টুকুন বলল, এই আমাদের সুবল।
সুবল বলল, আমার নাম সুবল।
টুকুন বলল ওর একটা পাখি আছে। সুবলের দিকে তাকিয়ে বলল, সুবল তুমি পাখিটা আজ এনেছ?
—না দিদিমণি।
—কাল সুবল পাখিটা নিয়ে আসবে।
—আসব।
—আর এই দ্যাখো, বলে সুবলের প্লাস্টিকের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। —দ্যাখো শুধু ফুল আছে। ফুল। সুবল এর ভিতরে ফুল নিয়ে আসে।
—ব্যাগের ভিতর আজকাল কেউ ফুল রাখে জানতাম না মেমসাব।
টুকুন বলল, ব্যাগের ভিতর অনেক কিছু রাখতে পারে। শুধু ফুল থাকবে কেন? সন্দেশ থাকতে পারে, বই থাকতে পারে।
—না, আজকাল মেমসাব শুধু ব্যাগের ভিতরে বোমা থাকে। আর আমাদেরও শালা এমন বজ্জাতি বুদ্ধি, ব্যাগ দেখলেই পিছন ধাওয়া করো, কী আছে না আছে দেখার দরকার।
টুকুন বলল, তবে তুমি যেতে পারো।
পুলিশ একটা সেলাম ঠুকে বলল, খুব বেঁচে গেছিস সুবল। মেমসাব দেবতা। তোকে বাঁচিয়ে দিল!
টুকুন বলল, এসব কেন বলছ?
—মেমসাব আমাকে তো কাউকে ধরে নিয়ে যেতেই হবে। সুবল না হলে সেটা সফল হতে পারে না।
—বিনা দোষে ধরে নিয়ে যাবে?
—আমাদের শুধু ধরার কাজ। বিচারের কাজ সরকারের।
—তার জন্য যাকে তাকে? টুকুনের আর দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে না। এখন পুলিশটাকে বিদায় করতে পারলে বাঁচে। কিন্তু কিছুতেই যেন যেতে চাইছে না। সে বলল, বড় আজগুবি ব্যাপার। আমি যাচ্ছি।
পুলিশ আর দাঁড়াল না। সে সুবলের দিকে ভীষণ কটমট করে তাকাল। এটা কী করে আজগুবি হয় সে বুঝতে পারে না। না, এরা একটা আজগুবি দেশে বাস করছে, সংসারে কী ঘটছে ঠিক খবর রাখছে না? পুলিশ যাবার সময় বলল, মেমসাব যাচ্ছি। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে।
ভুল হয়ে গেছে বলল, এজন্য যে সে জানে বড়লোকদের মেয়েরা এমন হয়ে থাকে। কোথাকার একটা ফুলয়ালার জন্য প্রাণে হাহাকার। এখন ওর সারা মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। সে কোথায় যে আর একটা লোক পাবে! একজনকে ধরে না নিয়ে গেলে বড়বাবু তাকে আস্ত রাখবে না। সে এখন কী যে করে! রাস্তায় তিনজন গেছে। অ্যাম্বুলেন্স এসে ওদের গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে। যারা গণ্ডগোল করল তাদের পেছনে তাড়া করতে গিয়ে মরার দায়িত্ব নিতে পারছে না। তা ছাড়া এখন রাস্তায় একটাও লোক নেই। শুধু একটা কুষ্ঠরুগি আছে। তাকে নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু অসুখটা বড় খারাপ। একটা খারাপ অসুখের লোককে ধরে নিয়ে যাওয়া ঠিক না।
এইসব নানারকম ভেবে যখন পাঁচিল টপকে পুলিশ রাস্তায় নেমে গেল তখন টুকুন কিছুটা যেন হালকা হল। সে বলল, সুবল এসো।
সে সুবলকে নিয়ে এবার নরম ঘাস মাড়িয়ে হাঁটছে। সামনে সেই ঘোরানো সিঁড়ি। টুকুন খুব তর তর করে উঠে যাচ্ছে। সুবল ওর পায়ের দিকে তাকাচ্ছে। কী সুন্দর আর সতেজ মনে হচ্ছে। পায়ে আলতা। সুবলের বারবার কেন জানি মনে হচ্ছে—নীলকমল—লালকমল ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে। সেই সব রাজপুত্রেরা বুঝি এমন বাড়িতেই থাকত।
এমন একটা প্রাসাদের মতো বাড়ি এই শহরে আছে, অথবা এখনও থাকতে পারে—সে সব দেখতে দেখতে কেমন অবাক হয়ে যাচ্ছে। সে বলল টুকুন দিদিমণি আমি যাব কী করে?
