এভাবে হৃদয়ের কাছাকাছি থাকার যে বাসনা মানুষের, মানুষ যার টানে বড় রকমের কঠিন কিছু করতে পারে না, এবং এভাবে সুবলের ব্যথিত মুখ দেখে শেফালী কেমন থমকে গেল। বলল, তুমি এমন দুঃখ পাবে জানতাম না।
সুবলের ভিতর এক পাপবোধ এভাবে জন্ম নিলে—এই শহরের গ্লানিকর সব ছবি তাকে তাড়া করে বেড়াতে থাকে। ওর মনে হল, সকাল হলেই সে ফুলের সন্ধানে চলে যাবে।
সঙ্গে থাকবে পাখিটা। যা সামান্য সম্বল আছে এই দিয়ে সে এই শহরের বড় রকমের পাপখণ্ডনের নিমিত্ত আবার রাস্তায় নেমে গেল। সেই যে এক দেশ, যে দেশে সে জন্মেছে, কী যে পাপ ছিল, টুকুনদিদিমণির এমন অসুখ!
সে নানাভাবে ফুলের সন্ধান করে বেড়াল। বই—পাড়ার কাছে খুব বড় ফুলের দোকান আছে। সেখানে সন্ধান নিয়ে সে জেনেছে, কিছুদূর ট্রেনে গেলে, একজন মানুষ আছে। মাঠে তার কেবল ফুলের চাষ। সে রজনিগন্ধার চাষ করতেই বেশি পছন্দ করে। ওর কেন জানি মনে হল, এই পৃথিবীতে একমাত্র সেই লোকটির সঙ্গেই তার এখন বন্ধুত্ব হতে পারে।
সুবল লোকটার সন্ধানে চলে গেল।
একটা নীল রঙের ট্রেনে চড়ে একটা সাদা রংয়ের স্টেশনে সে নেমে পড়ল। যে লোকটা নীলবাতি নিয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকে তার কাছেই খবর পেল—লোকটি একটা ভাঙা কুটিরে থাকে। ওর সম্বল একটা লণ্ঠন। সে তার দুই বিঘা জমিতে নানারকমের ফুলের চাষ করে থাকে। বেলফুলের জন্য আছে কাঠা চারেক ভুঁই। রজনিগন্ধার জন্য আছে কাঠা দশেক। গাঁদাফুল এবং অন্য মরশুমি ফুলের চাষের জন্য সে রেখেছে বাকি জমিটা।
তার বাড়ি যেতে হলে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। সে গেলেই একটা ফুলের গুচ্ছ এনে তুলে দেবে। সেখান থেকে তোমার খুশিমতো ফুল পছন্দ করে কিনে আনবে। গুচ্ছের ভিতর সে সব সময় তাজা এবং ভালো ফুলগুলো রাখে। ওর মুখে লম্বা সাদা দাড়ি। ভীষণ কালো রং মানুষটার। সে একটা লুঙ্গি পরে। মাথায় তার একটা ফেজ টুপি। মানুষটা ধার্মিক। পাঁচ বেলা নামাজ। আর ফুল ফোটানো তার কাজ। পৃথিবীতে অন্য কাজ আছে বলে সে জানে না।
মানুষটার আবার ভীষণ বাতিক। সে যে জমি থেকে মৃতের জন্য ফুলের তোড়া তৈরি করে, সেই জমি থেকে কখনও ফুলশয্যার মালা গাঁথে না। সুবল লোকটির পরিচয় পেয়ে খুব খুশি। সুবল বলল, আমার খুব ইচ্ছা ফুলের চাষ করি তোমার মতো।
—ফুলের চাষ কোর না। দুঃখ পাবে।
সুবল বলল, দুঃখ মানুষের জন্য। মানুষটার কাছে এসে সুবল তার মতো ধার্মিক কথাবার্তা বলতে পেরে আনন্দ পাচ্ছে।
—তা হলে এই বয়সে সুখ—দুঃখ নিয়ে তোমার ভাবনা আছে?
—ভাবনা কী নিয়ে ঠিক জানি না বুড়োকর্তা। তবে এটুকু মনে হয়েছে, তুমি খুব আনন্দে আছো। তুমি শহরে যাও না?
