এখন যদি সুরেশবাবু দেখতে পেতেন—অথবা গীতামাসি কিংবা মা, কেউ এ—ঘটনা বিশ্বাসই করতে পারত না। ওদের চোখে এটা কোনও ভৌতিক ব্যাপার হয়ে যেত।
টুকুন এবার গোলাপের বন পার হয়ে গেল। সে দেখতে পাচ্ছে পুলিশটা চারদিকে তাকাচ্ছে।
টুকুন এবার বনকরবী গাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়াল। পুলিশটা তার দিকে আসছে।
এখন সন্ধ্যা। বাগানের নানারকমের ফ্লুরোসেন্ট বাতি। টুকুন পুলিশ আসার আগে ডাকল, সুবল।
সুবল এতক্ষণে লতাপাতার ফাঁকে দেখছে—দিদিমণি। সে প্রায় পাগলের মতো নেমে আসছে এবং লাফ দিয়ে ঝুপ করে টুকুনের পায়ের কাছে পড়ল।
—দিদিমণি তুমি!
—তাড়াতাড়ি এসো। বলে টুকুন আবার সুবলকে নিয়ে বাগানের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুবলের হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগ। ব্যাগে কিছু রজনিগন্ধা। তার গন্ধ এখন সুবলের গায়ে। সে এখানে যে ভয়ে ছুটে এসেছে বোঝা যাচ্ছে। এভাবে একদিন টুকুনদিদিমণিকে আবিষ্কার করতে পারবে ভাবতে পারেনি। অনেকটা গল্পগাথার মতো। এমন সব মেলানো গল্প শেফালীবউদি তাকে বলত। সে এতটা কখনও আশা করেনি। আশা করেনি বলেই সে কেমন আরও গ্রাম্য সরল বালক হয়ে গেল। নিজের এই আনন্দ সে কিছুতেই হইচই করে প্রকাশ করতে পারছে না।
টুকুন ওকে যেভাবে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে—সে সেভাবে যাচ্ছে।
টুকুনকে দেখে সুবল বিশ্বাসই করতে পারছে না, এই টুকুনদিদিমণি। খুব বেশি একটা হেঁটে এলে জানালা পর্যন্ত আসতে পারত। সে এতটুকুই দেখেছে। এমনভাবে একেবারে স্বাভাবিকভাবে সে কোনওদিন টুকুনকে হাঁটতে দেখেনি। কী সহজ সরল ভাবে ওর হাত ধরে নানারকমের গাছের ভিতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টুকুনের পরনে কী সুন্দর পোশাক। কেমন সকালের গোলাপের মতো তাজা রং পোশাকের রংয়ে। এবং গোলাপের পাপড়ি মতো নরম পোশাক। প্রায় ফ্লুরোসেন্ট আলো যেন পিছলে পিছলে যাচ্ছে।
পুলিশটা এখন পাঁচিলের এদিকটায় একটা মানুষ খুঁজছে। পুলিশটার মনে হয়েছে, যারা বোমা ছুঁড়েছিল রাস্তায় তাদের একজন কেউ হবে কারণ লোকটার হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে বোমা ছুঁড়ে মারা সহজ। প্লাস্টিকের ব্যাগ আছে বলেই পুলিশটা এখন ওৎ পেতে আছে। সুবল বাগানের ঝোপজঙ্গল থেকে বের হয়ে এলেই ধরবে। প্লাস্টিকের ব্যাগে যে রজনিগন্ধার গুচ্ছ থাকতে পারে—কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। পুলিশেরা ফুলের কথা বিশ্বাস করে না।
টুকুন বলল, সুবল তুমি এতদিন আসনি কেন?
সুবল বলল, টুকুনদিদিমণি, এটা রাজবাড়ি?