—তোমাকে যেতে হবে না সুবল। তুমি এতবড় বাড়িতে থেকে গেলে কেউ টের পাবে না।
সুবল সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে এসেই দেখল সাদা রংয়ের কেমন মসৃণ মেঝে। একেবারে সাদা সবটা। দেয়াল, মেঝে, বারান্দা এমনকী পোশাক নানাবর্ণের যে আছে তাও অধিকাংশ সাদা রংয়ের।
সুবল বলল, আমার এ—ফুলগুলো তোমার পছন্দ হয় টুকুনদিদিমণি?
—খুব। বলে সে বুকের কাছে ফুলগুলো তুলে নেবার সময়ই মনে হল, সে তো বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারে না। এখন এমন কী করে হচ্ছে? কী করে সে এটা করে ফেলল। ওর চোখ বুজে আসছে। সে বলল, সুবল, সুবল তুমি আমাকে ধরো। আমি পড়ে যাব।
সুবল দেখল আশ্চর্য মায়া চোখে মেয়ের। ধীরে ধীরে চোখ বুজে ফেলছে দাঁড়াতে পারছে না। বুকের ওপর ফুলগুলো ধরা আছে। বুঝি পড়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে বিড় বিড় করে বলছে এবং সুবল শুনতে পাচ্ছে, সেই নিঃশব্দ এক ভাষা থেকে সুবল টের পাচ্ছে—টুকুন তাকে ফেলে আর কোথাও যেতে বারণ করছে। এবং টুকুন দিদিমণি যেন পড়ে যাচ্ছিল। সব মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, নিজের অক্ষমতার কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, হাত—পায়ে আর শক্তি পাচ্ছে না টুকুন। কেমন স্থবির হয়ে যাচ্ছে।
সুবল ধীরে ধীরে টুকুন দিদিমণিকে শুইয়ে দিল। ফুলগুলি পাশে রেখে দিল। সে পায়ের কাছে বসে থাকল। চোখ মেলে না তাকালে সে এখান থেকে চলে যেতে পারে না।
চোদ্দ
তারপর একটা খেলা হয়ে গেল। সংসারে এমন খেলা কে কবে খেলেছে জানা নেই। সুবলকে নিয়ে টুকুন নূতন এক জগৎ সৃষ্টি করে ফেলেছে।
সুবল, টুকুন চোখ মেলে তাকালে বলেছিল, টুকুন তুমি ভালো হয়ে গেছ। টুকুনকে খুব অবুঝ বালিকার মতো দেখাচ্ছে। সুবলের টুকুনকে আর দিদিমণি বলতে ইচ্ছা হয় না। কারণ টুকুনকে অসহায় এবং কাতর দেখাচ্ছিল। সে যা করেছে এতক্ষণ, সিঁড়ি ধরে যে নীচে নেমে গেছে, গোলাপ গাছগুলোর পাশ দিয়ে যে হেঁটে গেছে, সে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারছে না। বিশ্বাস না করতে পারলে যা হয়, ভিতরের উদ্যম নষ্ট হয়ে যায়।
সে বলল, টুকুন তোমার কোনও অসুখ নেই। তুমি ভালো হয়ে গেছ।
—তুমি সুবল সত্যি বলছ?
—সত্যি টুকুন। তুমি উঠে বোস। আমি নেমে গেলে দরজা বন্ধ করে দেবে। সুবল এই বলে উঠে এসে রাস্তায় গণ্ডগোল কমেছে কি না, না আবার কারফিউ দিয়ে দিল—এসব জানার জন্য উদগ্রীব হলে টুকুন বলল, সুবল তুমি কোথায় থাকছ?
