শেফালী বলল, বেশ গরম পড়েছে। চান করে নাও।
কলতলা খোলা। সেখানে সে পাজামা খুলে চান করতে পারে না। এবং শরীরে সব অস্পষ্ট জলের রেখা চারপাশে ভেসে উঠেছে। সে ছুঁলেই বুঝতে পারে নরম, খুব নরম ত্বকে বাবুইয়ের বাসার মতো গুচ্ছ গুচ্ছ কীসব ভেসে উঠেছে। এবং এভাবে ওর এক লজ্জা নিবারণের কথা মনে হয়। সে বলল, বউদি আমি বরং রাস্তার কল থেকে স্নান করে আসি।
শেফালী বলল, এত রাতে রাস্তার কলে চান করলে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে।
পুলিশকে বড় ভয় সুবলের। সে বলল, আমি বরং হাত—মুখ ধুয়েনি।
শেফালী বলল, রাস্তায় গাছের নীচে শুয়ে থাকলে এত গরম লাগে না রাজা।
ঘরে শুলে ভীষণ গরম। চান না করে নিলে ঘুমোতে পারবে না।
—তাহলে আমি যখন চান করব, তুমি কিন্তু তাকাবে না।
—তাকালে কী হবে? শেফালী হেসে দিল।
সুবল বলল, আমি বড় হয়ে গেছি বউদি। বলেই সে কেমন ছেলেমানুষের মতো লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখল।
—আমার বড় তোয়ালে—ওটা পরে নাও।
—তোমাদের অসুবিধা হবে না? অজিতদা খারাপ ভাবতে পারে।
সুবল আর কিছু না বলে বেশ বড় একটা তোয়ালে নিয়ে নিল। সংসারে অজিতদার যা কিছু রোজগার সব শৌখিনতার জন্য। সুবল এতসব সুন্দরভাবে ভাবতে পারে না। তবু যখন তোয়ালেতে এক মনোরম গন্ধ, সে তোয়ালেটা মুখে নিয়ে কেমন ঘ্রাণ নিতে থাকল। এমন রঙবেরঙের তোয়ালে নিশ্চয়ই বউদির। সে ঠিক টুকুনদিদিমণির মতো এক আশ্চর্য সুবাস পায় বউদির শরীরে। আর কেন জানি সুবলের মনে হয় এই শহরে, সে যতবার যতভাবে যুবতী মেয়েদের অথবা ফ্রকপরা মেয়েদের সান্নিধ্যে এসেছে, কেমন এক ফুলের সুবাস সবার গায়ে। সে ভাবল, সে যখন ফুল বিক্রি করবে তার শরীরেও এমন একটা মিষ্টি গন্ধ থাকবে।
শেফালীবউদির চটপট সব হয়ে যায়। সুবল গড়িমসি করছিল খুব। ওর তো এমনভাবে বাঁচার স্বভাব নয়। এ যেন আলাদা ব্যাপার। সে একটা আলাদা স্বাদ পাচ্ছে। খুব নিরিবিলি একটা ঘরে, বউদি, বউদির রান্না, ঝালের গন্ধ, এবং আলোর ভিতর বউদির কপালে ঘামের চিহ্ন কেমন এক আকর্ষণ তৈরি করছে। সে সুবল, সংসারের নিয়ম—কানুন সঠিক তার জানা নেই, সে জানে না, এভাবে কোনও যুবতী বালককে রেঁধে—বেড়ে খাওয়াতে পারে, সে ভারী এক রহস্যের স্বাদ পেয়ে যাচ্ছে, সে বলল, বউদি এখানে এলে আমার আর যেতে ইচ্ছা হয় না। অজিতদা যে কী করে তোমাকে ফেলে এতদিন নিরুদ্দেশ হয়ে থাকে বুঝতে পারি না।
শেফালী বলল, তুমি থেকে যাও না রাজা।
—আমার যে বউদি টুকুনদিদিমণির কাছে যেতে হবে।
—কে যে এক টুকুনদিদিমণি তোমার।
—না, খুব ভালো। আমাকে দেখলেই দিদিমণির প্রাণে যেন জল আসে।
—তুমি ঐ ভেবেই সুখে থাক।
সুবল বলল, আমি যখন ফুল বিক্রি করব তখন একটা করে ফুলের গুচ্ছ দিদিমণিকে দিয়ে আসব।
—তুমি ওকে কোথায় পাবে?
