সে যখন শেফালীবউদির ওখানে ফিরল তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। সে ইচ্ছা করলে ফুটপাথে রাত কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু কেন জানি সে আজ খুব পরিষ্কার হয়ে গেছিল, এমনকি সঙ্গে সে পাখিটাকে নিয়ে যায়নি। তার হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, পাখিটাকে খাওয়ানো হয়নি। নানা কারণেই সে ফিরে না এসে পারেনি। আর এমন পরিচ্ছন্ন পোশাকে ফুটপাথে রাত কাটাতেও কেমন খারাপ লাগছিল।
শেফালী সুবলের মুখ দেখেই বুঝল, টুকুনের সঙ্গে সুবলের কিছু একটা হয়েছে।
সে বলল, মুখ গোমড়া কেন রাজা?
—তোমার কাছে থাকব বউদি আজ। দাদা এখনও ফেরেনি?
—না। একটু থেমে বলল, সিস্টার আবার বুঝি ধমক দিয়েছে?
সে জবাব দিল না কিছু। গলায় সুবলের মাফলার জড়ানো স্বভাব। সে তার গ্রামে দেখেছে, কেউ বাবুবনে গেলে গলায় একটা কমফর্টার জড়িয়ে রাখে। সে—ও আজ গলায় একটা কমফর্টার জড়িয়ে গিয়েছিল। সে সেটা একটা দড়িতে ঝুলিয়ে ঝুড়ির ভিতর থেকে পাখিটাকে বের করল। সে পাখিটার জন্য ইচ্ছা করলে একটা খাঁচা কিনতে পারে। কিন্তু খাঁচায় পাখি রাখার ইচ্ছা সুবলের হয় না। পাখি সেই যে কবে বাঁশের চোঙে আশ্রয় নিয়েছিল, আর সে অন্য আশ্রয়ে যেতে চায়নি। সে বলল, পাখি তোর টুকুনদিদিমণি চলে গেছে।
পাখি পাখা নাড়ল। যেন বলতে চাইল, কোথায়?
—জানি না।
শেফালীর ঘুম পাচ্ছিল। সুবল কিছু খাবে হয়তো। ওকে জল—নুন দিতে হবে। বাকিটা সুবল নিজের কাছে রাখে। ছোলার ছাতু, লংকা একটু চাটনি। সে একটা থালায় এসব রেখে শেফালীবউদিকে হয়তো বলবে এক গেলাস জল দাও তো বউদি, খেয়েনি।
কিন্তু আজ সে—সব কিছুই করল না সুবল। বরং পাখিটাকে খাওয়াল। তারপর পাখিটার সঙ্গে কী যেন ফিস ফিস করে বলল, এবং এক সময় মনে হল, ওর টুকুনদিদিমণিকে খুঁজতে যাওয়া দরকার। সে শেফালীবউদিকে বলল, একটু কষ্ট করতে হবে। আমার যা কিছু—এই যেমন কড়াই, চিনেবাদাম, ছোলা—মটর সব এখানে কিছুদিনের জন্য থাকল। কবে ফিরব ঠিক নেই। পাখিটা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।
—দেশে যাচ্ছ নাকি? অবাক চোখে তাকাল শেফালী।
—দেশে আমার কেউ নেই। আমাদের কেউ নেই। তবে স্বপ্ন দেখেছি একদিন জনার্দন চক্রবর্তী দেবীর মন্দিরের বাইরে একটা হরিণকে ধরার জন্য ছুটছে। কী যে স্বপ্ন! স্বপ্নটার কোনও মানে হয় না।
—কিন্তু এত রাতে? কিছু খেলে না। তুমি কী পাগল!
সুবল হাসল। সুবলের লম্বা পাজামা, লম্বা পাঞ্জাবি গেরুয়া রংয়ের এবং সন্ন্যাসীর মতো মুখ শেফালীকে কেমন কাতর করছে। সে বলল, খেলে না। টুকুনের কাছে গেলে—দেখা হল কিনা বললে না। সিস্টার কী বলল বললে না। কী হয়েছে তোমার?
—টুকুনদিদিমণি হাসপাতাল থেকে চলে গেছে।
—তাহলে দেখা হয়নি?
—না।
এক আশ্চর্য বিষণ্ণতা ধরা পড়ছে সুবলের চোখে মুখে। অথবা দেখলে মনে হয় সুবল মনে মনে কিছু স্থির করে ফেলেছে। তাকে এখন শেফালী কিছুতেই আটকে রাখতে পারবে না। শেফালী তবু বলল, কিছু খেলে না!
