টুকুন জানলা দিয়ে নানারকম ফুল ফুটতে দেখলেই রাজপুত্রের কথা মনে করতে পারে, সুবলের কথা মনে হয়। সে বিমর্ষ হয়ে যায়। খেতে তার ভালো লাগে না, ইন্দ্রকে আজকাল একেবারেই সহ্য করতে পারছে না। মা এসে ইন্দ্রের সম্পর্কে সব গল্প করে যাচ্ছে। ইন্দ্র কলেজের পড়া শেষ হলেই সরকারি স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে চলে যাবে। এসব খবর অর্থহীন টুকুনের কাছে খুবই অর্থহীন। ওর এসব কথা শুনলে ভারী হাসি পায়। সে বলতে পারে, আমার কাছে এমন সব ইতিহাস লেখা আছে, যা তুমি আদৌ জানো না। কত যে অকিঞ্চিৎকর—এই বিদেশ যাওয়া। মা, তুমি ইন্দ্রকে আমার ঘরে আর পাঠাবে না। ওর মুখ পুতুলের মতো। সব সময় মুখটা একরকমের থাকে। সে একটা কথা শুধু জানে,—টুকুন আজ তোমার কেমন লাগছে? শরীর তোমার কেমন?
অন্য কথা জানে না বলে টুকুনের মনে হয় ইন্দ্র এই দুটো কথাই শুধু সারাজীবন ধরে মুখস্থ করেছে। অন্য কথা সে জানে না। তার আত্মীয়স্বজনের ছেলেমেয়েরা কেউ বড় আসে না তার ঘরে। ওর অসুখটা যদি অন্য কারও শরীরে সংক্রামিত হয়—এই অসুখ—কী যে অসুখ—কেউ টের পায় না, একটা মেয়ে সবকিছুর ভিতর কেমন সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে বেঁচে আছে।
সকাল থেকেই আজ এই অঞ্চলে গণ্ডগোল চলেছে। গীতামাসি টুকুনকে এমন বলেছিল। পাঁচিল পার হলে ফুটপাথ। লাইটপোস্টটার নীচে দুটো মানুষের মাথা কারা কেটে রেখে গেছে। সকাল থেকে হইচই। পুলিশ। কোথায় পাশে গুলি চলছে। তিনজন ধরাশায়ী। বিকেলে একটা বড় মিছিল যাচ্ছিল, সেখানে বোমা।
বোমা মিছিল আর নানারকমের অসুখ নিয়ে বেঁচে আছে এতবড় শহরটা। যেমন একটা অসুখ এই শহরের, সব বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদের মতো বাড়িগুলো রাতে ফাঁকা থাকে নীচে ফুটপাথে লোক শুয়ে থাকে—শীতে অথবা ঝড়বৃষ্টিতে কষ্ট পায়। টুকুন বুঝতে পারে না এমন কেন হয়। যখন বাড়িগুলো ফাঁকা, লোকজন কম, গরিব সব মানুষদের সেখানে আশ্রয় দিলে কী যে ভালো হয়। কিংবা কেউ খায়, কেউ খেয়ে হজম করতে পারে না, কেউ না—খেয়ে পেটের জ্বালায় ফুটপাথে পড়ে থাকে। অথবা কী যে ধনাঢ্য পরিবার, তার বাবা তাকে নিয়েও বেশ একটা খেলায় মেতে গেছে, কত বেশি সুখ সে টুকুনের জন্য এনে দিতে পারে এমন খেলা। টুকুনের ঘরটা হলঘরের মতো। নানাবর্ণের দেয়াল। ভিতরে চন্দনের মতো গন্ধ। এবং সব সময় কী যেন গীতামাসি স্প্রে করে দিয়ে যায়। বড় বাথরুম। শ্বেতপাথরের দেয়াল। বিখ্যাত সব চিত্রকরদের ছবি। একটা ছবি, বনের ভিতর একটা বাঘ। পিছনে শিকারি হাতির পিঠে। বাঘের সঙ্গে দুটো বাচ্চা।
