁথা—কাপড়ের ভিতর থেকে মুখ বার করে বলল, হাম ভি কিছু শিখে লিব, হাম ভি কিছু জরুর কামাব।
কাঁহাসে কামাবি?
ঘাটসে। ঘাটের ডাক দুখিয়ার। সেখানে বড় লোকের বেটির শরীর আগুনে খাচ্ছে। গহনা পুড়ছে। দুখিয়ার ডাক যখন, সব গহনা ও জরুর কয়লা ধুয়ে লেবে। যদি কিছু পড়ে থাকে, পহর রাতে হামি লিব।
নেলির কথা শুনে গেরু চোখ টান টান করল। বলল, তু একলা ভয় পাবিনে যেতে? তখন মড়া জ্বলবে না ঘাটে।
নেলি পাশ ফিরে শুল। বলল, কীসের ভয়! কিসকো ভয়!
লেকিন দশ লোক যদি দশ কথা বুলে?
বুলে বলবে। দশ লোক ত দশ কথা বুলছেই। বাপকে ওরা বুলছে রাতে নেলি কাঁহা ভাগে, তু নজর না রাখে গোমানি! মেয়েটা তুর দিন দিন ডাইনি বনে যাচ্ছে। তু বাপ হয়ে নজর না রাখে। খাটো কাপড়টা নেলির বুক থেকে সরে যাচ্ছিল—নেলি অন্যমনস্কভাবে কাপড়টা দিয়ে শরীরটা ঢেকে দিল। —দু রাত ধরে বাপ নজর রাখছে, হামি যেতে পেছি না কোথাও খেতে পেছি না কিছু। রোজ ভুখা থেকে মর গিলাম গেরু।
গেরু সেই কষ্ট ভাবটা মনে মনে অনুভব করতে পারছে। সে বলল, ফরাসডাঙায় যাবার সময় হয়ে গিল। কাল সবেরে আওগে। কাল সবেরে তু আর হাম জরুর খাওগে। এই বলে গেরু বল্লমটা তুলে নেলির ঘর থেকে নেমে চটানে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নেলির কিছু করার নেই এখন। শুধু মাচানে বসে থাকা, বাপের জন্য অপেক্ষা করা। মাচানে বসেই সে হরিধ্বনি শুনতে পেল। বড়লোকের বেটারা মেয়েমানুষটাকে ঘাটে রেখে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। পোড়া কয়লায় মেয়েটার শরীর পুড়ে ছাই হয়েছে। গহনাগুলো ছাই হয়নি। গহনাগুলো কয়লার সঙ্গে লেগে আছে। দুখিয়া হয়তো এখন নদী থেকে কলসি কলসি জল তুলছে। জল ঢালছে শ্মশানে। বালতিতে সব পোড়া কয়লা তুলে জলে ধুয়ে নিচ্ছে। সোনাদানা সংগ্রহ করছে। নেলির ইচ্ছা—অনেক ইচ্ছা এখন। বালতি থেকে কী করে সোনাদানা দুখিয়া তুলছে—সে দেখার ইচ্ছা। কিংবা গহনার দু—এক অণু চুরি করার ইচ্ছা। চুরি করে গহনা বেচে কিছু খাওয়ার ইচ্ছা। এতগুলো ইচ্ছার তাড়নায় সে জড়বৎ হয়ে বসে থাকল মাচানে। অথবা সে জানে ঘাটে গেলে দুখিয়া এবং ওর বৌ ওকে এ—সময় তেড়ে মারতে আসবে। ডোমের কোনো মেয়ে মরদকে সে এ—সময় ঘাটে নামতে দেবে না। সেজন্য মাচানে বসে থাকা ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকল না নেলির।
রাত নামছে চটানে। অশ্বত্থ গাছটার কাকগুলো শেষবারের মতো হইচই করে ডালে ডালে বসে গেল। গঙ্গার ঢাল থেকে শুয়োরের পাল নিয়ে ফিরে এসেছে বাবুচাঁদ। খোঁয়াড়ে শুয়োরগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে সে ওর ছোট কুঠরিটায় ঢুকে গেল। ঘাটোয়ারিবাবু এ—সময় জপতপ নিয়ে বসেছেন অফিসঘরে। ঝাড়ো ডোমের ঘরে এখন সকলে পচাই খাচ্ছে। কৈলাসের ঘরে শেষ পক্ষের বৌটা পচাই গিলছে। গেরু এবং কৈলাস চলেছে—কাঁধে মদের ভাঁড়, হাতে বল্লম। ওরা চটান থেকে নেমে যাচ্ছে। ওরা ফরাসডাঙায় যাচ্ছে বেওয়ারিশ মড়ার তল্লাসে। অন্ধকার মাচানে শুয়ে নেলি সব ধরতে পারছে। নেলি জানে এ—সময়টাই একমাত্র সময় যখন চটানে পচাইর ঝাঁজ ওঠে। সে জানে চটানে এখন হৈ—হল্লা হবে। নাচনকোঁদন হবে। লখি, টুনুয়া পচাই গিলে মাতলামি করবে চটানে। ওরা এসে নেলির ঘরেও করতে পারে। কিংবা কৈলাসের শেষ পক্ষের বৌটার কাছে। লখি, টুনুয়া এখন হল্লা রসিকতা করবে। সিনেমার হালকা গান গাইবে। তখন কৈলাসের বৌটা পর্যন্ত মাতলামি করবে এইসব ভেবে নেলির ইচ্ছে হচ্ছে একটু পচাই গিলতে। বাপ এলে বাপের সঙ্গে একটু মাতলামি করতে। চটানের এমন পরিবেশে নেলির মনেও মাতলামির শখ জাগল।
প্রচণ্ড শীতের হাওয়া চটানের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। গায়ে শীত লাগতেই নেলির মনে হল কিছু পোড়াকাঠ এনে মাচানের নিচে রাখতে হবে এবং ভোররাতে যখন বাপ আর বেটিতে ঠান্ডায় কাঁথা—কাপড়ের নিচে ঘুম যেতে পারবে না, এবং বাপ খকখক করে কেবল কাশবে, তখন নেলি মাচানের পাশে পোড়াকাঠের আগুন জ্বালবে। সেজন্য নেলি ঘাট থেকে পোড়াকাঠ এনে উঠোনে রোজ তুলে রাখে, পোড়াকাঠে ভাত হয়, পোড়াকাঠের উত্তাপ নেয়। নেলি কিছু কাঠ তুলে আনার জন্যে মাচান থেকে উঠোনে নামল এবং পোড়াকাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঠ কম কম মনে হচ্ছে। নেলির চোখ মুখ দুটোই জ্বলে উঠল, নেলির উপোসি দেহ থেকে গরল উঠতে থাকল, মর, মর—ঘাটে গিয়ে মর। হামার কাঠ ছুরি করে মরছিস ক্যানে! নেলি দুটো হাত উপরে তুলে সমস্ত দুনিয়াকে শাপ—শাপান্ত করতে থাকল—ডাক ঠাকুর, তু দেখে লে সব। তোর দুনিয়ায় হামি ভুখা আছি। হামার কাঠ চুরি করে লিছে। তুর কাছে নালিশ থাকল বাপ! তারপর নেলি কয়েকটা কাঠ ঘরে তুলল এবং মাচানের নিচে রেখে দিল। বলল, ভোর রাতে আগুন জ্বালব, ও ভি মানুষের সহ্য লয়।