—কিছু খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।
—তুমি তো দেখছি শহরের মানুষের মতো হয়ে যাচ্ছ।
সুবল চোখ তুলে তাকাল।
—তোমার তো এমন হওয়া উচিত না রাজা।
সুবল কিছু বলল না। সুবলের যেমন স্বভাব কথার ঠিক জবাব দিতে না পারলে একটু হেসে ফেলা, তেমনি সে হেসে দিল।
এই হাসিটুকু ভারী সুন্দর। এমনভাবে হাসলে বড় বেশি সরল মনে হয়। তখন ওকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হয়। আদর করতে ইচ্ছা হয়। এত যে মনের ভিতর তার অশান্তি—কেমন নিমেষে উড়ে যায়। তার মানুষ ঘরে থাকে না। মানুষটা সংসার চালাবার নামে কোথায় থাকে, কোথায় যায় সে বলতে পারে না। এবং মদ্যপানে মানুষটা কখনও অমানুষ হয়ে গেলে শহরের সব দুঃখ একসঙ্গে ধরা যায়। তখন সুবলের মতো একজন সরল গ্রাম্য বালকের সঙ্গ পেতে বড় ভালো লাগে।
শেফালী বলল, তুমি রাজা আজ কোথাও যেতে পারবে না।
সুবল দেখল শেফালীবউদির চোখে ভীষণ মায়া। ভীষণ এক টান। এবং এই শহর, নির্বান্ধব শহরে সে কেন জানি আর না করতে পারে না।
শেফালী বলল, আমি কটা গরম রুটি সেঁকে দিচ্ছি। একটু আলুর তরকারি। বেশ খেতে ভালো লাগবে।
সুবল বলল, তুমি আমার জন্য এত রাতে এসব করবে?
—বাঃ করব না! তোমার দাদা এসে যদি জানতে পারে রাজা রাতে না খেয়ে বের হয়ে গেছে, তবে আমাকে আস্ত রাখবে!
সুবল বুঝতে পারে এই শহরের কোথাও নানা ভাবে নানা বর্ণের দুঃখ জেগে আছে। এই সংসারে এমন এক দুঃখ। অভাব—অনটনের সংসারে একটা মানুষ সবসময় কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে! কেমন একটা পালিয়ে বেড়ানোর স্বভাব অজিতদার। কোথায় যে এই মানুষের আস্তানা সে সঠিক জানে না। খুব কম সময় সে অজিতদাকে এখানে দেখেছে। এবং শেফালীবউদির চোখ দেখে মনে হয়েছে সে—ও সঠিক ঠিকানা অজিতদার জানে না। ওর মনে হল টুকুনদিদিমণির সঙ্গে অজিতদার সঠিক ঠিকানাটাও সে খুঁজে বের করবে। সে বলল, দাও তবে। আজ আর বের হচ্ছি না। যখন বললে, তখন আজ রাতটা এখানেই কাটানো যাক।
সুবল কেমন স্মার্ট গলায় এখন কথাবার্তা বলছে। সে দেখল বারান্দায় উনুনে বউদি আঁচ দিচ্ছে। এবং বউদিকে দেখে মনে হচ্ছিল কিছুদিন থেকে দাদার সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার অভাব হচ্ছে। অথবা বউদির এমন একটা জায়গা ভালো লাগছে না। কারণ বউদি খুব পরিপাটি এবং সেজেগুজে থাকতে ভালোবাসে।
অজিতদার খুব ইচ্ছা বউদির জন্য সে যাবতীয় কিছু করবে। এতসব অট্টালিকা এই শহরে, বউদির জন্য এমন একটা অট্টালিকা চাই। এবং যখন সে নানাভাবে চেষ্টা করেও কোনওরকমে একটু সুন্দরভাবে বাঁচবার মতো ব্যবস্থা করতে পারে না, তখন কেমন হীনমন্যতায় ভোগে। এবং এভাবে সংসারে অশান্তি নেমে এলে মনে হয় শেফালীবউদিকে অজিতদা কোথা থেকে যেন চুরি করে নিয়ে এসেছে। অনেক কিছুর প্রলোভনে শেফালীবউদি সবকিছু পিছনে ফেলে চলে এসেছিল। বউদি কতদিন কতভাবে তাকে নানারকম সব গল্প শুনিয়েছে। এবং আজকের এই রাতে খাওয়া একটা বেখাপ্পা ঘটনা। ওর সঙ্কোচ হচ্ছিল।
