সুতরাং ইন্দ্র চলে গেলে ঘর ফাঁকা। মা এসে কিছুক্ষণ পাশে বসে থেকে গেছে। গীতামাসি আসবে নানারকমের খাবার নিয়ে। সে একটা দুটো খাবে, বাকিটা খাবে না। তারপর ওর যা কাজ, জানালায় বসে মালিদের বাগানের কাজ দেখা। প্রতিটি গাছ ওর এত চেনা যে, এখন ইচ্ছা করলে সে যেন বলে দিতে পারে কোথায় ক’টা নূতন কুঁড়ি মেলেছে, কখন ফুল ফুটবে, ক’টা ফুল ক’টা গাছে ফুটে রয়েছে। ম্যাগনোলিয়া গাছে দুটো ফুল ফুটেছিল কাল। সাতটা কুড়ি। তিনটা ফুটবে ফুটবে ভাব। আগামীকাল তিনটা ফুল ফুটবে। আগে এইসব ভালো জাতের ফুল তুলে এনে ওর ঘরে নীল রংয়ের ভাসে সাজিয়ে রাখত গীতামাসি। কিন্তু সে বারণ করেছে, ফুলেরা গাছে থাকলে বেশি ভালো লাগে। ওরা যে কীভাবে ফোটে! কখনও কখনও রাত জেগে দেখতে ইচ্ছা হয়। সে এভাবে আজ পর্যন্ত একটা ফুলের কাছাকাছি যেতে পারল না। ফুল হয়ে ফুটে উঠতে পারল না। কান্নায় ওর গলা বুজে আসে তখন।
সুবল এলে বুঝি সত্যি সত্যি সে এবার ফুল হয়ে ফুটে উঠতে পারত। শরীরে তার নানারকমের ঘ্রাণ, সুন্দর সুন্দর সব ইচ্ছারা খেলা করে বেড়াত। সুবল এলে এইসব ইচ্ছা কেন যে জেগে যায়। এবং সে তখন যেন ইচ্ছা করলে ছুটতে পারে।
সে বলল, গীতামাসি আমাকে ছোট্ট রাজপুত্রের বইটা দাও তো।
টুকুন ‘বৈমানিকের ডায়রি’টা তুলে নিয়ে সেই ছোট্ট রাজপুত্রের গল্পটা পড়তে থাকল।
বৈমানিক লিখেছে, প্রতিদিন আমি তার গ্রহ, সেখান থেকে তার যাত্রা তার ভ্রমণ বিষয়ে খানিকটা করে জেনেছিলাম। এভাবে তৃতীয় দিনে বাওবাব গাছের গল্পটা জেনেছিলাম।
সেটাও আমার সেই ভেড়ার ছবি আঁকার কল্যাণেই জানতে পেরেছি।
কারণ দেখেছিলাম, ওর মুখে ছোট্ট সংশয়ের রেখা। সে যেন কী ভাবছে। কী যে ভাবছে আমি জানি না। চারপাশে বিরাট সাহারা, আমার কাছে আর পাঁচ দিনের মাত্র জল আছে। এর ভিতর উড়োজাহাজটাকে মেরামত করে নিতে না পারলে, আমি আর ফিরতে পারব না। আমার ছোট্ট বন্ধুটির সঙ্গে সারা মাস কাল বোধহয় এই মরুভূমিতেই ঘুরে মরতে হবে। আমি বললাম, কিছু বলবে?
—অনেকক্ষণ থেকে ভাবছি কিছু বলব, কিন্তু—
—কিন্তু কী?
—তুমি যে—ভাবে কাজ করে যাচ্ছ—
—হ্যাঁ কাজ করছি। না হলে দেশে ফেরা যাবে না।
—কিন্তু তুমি ঠিক জানো তো ভেড়ারা গুল্ম খায়?
—হ্যাঁ খায়।
—যাক বাঁচা গেল। কী যে ভাবনা হচ্ছিল!
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না সে এমন বলছে কেন! আবার ছোট্ট রাজপুত্রের ভারী গলায় প্রশ্ন—ওরা বাওবাব খায়?