—কেন, এই শহরে।
—সে কী খুব ছোট ব্যাপার?
—আমি যখন ফুল নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করব তখন আমার ডাক শুনলে ঠিক দিদিমণি টের পাবে। জানালা খুলে দিলে আমাকে চিনতে পারবে।
আমি বলব, দিদিমণি তোমার ফুল।
শেফালী এই সরলতার জন্য কেমন মুগ্ধ হয়ে যায়। সে বলল, তুমি দাঁড়াও রাজা। ঝোলটা হয়ে গেলে তোমাকে জল পাম্প করে দেব।
শেফালী জল পাম্প করে কেমন ছেলেমানুষের মতো বলল, রাজা তুমি সাবান মাখ না কেন?
—সাবান কোথায় পাব?
—আমি তোমাকে সাবান মাখিয়ে দিচ্ছি। আমাকে তোমার দাদা পামঅলিভ কিনে দেয়।
—আমার গায়ে মেখে দিলে তোমার শরীরের মতো গন্ধটা হবে?
—হ্যাঁ। ঠিক আমার শরীরে তুমি স্নান করে এলে, যেমন গন্ধ পাও ঠিক তেমনি।
—তবে দাও। খুব সুন্দর গন্ধ শরীরে থাকলে আমার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে ভালো লাগে।
—শেফালী ছুটে ছুটে কাজ করছিল। ওর যেন এটা একটা খেলা হয়ে গেছে। সুবলকে নিয়ে খেলা। সুবল কলের নীচে বসে আছে। সুবলের পিঠে শেফালী সাবান মাখিয়ে দিচ্ছে। বড় নরম শরীর সুবলের। ওর ঘন চুল কী কালো। কপাল প্রায় যেন ঢাকা। লম্বা ভুরু। চোখ ভাসা, এবং পদ্মফুলের মতো জলের ওপর যেন গাছের ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে।
কী যে ভালো লাগছিল শেফালীর—এমনভাবে সাবান মাখিয়ে দিতে! ওর শরীরের ভিতর এক আশ্চর্য অহঙ্কার আছে, শেফালী কেমন পাগলের মতো ওর শরীর নিয়ে, ঠিক একটা ছোট্ট পাখির মতো ওর অহঙ্কার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সুবল বলছে, বউদি ঠিক আছে, এবার বাকিটা আমি ঠিক পারব।
—না, তুমি পারবে না রাজা। তুমি কিছু জানো না।
—জানি, ঠিক জানি। দাও, দ্যাখো কী করে মাখতে হয় দেখিয়ে দিচ্ছি। তুমি এমন করছ, আমার ভীষণ খারাপ লাগছে।
কিন্তু শেফালী আজও আশা করেছিল, অজিত ফিরে আসবে, কিন্তু যা খবর পাঠিয়েছে ওর মানুষ দিয়ে, অজিত কবে আসবে ঠিক নেই, কবে আসতে পারবে সে বলতে পারবে না। কিছু টাকা পাঠিয়েছে। ভীষণ হতাশা ছিল মুখে। এই সুবল এখন সব আকাঙ্ক্ষার রাজ্যে নতুন বাতির মতো। —তোমার শরীরে রাজা কী ময়লা, বলেই সে বগল তুলে ঘষে দিতে দেখল, কালো মসৃণ ছোট সুন্দর সব চুলের গুচ্ছ—ঠিক কলমি ফুলের মতো রং। ঠিক কালো নয়, কিছুটা তামাটে রং। সুবলের কেমন কাতুকুতু লাগছিল। সে হো হো করে হাসতে থাকল।
শেফালী বলল, তুমি এমন বড় হয়ে গেছ আগে বলোনি কেন রাজা?
সুবল কোনও জবাব দিতে পারল না। একেবারে চুপ মেরে গেল। সত্যি ওর ভীষণ খারাপ লাগছিল। এবং ভয়ে ক্রমে গুটিয়ে যাচ্ছিল।