—যা, রাজবাড়ি হতে যাবে কেন? আমাদের বাড়ি।
—তোমাদের বাড়ি? এতবড় ফুলের বাগান! এত ফুল! টুকুনদিদিমণি, আমি রোজ ফুল তুলে নিয়ে যাব এখান থেকে। তার এসব দেখে এত আনন্দ হচ্ছে সে কী কথা বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। তবু কিছু বলতে হয় বলে যেন বলা, টুকুনদিদিমণি আমি তোমাকে রোজ ফুল বিক্রি করতে করতে খুঁজেছি। শেষদিকে কেমন ভেবেছিলাম তোমাকে আর খুঁজে পাব না। তুমি বাদে আমার তো এ শহরে আর কেউ নেই।
টুকুন বলল, সুবল তাড়াতাড়ি এসো।
সুবল বলল, এটা কী ফুল গাছ?
—তোমাকে পরে চেনাব। ঐ দ্যাখো পুলিশটা বাগানের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।
সুবল দেখল সত্যি। ওকে দেখে ফেলেছে।
টুকুন বুঝতে পারল পুলিশটার চোখে ওরা ধুলো দিতে পারবে না। কিংবা সুবলকে নিয়ে জানাজানি হলে মা আবার সুবলের এখানে আসা বন্ধ করে দেবেন। এটা বাড়ির দক্ষিণ দিক। মা—বাবা থাকেন পুবের মহলাতে। এই মহলে সে থাকে, আর ভিতরের দিকে থাকে গীতামাসি। ও—পাশ দিয়ে কাঠের সিঁড়ি নেমে গেছে। কেউ ওর ঘরে উঠে আসতে হলেই সে টের পায় কেউ আসছে। কারণ কাঠের সিঁড়িতে শব্দ হয়। সেই শব্দ এক দুই করে গুণে গুণে কী যে একটা স্বভাব হয়ে গেছে টুকুনের, কোন শব্দে কে আসে টের পায়। মা উঠে আসছেন, না বাবা, না গীতামাসি, না ডাক্তারবাবু না ইন্দ্র—সে সব টের পায়। পায়ের শব্দ কারও একরকমের হয় না।
সে এবার দাঁড়াল এবং এটা বোধহয় একটা রক্তকরবী গাছ। সে বাতির আলোতে ঠিক বুঝতে পারছে না। গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে সে পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। এবং পুলিশ হামাগুড়ি দিয়ে কিছু বনঝোপের মতো জায়গা পার হয়ে সামনে দাঁড়াতেই চোখ মেলে তাকাতে পারল না। একটা ফুলপরির মতো মেয়ে। যেন পাখা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে চোখের পলক ফেলতে পারছে না। কোনও দেবীমহিমা টহিমা হবে। সুবল ওপাশে একটা বড় পাথরের স্ট্যাচুর নীচে বসে রয়েছে। ওকে একেবারেই দেখা যাচ্ছে না।
পুলিশটার মনে হল সে কোথাও কিছু গোলমাল করে ফেলেছে। সে বোধহয় ছুটেই পালাত। কিন্তু সুন্দর গলায় যখন টুকুন বলছে, তুমি এখানে কী চাইছ? কাকে খুঁজছ?
—আমি কিছু খুঁজছি না মেমসাব।
টুকুন এমন কথাবার্তা আরও শুনেছে। সে অবাক হল না। বলল, কেউ নেই এখানে।
—কেউ আমার মনে হয় এই বাগানেই লুকিয়ে আছে।
—সে আমাদের সুবল। সে খুব ভালো ছেলে।
পুলিশ খুব বোকা মুখ করে রেখেছে। টুকুন বলল, সুবলের একটা পাখি আছে। সে এক আশ্চর্য পাখি। এমন পাখি আমি কোনওদিন দেখিনি।
পুলিশ বলল, তাই বুঝি?
টুকুন বলল, সে এসেছে এক খরার দেশ থেকে।
পুলিশ বলল তাই বুঝি?
টুকুন বলল, সে এখন শহরে ফুল বিক্রি করে।
এবং এটুকু বলার পর টুকুন সুবলকে ইশারায় ডাকল। সুবল স্ট্যাচুর ওপাশ থেকে খুব অপরাধী মুখে উঠে আসছে।