—শহরে কোনওদিন যাইনি। আগে ফুলের চাষ করতাম নেশার জন্য। এখন এটা পেশা হয়ে গিয়ে ভালোই হয়েছে। শুনেছি আমার ফুলের খুব সুনাম বাজারে। মানুষেরা মরে গেলে শুনেছি আমার ফুল তাদের চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্যাপারটা ভাবতে খুব আনন্দ পাই।
—সুন্দর সুন্দর বউরা শুনেছি বিকেলে ছাদে ঘুরে বেড়ায়। তাদের খোঁপায় আমার এই সব বেলফুলের মালা জড়ানো থাকে! বুড়ো মানুষটি সুবলকে এমনও বলল।
সুবল বলল, তুমি আনন্দেই আছো। ফুল বিক্রি করাও খুব আনন্দের। আমার তো তেমন পয়সা নেই।
বুড়ো লোকটি বলল, আমার কাছে একদিনের ধারে পেতে পারো। তার বেশি নয়।
—কিন্তু আমার ঠিকানা নেই।
—ঠিকানা! মানুষটা ঠিকানার কথা বলতেই কেমন চোখ বড় বড় করে ফেলল। মানুষের কোনও আবার ঠিকানা থাকে নাকি?
—থাকে না? এই যে তোমার ঠিকানা, ফুলের মাঠ, একটা সবুজ কুটির এবং নদীর ধারে বড় রাস্তা।
লোকটি বলল, অঃ। এই ঠিকানার কোনও দাম নেই। আমি তোমার ঠিকানা চাই না। তুমি তো একদিনের জন্য ধার নেবে। বাকিটা তো আমার ওপর।
যাই হোক, সুবল লোকটির কাছে অনেক বেলফুল চাইল।
লোকটি বলল, এসো।
সুবল লোকটির সঙ্গে হাঁটতে থাকল।
বেলফুলের জমিতে এসে বলল, তুমি এই এই গাছ, বুড়ো এক দুই করে গাছের নম্বর বলে গেল, এগুলো তোমার। তুমি এসব গাছ থেকে ফুল নেবে। বলেই সে সুবলের মুখে কী দেখল। বলল, দাম অর্ধেক হয়ে যাবে। গাছের সেবা—যত্নের ভার নিলে, ফুলের দাম কমে যায়।
সুবল অর্ধেক দামেই ফুলের বন্দোবস্ত নিল।
সুবল খুব সকালে আসত। গাছে জল দিত। গাছগুলোর গোড়া খুঁচিয়ে দিত নিড়িকাচি দিয়ে। নদীতে স্নান করত। জোয়ারে জল থাকত খুব নদীতে। সে জল বয়ে আনত নদী থেকে। মাটিগুলো টেনে গেলে অথবা গোড়া শক্ত হয়ে গেলে, সুবলকে খুব চিন্তিত দেখাত। অথবা পোকা লাগলে সে কী করবে ভেবে পেত না। বুড়ো মানুষটা তখন নানারকমের শুকনো পাতা সংগ্রহ করত বন থেকে। শুকনো নিমপাতা অথবা কচুরিপানা। সব সে আগুন জ্বেলে একরকমের ছাই সংগ্রহ করত। ছাই ছড়িয়ে দিত গাছে গাছে পাতায় পাতায়।
আর সকাল হলেই সুবল দেখতে পেত ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা থেকে সব ছাই উড়ে গেছে। পোকামাকড় সব মরে গাছের নীচে পড়ে গেছে। পাতাগুলো গাছের কেমন সবুজ হয়ে গেছে। আর কী আশ্চর্য সাদা রংয়ের ফুল—চারপাশে গন্ধে ভীষণ আকুল করছে। এমন একটা ফুলের মাঠে দাঁড়ালে কোথাও দুঃখ আছে বোঝা যায় না।
এই কুটিরের পাশেই সুবল আর একটা কুটিরে বানিয়ে নিয়েছে। সে নদী থেকে মাটি কেটে এনেছে। বুড়ো মানুষটা তাকে সাহায্য করেছে নানাভাবে। এতদিন একা থেকে বুড়ো মানুষটার একরকমের স্বভাব হয়ে গিয়েছিল—মানুষ কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। আর যেসব ফুলের দালালরা আসত, ভারী খারাপ লোক। নানাভাবে তাকে ঠকাত। একমাত্র সুবল এক মানুষ, কেমন সরল, এবং ঠকানো কাকে বলে জানে না। সে আসার পর তার চাষ দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এবং সময়মতো আজকাল বর্ষা আসে। ভালো ভালো ফুল হয়। গোলাপগুলো কী যে বড় হয়ে ফুটছে। গোলাপ চাষের ভার এখন সুবলের উপর। ছেলেটা ভারী পয়া। যেন সুবল বললে সব তার নামেই লিখে দেবে।