আবার ওর খাটটা মেহগনি কাঠের। নানারকমের কারুকাজ করা খাটে সে একা শুয়ে থাকে। এতবড় খাট যে, সে একা শুয়ে থাকে, এ—পাশ ও—পাশ করে কতবার যে অন্য প্রান্তে যেতে চায়—কিন্তু পারে না। সে চুপচাপ কাত হয়ে শুয়ে থাকে, তার পায়ে গীতামাসি আলতা পরিয়ে দেয়। চুল বিনুনি করে বেঁধে দেয়। সে সিল্কের লাল—হলুদ ছোপের ফুল—ফল আঁকা কেমন লুঙ্গির মতো একটা পোশাক পরে। ফুল—হাতা সাদা রংয়ের জামা। চোখ কেমন নীল নীল—এবং বুকে সে কোনও ধুকপুক শব্দ শুনতে পাচ্ছে না ভালোবাসার জন্য। কেবল সেই নির্বান্ধব ছেলেটির জন্য ওর মায়া। সে এলে হয়তো উঠে বসতে পারত।
এবং চারপাশে নানারকমের গণ্ডগোল। গণ্ডগোলের শহরে গণ্ডগোল বাদে কী আর থাকবে! এই সন্ধ্যায় যখন একটা গ্রহাণুতে এক বাতিয়ালা গ্যাসের আলো জ্বেলে দিচ্ছে, তখন কিনা এই গ্রহের সব সৌন্দর্য হরণ করে নেবার জন্য মানুষ মানুষকে অকারণ মেরে ফেলছে। টুকুন জানালায় দাঁড়িয়ে তার দোতলার ঘর থেকে দেখতে পেল, রাস্তার দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষ পাঁচিল টপকে ছুটে আসছে।
দারোয়ানদের ঘরগুলোর পাশে যেখানে লম্বা গ্যারেজ, তার পাশে একটা লোক টপকে এসে কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। সে যেন রাস্তা থেকে প্রাণ বাঁচাতে এসে অন্য একটা ট্র্যাপে পড়ে গেল। পুলিশের লোকগুলো ছুটছে। যাকে পারছে তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচিল টপকে একটা লোক এ—বাড়িতে ঢুকে গেছে, পুলিশের নজর এড়ায়নি। পুলিশও বেশ গোঁফে তা মেরে লাফ মেরে পাঁচিলের এ—পাশে এসেই দেখছে ফাঁকা।
টুকুন চুপচাপ শুয়ে দেখছে আর মজা পাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে—সেই পালানো লোকটা একটা বনকরবীর ডালে বসে আছে। নানারকমের লতাপাতায় গাছটা ঢাকা। এবং টুকুন একেবারে অবাক, রক্তের ভিতর তার হাজার ঘোড়া সবেগে ছুটছে, ওর মুখ—চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে, এবং সে কেমন অধীর হয়ে যাচ্ছে—সে তার ভিতর আশ্চর্য এক তাজা ভাব, অথবা মানুষের যা হয়ে থাকে, সময়ে সংসারের সব নিয়ম—কানুন সহসা পালটে যায়, বোঝানো যায় না এমন কেন হয়, টুকুন কেমন হয়ে যাচ্ছে, টুকুন উঠে বসল খাটে। দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরে কেউ নেই। সে পিছনের দরজাটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিল। ঘোরানো সিঁড়ি বাগানে নেমে গেছে। মালিরা কেউ নেই। এবং সে এ—সময় পাগলের মতো ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে নেমে যাচ্ছে। সে কিছু দেখে ফেলেছে, সে যে নিজের ভিতর এখন নিজে নেই, অথবা তার এটাই নিজের, এতদিন সে একটা মেকি ভয়ে খাটে শুয়ে রয়েছে, এ—মুহূর্তে কোনটা ঠিক ধরা যাচ্ছে না। টুকুন পাগলের মতো ম্যাগনোলিয়া ফুলের গাছটা পার হয়ে গেল।
