আমি কিছু বলছি না। এমন কী তাকাচ্ছিও না।
সে বলল, তুমি সব ভুলে গেছ, গুলিয়ে ফেলছ।
ছোট্ট রাজপুত্র এভাবে চটে যাচ্ছে। সে কোনও ছোট গ্রহাণু থেকে পাখিদের ডানার মতো একরকম কীসব লাগিয়ে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে এসে এমন একটা বেরসিক লোকের দেখা পাবে বোধহয় আশাই করতে পারেনি। ওর সোনালি চুলগুলি কী যে মাখনের মতো নরম, ওর চোখ কী যে নীল—সে আর যেন আমার এই অবহেলা মোটেই সহ্য করতে পারছে না।
সে এবার একনাগাড়ে বলে চলল, একটা গ্রহের কথা জানি আমি। সেখানে ঘন লাল রংয়ের একটা লোক থাকে। কখনও একটা ফুল শুঁকে দ্যাখেনি। সে কোনওদিন সাদা জ্যোৎস্নায় হেঁটে বেড়ায়নি, আকাশের তারা দ্যাখেনি, কাউকে সে ভালোবাসেনি। সে একটা যোগ অঙ্ক ছাড়া কিছুই করেনি। সারাদিন তোমার মতো বলত, আমি ভারী ব্যস্ত মানুষ। আর অহঙ্কারে পা পড়ত না। একটু থেমে ছোট্ট রাজপুত্র দুহাতে বালি ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল, সে কী একটা মানুষ! সে তো একটা ব্যাঙের ছাতা!
—একটা কী? হাতের সব কাজ ফেলে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালাম।
—একটা ব্যাঙের ছাতা। রাগে ছোট্ট রাজপুত্র একেবারে সাদা হয়ে গেছে। ওর সোনালি চুল ছোট পাখির বাসার মতো বাতাসে যে কাঁপছে।
সে ক্রমান্বয়ে রাগে দুঃখে বলে চলল, লাখ লাখ বছর ধরে ফুলেরা কাঁটা তৈরি করছে। আর লাখ লাখ বছর ধরে ভেড়ারাও ফুল খেয়ে যাচ্ছে। যে কাঁটা কারুর কোনও কাজে আসে না, ফুলেরা তাই বানাতে গিয়ে এত কষ্ট করে কেন, সেটা জানা কী দরকারি নয়? এই যে লড়াই ফুলের সঙ্গে ফুলের কাঁটার, ভেড়ার সঙ্গে ফুলের—সেটা একটা যোগ অঙ্কের চেয়ে বেশি দরকার নয় জানার।
আর কথা বলতে পারছিল না ছোট্ট রাজপুত্র। কোনওরকমে ধীরে ধীরে বলছিল—কেউ যদি একটা ফুলকে ভালোবাসে, যে ফুল লক্ষ লক্ষ তারার ভিতর তাদেরই একটি হয়ে ফুটে আছে, এবং তখন যদি একটা ভেড়া ফুল খেয়ে ফেলে—আর যদি আকাশের তারারা সঙ্গে সঙ্গে নিভে যায় ভয়ে, তখন কী সেটা আমাদের জীবনে বড় সমস্যা নয়?