আমি হেসেছিলাম। এমন একটা প্রাণ—সংশয়ের ভিতর আছি, আর সে কিনা এমন সব প্রশ্ন করছে—ভেবে অবাক, বললাম—বাওবাব তো গুল্মজাতীয় গাছ নয়। তুমি যদি একপাল হাতি নিয়ে যাও এবং তার ওপর তোমার ভেড়াটাকে চাপাও, তবু বাওবাবের পাতার নাগাল পাবে না।
—আঃ। ছোট্ট রাজপুত্রকে খুব যেন চিন্তিত দেখাল। তারপর খুব জোরে হেসে নিল, তুমি একটা কথা জানো না, সব গাছই বড় হবার আগে ছোট থাকে। ছোট্ট থেকে বড় হয়।
—তাহলে তুমি বাওবাবের চারাগাছের কথা বলছ?
ছোট্ট রাজপুত্র কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখল। আর একটা সংশয় যেন দানা বাঁধছে। প্রশ্ন করল, ভেড়া যদি গুল্ম খায় তাহলে বলতে হবে ফুলও খায়।
—ওরা যা পায় তাই খায়। আমাদের দেশে কথাই আছে, ছাগলে কী না খায়, পাগলে কিনা বলে!
—ছাগল ব্যাপারটা কী?
বুঝতে পারলাম ছোট্ট রাজপুত্র ছাগল ব্যাপারটা জানে না। আমি বললাম, সে এক রকমের ভেড়ার মতোই দেখতে জীব। এবং সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখে আবার সংশয় ফুটে উঠছে। সে কিছু আবার প্রশ্ন করবে বুঝতে পারলাম।
—আচ্ছা যে ফুলের কাঁটা আছে—
—যে ফুলের কাঁটা আছে ওরা তাও খেয়ে নেবে।
তখন আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম বিমানের কাজে। একটা লোহার ডাণ্ডা ভিতরে ঢুকে গেছে! ওটাকে বের করতে না পারলে শান্তি নেই। জলও ক্রমে আমার কমে আসছে। খুব শঙ্কিত ছিলাম এজন্য। পাশে ছোট্ট রাজপুত্রের একের পর এক প্রশ্ন। আর আশ্চর্য, কোনও প্রশ্নের যতক্ষণ পর্যন্ত জবাব না পাবে—একনাগাড়ে সে তা জানতে চাইবে। মনে মনে কিছুটা বিরক্ত। যা মনে আসছে তাই আবোল—তাবোল কিছু বলে সান্ত্বনা দেবার মতো বললাম, কাঁটা দিয়ে কিছু হয় না। ওগুলো আমার মনে হয় ফুলগুলির দুষ্টুমি।
ছোট্ট রাজপুত্র বলল, ও। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর কেমন ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, তোমার কথা মানি না। যা মনে আসছে বলে যাচ্ছ। ফুলেরা দুর্বল আর সরল বলে কাঁটা না থাকলে চলে না। ও—ভাবে কাঁটা আছে বলেই কারও কারও কাছে ওরা ভয়ানক।
কোনও জবাব দিচ্ছিলাম না। এতবড় একটা মরুভূমির মতো জায়গায় ছোট্ট রাজপুত্র আমার সঙ্গী। সে যদি আমাকে ফেলে চলে যায়—ভাবতেই গা—টা ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি ডাণ্ডাটা খোলার জন্য খুব জোরে হাতুড়ি মারলাম। একেবারে ওটাকে উপড়ে আনতে চাইছি।
ছোট্ট রাজপুত্র ফের বলল, তুমি কী ভাব ফুলেরা—
—না না, আমি কিছুই ভাবছি না। কেবল আবোল—তাবোল বকে যাচ্ছি। আমার মাথাটা ঠিক নেই। তা ছাড়া দেখছ না দরকারি কাজে ব্যস্ত।
ছোট্ট রাজপুত্র আমার দিকে ভারী বিস্ময়ের চোখে তাকাল। বলল দরকারি কাজ! সে কী জিনিস আবার?
আমি কিছু বললাম না। আমার কিছু ভালো লাগছিল না।
হাতের আঙুলে, হাতুড়িতে তেল—কালি মাখা। বেয়াড়া একটা যন্ত্রের ওপর ঝুঁকে আছি সেই কখন থেকে। ছোট্ট রাজপুত্র আমায় কেবল এখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। এবং বুঝতে পারছিলাম ভীষণ রেগে যাচ্ছে। সে ফের বলল, তুমি বড়দের মতো কথা বলছ।