এবং এভাবে ছোট্ট রাজপুত্র আর কথা বলতে পারছিল না। হঠাৎ কেন যে ফুঁপিয়ে ওঠে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। রাত নেমে এসেছিল। যন্ত্রপাতি ফেলে এবার উঠে দাঁড়ালাম। এই মরুভূমির রুক্ষতা, সীমাহীন বালুরাশি, তৃষ্ণা, মৃত্যুভয়—সবই কেমন তুচ্ছ বলে মনে হল। কেন জানি মনে হল আমার গ্রহ এই পৃথিবীতে এক ছোট্ট রাজপুত্র চলে এসেছে—যার নিয়মকানুন সব আলাদা, যাকে আমায় সান্ত্বনা দিতে হবে। ওকে হাত বাড়িয়ে বুকে তুলে নিলাম। একটা ফুলের মালার মতো হাতের ওপর দোলাতে লাগলাম। তাকে সান্ত্বনা দিলাম, যে ফুল ভালোবাস তুমি, তার কোনো বিপদ হয়নি। তোমার ভেড়ার একটা মুখ—ঢাকা এঁকে দেব। আর তোমার ফুলের জন্য একটা বর্ম। আর ভেবে পেলাম না ওর হয়ে আমি আর কী বলব। বুঝতে পারছিলাম না তাকে কীভাবে আর শান্ত করব। কী করে তার মান পাব। চোখের জলের রাজ্যটি সত্যি বড় রহস্যময়।
টুকুন বুঝতে পারল না এভাবে বইটি পড়তে পড়তে সে—ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেন। এ—ধরনের কান্না তার বুক বেয়ে কখনও উঠে আসেনি। সেই নির্বান্ধব ছেলেটি এখানে কোথায়! সে তার কাছে এলে যেন এখন বলতে পারত, আমরা এখানে থাকব না, সেই ছোট গ্রহাণুতে চলে যাব। তুমি আমি ছোট্ট রাজপুত্র একসঙ্গে থাকব। ওর ফুলকে পাহারা দেব।
এবং এভাবে টুকুন কখনও কখনও সন্ধ্যায় অথবা রাতে নিজের বিছানা থেকে বড় জানলা দিয়ে অন্ধকার আকাশ দেখতে থাকে। এবং সব উজ্জ্বল গ্রহ দেখতে দেখতে কোনও বিন্দুর মতো অনুজ্জ্বল কিছু দেখলেই মনে হয় বুঝি সেই গ্রহাণুতে ছোট্ট রাজপুত্র থাকে। সুবলকে নিয়ে সে যদি সেখানটায় যেতে পারত!
বার
সুবল সেদিন শেফালীবউদির কাছে ফিরে আসবে ভেবেছিল। সে গিয়ে যখন দেখল টুকুন দিদিমণি হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে, তখন ওর আর কিছু ভালো লাগছিল না। কেউ তাকে আর কোনও খবরও দিল না। সে দুবার চেষ্টা করেছে সেই সিস্টারের সঙ্গে দেখা করতে। কিছুতেই সুবলের সঙ্গে সিস্টার দেখা করতে চায়নি।
তবু যা হয়ে থাকে, মনের ভিতর এক অসীম বিষণ্ণতা। সে যখন তার গ্রাম মাঠ ফেলে চলে আসছিল, তখন কী ভীষণ মায়া তার গ্রাম মাঠের জন্য। সে বারবার বলেছে, আমি আবার ফিরে আসব মা সুবচনি। সুবচনি দেবী ওদের খুব জাগ্রত দেবতা। তার যতদূর মনে আছে, বাবা—মা ওর কী একটা অসুখে একবার সেই দেবতার মন্দিরে পূজা দিয়েছিল। সে সেই পূজা দেখেছিল, না অন্য মানুষের মুখে শুনে শুনে সে তার বাবা—মার সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে রেখেছে, এখন আর মনে করতে পারে না।
সুবল জানত না এই শহরে এসে সে এক আশ্চর্য মায়ায় জড়িয়ে পড়বে। এতবড় শহরে কী করে যে টুকুনদিদিমণি তার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেল! এখন নিজের ওপরেই তার রাগ হচ্ছে। সে যদি দেবদারু গাছটার নীচেই আস্তানা গেড়ে নিত! কিন্তু ওর কী যে হয়ে গেল, বেশি পয়সার লোভে সে অন্য ব্যবসা করতে গিয়েই মরেছে। সে সময় কম পেত। আগের মতো খুশিমতো দুজোড়া জুতো পালিশ করে গাছের নীচে ঘুমিয়ে যেতে পারত না। এখন কেন জানি ঘুমিয়ে পড়লেই মনে হয় কেউ তার সবকিছু চুরি করে নিয়ে যাবে। তার এমন কিছু হয়েছে, যা চুরি যাবার ভয়। তার আর আগের মতো কোনও স্বাধীনতা নেই। সে বুঝতে পারে, এইসব শহরে এলেই মানুষের স্বাধীনতা চুরি যায়।
